Skip to toolbar

বাঙালি জীবনে ধর্মনিরপেক্ষ ইকবাল চর্চার পথিকৃৎ ভাষাচার্য শহীদুল্লাহ
গৌতম রায়

মহাকবি ইকবাল ( জন্ম- ১৮৭৭ সালের ৯ ই নভেম্বর, শিয়ালকোটে।মৃত্যু-১৯৩৮ সালের ২১ শে এপ্রিল ,  লাহোরে) কে ঘিরে বাংলা ও বাঙালি সমাজের ভিতরে একটা পরস্পর বিরোধী চিন্তা-চেতনা দীর্ঘদিন ধরে আছে। হিন্দু -মুসলিম নির্বিশেষে একটা বড় অংশের বাঙালি ইকবালকে অত্যন্ত উচ্চমানের একজন দার্শনিক বলে মনে করেন ।ইকবালের  মহাপ্রয়াণের পরে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন;
                ” স্যার মুহম্মদ ইকবালের মৃত্যু আমাদের সাহিত্যে এক শূন্যতা সৃষ্টি করল, এবং মর্মের এ আঘাত ভুলতে যথেষ্ট সময় লাগবে ।ভারত ,আজকের পৃথিবীতে যার স্থান খুবই ছোট, তার পক্ষে বিশ্ববাসীর মনে যার কবিতা অনুভূতি জুগিয়েছিল এমন এক কবি কে হারানো খুবই বড় রকমের ক্ষতি।”
                       মহাকবির মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ১৯৩৮ সালের ২৩ শে এপ্রিল স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা হচ্ছে;”  তিনি মুসলমানদের ভালো নেতৃত্ব এবং বিচক্ষণ পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমন বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তি ,তেজউদ্দীপক চিন্তার উন্মেষক স্মরণীয় কাব্য রচয়িতার মৃত্যুতে মুসলমান সম্প্রদায় অপেক্ষা ভারত অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হলো এবং বিশ্বসাহিত্য দরিদ্রতর হল ,শুধু তোমার লেখনি সম্পদ হয়ে রল( অনুবাদ- ভাষাচার্য শহীদুল্লাহ)।
                 ইকবালের  মৃত্যুর পর মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে সে তেজ বাহাদুর সপ্রু,সরোজিনী নাইডু,  সুভাষচন্দ্র বসু জওহরলাল নেহরু প্রমুখ সেই সময়ের  ভারতীয় রাজনীতির জ্যোতিষ্কেরা তাঁর  মৃত্যু কে’ ভারতের জাতীয় ক্ষতি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। এক ই  মন্তব্য ছিল’ সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেট’, ‘ ট্রিবিউন ‘, ‘ ডেইলি হেরাল্ড’ , ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি সর্বভারতীয় সংবাদপত্র গুলির ও।
                      ভারতীয় রাজনীতির পরবর্তী ঘটনা স্রোতে ইকবাল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে সম্যক পরিচয়ের   অভাব থেকে এক ধরনের ভুল ধারণা সৃষ্টি করেছে। দ্বিজাতি তত্ত্ব বিশ্বাসী মুসলমানেরা ইকবালকে তাঁদের চিন্তা-চেতনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমানেরা উগ্র ইসলামপন্থীদের ইকবালকে একটা কৌণিক বিন্দু তে দাঁড় করানোর প্রবণতা বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে সোচ্চার হতে পারেননি। অপরপক্ষে হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশ তাঁদের ভিতর জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার মানুষ যেমন ছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার মানুষ ছিলেন, এমনকি বামপন্থী চিন্তা চেতনার মানুষও  ছিলেন, তাঁদের  ইকবাল সম্পর্কে সম্যক চর্চার অভাবে মহাকবি তাঁর ভূমিকা ও অবদান সম্পর্কে একটা বিকৃত ধারণার শিকার হয়েছেন।
                           অবিভক্ত ভারত এই মহাকবি ইকবাল কে ঘিরে বাঙালি সমাজের এই ভুল ধারণার অবসানে প্রথম প্রয়াসী হয়েছিলেন ভাষাচার্য শহীদুল্লাহ( জন্ম১৮৮৫ সালের ১০ ই জুলাই, মৃত্যু–১৯৬৯ সালের ১৩ ই জুলাই) বাংলা ভাষায় ইকবালের সম্যক পরিচয় জ্ঞাপনের   ভিতর দিয়ে পবিত্র ইসলামের উদার ,সমন্বয়বাদী, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে মহাকবি কিভাবে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন ১৯৪৫  সালেই  সে সম্পর্কে কলম ধরেছিলেন।
                      আচার্য শহীদুল্লাহ কেবল কাব্য সাহিত্য জগতের নয় , ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাসে ,অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার বিস্তারের ইতিহাসে,  পবিত্র ইসলামকে সঠিক ধ্যান-ধারণা নিরিখে প্রয়োগের প্রেক্ষিতে মহাকবির অবদান সম্পর্কে কলম ধরেছিলেন। আত্মবিস্মৃত বাঙালি বাংলা ভাষায় ইকবাল চর্চার পথিকৃৎ আচার্য শহীদুল্লাহর এ বিষয়ে অবদান ,বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চায় তাঁর ভূমিকার কথা এখন আর উল্লেখই করে না ।
                 শঙ্খ ঘোষের ও ইকবাল চর্চার বহু আগে আচার্য শহীদুল্লাহ যে উদার ,নিরপেক্ষ মননশীলতার ভিতর দিয়ে ইকবালের মহাকাব্যিক  চিন্তা চেতনার বিশ্লেষণ করেছিলেন, তা বাংলা ও বাঙালির কাছে এক পরম বিস্ময়ের  বিষয়।
                   বিশ শতকের  সূচনাপর্বে পাঞ্জাবি এক প্রলয়ংকারী ভূমিকম্প হয় ।সেই সময় তরুণ ইকবাল রয়েছেন লাহোরে তাঁর নিজের বাড়িতে । ভূমিকম্পে গোটা লাহোর শহর প্রায় দুলছে। শহরের চারিদিকে কান্নার রোল পড়ে গেছে। অথচ মহাকবি নির্মোহভাবে তাঁর নিজের ঘরের খাটে শুয়ে একটি বই পড়াতে নিমগ্ন রয়েছেন ।  
                       ভূমিকম্প ঘিরে চারিদিকের মানুষের আতঙ্ক, কোলাহল — কোনো কিছুই পাঠ নিমগ্নতা থেকে এক মুহূর্তের জন্য বিচ্যুত করতে পারল না ইকবালকে ।তাঁর এই ভূমিকা দেখে পরিচারক অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়লেন ।পরিচালকের  ব্যস্ততা দেখে ইকবাল তাকে বললেন;
                  আলি বক্স, এমনভাবে ছুটোছুটি করে বেরিও না তুমি। সিঁড়ির উপর গিয়ে চুপ করে দাড়িয়ে থাকো ।
                   এই কথা বলে লাহোরের স্থানীয় এক সরকারি কলেজের অধ্যাপক, জ্ঞানযোগী আলাম্মা  মোহাম্মদ ইকবাল আবার পাঠ নিমগ্ধতায় ডুবে গেলেন।
                        আচার্য শহীদুল্লাহ এভাবেই তাঁর ইকবাল চর্চার কথা মুখ রেখেছেন। শহীদুল্লাহ লিখছেন;
” তাঁহার মাতাপিতা পরম ধর্ম পরায়ন ছিলেন। তাঁহার  পুর্বপুরুষ কাশ্মীরবাসী  ব্রাহ্মণ ছিলেন ।ইকবাল এই বংশ গৌরব ভুলিতে পারেন নাই।”
                 এই প্রসঙ্গে ইকবালের ই একটি  কবিতার বঙ্গানুবাদ করেছেন শহিদুল্লাহ;
            ”  আমাকে দেখো,  কেননা হিন্দুস্থানে তুমি দেখিবে না / এক ব্রাহ্মণ- সন্তান যে হইয়াছে রূমির ও শম্ স – ই- তবরীযের  রহস্যবিদ ।”
                      সাধারণভাবে আমাদের ধারণা, উনিশ শতকে   অভিজাত  বা অনভিজাত — যে কোন মুসলমানের কাছেই  ইংরেজি শিক্ষা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। শহীদুল্লাহ লিখছেন ;
                   ” সে যুগে মুসলমান সন্তানের পক্ষে ইংরেজি শিক্ষা পাপ বলিয়া গণ্য হইত।যাহারা পড়িত ,লোকে তাহাদিগকে  খ্রিস্টান বলিত। কিন্তু ইকবালের পিতা শেখ নূর মোহাম্মদ  ইংরেজি শিক্ষা দিতে উৎসুক ছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন,  কালের সঙ্গে তালে তালে না চলিতে পারিলে মুসলমান সমাজ উঠিতে পারিবে না।”
                  ছাত্র জীবন থেকেই ইকবালের মেধা,  সত্যবাদিতা এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের  যে পরিচয় শহিদুল্লাহ এঁকেছেন,  সেই ছবি সাধারণ বাঙালির কাছে অজানা ।শহীদুল্লাহ লিখছেন;”
               তাঁহার ছাত্র জীবনের একটি ঘটনা অনেকের নিকট হতে মুখোরোচক হইবে। তিনি একদিন কিছু বিলম্ব করিয়া ক্লাসে উপস্থিত হন ।শিক্ষক কৈফিয়ত চাহিলেন। ইকবাল ত্বরিত  উত্তর দিলেন,’  স্যার ইকবাল ( এই ‘ ইকবাল’ শব্দটির অর্থ সৌভাগ্য) বিলম্বে আসে। মাস্টার সাহেব তাঁহার এই  উপস্থিত উত্তরে চমৎকৃত হইলেন ।”
                     ইকবালের জ্ঞান সাধনা প্রসঙ্গে শহীদুল্লাহ এক আরবি কবির উক্তি উদ্ধৃত করেছেন;”
                 শ্রম অনুপাতে করো উন্নতিসাধন, যে চায় উন্নতি করে রাত্রি জাগরণ। যে জন মুকুতা চায় ডুবে  সিন্ধু জলে।তবে তো সৌভাগ্য লাভ ভাগ্যেষতার ফলে। শ্রম বিনা উন্নতি যে করে আকিঞ্চন, অসম্ভব আশা তার, বিফল জীবন।”
                    উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপে গিয়ে প্যান ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি সঙ্গে ইকবালের পরিচয় ও একাত্মতা গড়ে ওঠে। প্রথম জীবনে লন্ডনে ছাত্র অবস্থায় সেখানকার ভারতীয় মুসলিম ছাত্রদের সংগঠন আঞ্জুমান ই ইসলাম ঘিরে ব্রিটিশদের নানা  ওজর আপত্তির নিরিখে এই সংগঠনের নাম করনে র সঙ্গে ‘প্যান ইসলামিক ‘ শব্দটি যুক্ত করে সেই বয়সেই ইকবাল অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
                 প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় যে,  সাধারণভাবে উনিশ – বিশ শতকের  নবজাগরণ ঘিরে যাঁরা আলোচনা করেন, তাঁরা এই জাগরণে মুসলমান সমাজের ভূমিকার  প্রায় উল্লেখ ই করেন না।বিশ শতকের  সূচনাপর্বে বাঙালি মুসলমানের ভিতরে আধুনিক শিক্ষার প্রতি যে ধীরে ধীরে উৎসাহ তৈরি হতে শুরু করেছিল ,তার প্রমাণস্বরূপ ইকবালের   জীবন ও কর্ম আলোচনা প্রসঙ্গে মহাকবির প্রথম লন্ডন আগমন ঘিরে সেই সময়ে লন্ডনে অধ্যায়নরত আব্দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর( পরবর্তী কালে ডক্টরেট)  কথা আচার্য শহীদুল্লাহ উল্লেখ করেছেন।
এই আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী হলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান শিক্ষাবিদ।
                            বাঙালি মুসলমানের ভেতরে যদি বিশ শতকের সূচনাপর্বে আধুনিক শিক্ষা সম্পর্কে এতই অনীহা থাকে তাহলে বাঙালি ছেলে আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে ইংল্যান্ডে গিয়ে পড়াশুনো এবং আঞ্জুমান ই ইসলাম নামক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, যে সংগঠনের কাজ ব্রিটিশৃরা  আদৌ ভালোভাবে নেয়নি। তা সম্ভবপর হতো না।
                           ইকবাল তাঁর জীবনে বহু মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন ।দেশে বিদেশে বহু পণ্ডিতের  প্রত্যক্ষ ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল,  কিন্তু এসব সত্ত্বেও তাঁর বাল্য শিক্ষক মীর হাসানের প্রভাব ইকবালের  বাকচাতুর্য নির্মাণের প্রধান স্তম্ভ ছিল বলে শহীদুল্লাহ মন্তব্য করেছেন।
                   তিনি লিখছেন;
             ”  একবার পাঞ্জাবের দুই প্রখ্যাত রাজনৈতিজ্ঞ  ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠকি আলাপে ইকবাল বললেন যে , ইহাদের একজন শয়তানের তাবেদারী করিতেন এবং তাহাকে  খুশি করার জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন ।অপরজনকে শয়তান ভয় করিত এবং তাহার সহিত বন্ধুত্ব করতে আগ্রহান্বিত  হইয়া বলিল,’ আমরা উভয়েই এক,  আসুন হাত মিলিয়ে চলি।”
                         শহীদুল্লাহ লিখছেন;”  ইংরেজ সরকারের স্যার পদবি  গ্রহণের সময় ‘সরকার কী দহ্ লিজ পে সর হো গয়ে  ( সরকারের চৌকাঠে ইকবাল নত করিয়াছেন শির)  যারা বলিয়াছিলেন, তাঁহারা নিশ্চয়ই পরবর্তীকালে দেখিয়েছেন যে ইকবাল ব্রিটিশ সরকারের নীতির সমালোচনায় কখনো পিছপা হন নাই। সাইমন কমিশনের সাক্ষ্যে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে,’ ব্রিটিশের বন্দুকের তলায় হিন্দুরা মুসলমানদের শাসন করিতেছে।’ শহীদগঞ্জ মসজিদ ব্যাপারে প্রিভি কাউন্সিলে মামলা দায়ের করার ব্যাপারেও ইকবাল বলিয়াছিলেন যে,  ব্রিটিশের ন্যায়বিচার শক্তির উপর তাঁহার  আস্থা নাই ।”
                      আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে ভারতবর্ষের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকরা যখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদে খানিকটা দ্বিধান্বিত   তখন কোন কিছুর ভ্রুকুটি না করে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি জালিওয়ানালাবাগের ওই বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইকবালের সোচ্চার উচ্চারণ নিয়ে আমাদের দেশে প্রায় আলোচনা ই হয় না বললে চলে।
                 শহিদুল্লাহ লিখছেন;”  ইকবালের জীবনের শেষভাগে পৃথিবীর ও ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক কিছু গুরুতর ঘটনা ঘটে ।পৃথিবীর প্রথম মহাসমর, ভার্সাই সন্ধি , ভারতবর্ষে রাওলাট অ্যাক্ট, জালিওনালাবাগের   হত্যাকান্ড , খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন,  তুর্কিতে সাধারণতন্ত্র স্থাপন ও খিলাফতের বিলোপ সাধন — এইগুলি পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় থাকবে। ইকবাল কোনও  আন্দোলনে আন্দোলিত হন নাই। তিনি ভীষণ ঝড় ঝঞ্ঝাবাতের মধ্যে হিমালয় গিরির ন্যায় অটল অচল থাকিয়া নিজের ধ্যানেই মগ্ন রহিলেন। রাজনৈতিক চেতনা তাঁহার তীব্র ছিল। রাজনীতিতে তিনি এক প্রকার বিপ্লবীই ছিলেন। কিন্তু তিনি সমসাময়িক রাজনীতিতে কোন ও প্রধান অংশগ্রহণ করেন নাই ।এ বিষয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের সহিত তুলনীয় ।রাজনৈতিক নেতা হইবার আকাঙ্ক্ষা ইকবালের কোনো কালেই ছিলনা।
                তবু তাঁহার  বন্ধু-বান্ধবদিগের সনির্বন্ধাতিশয্যে তিনি  ১৯২৬   সালে পাঞ্জাব লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের  সদস্য পদপ্রার্থী হন ।তাহাতে  অনায়াসে কৃতকার্য হইয়া তিনি প্রদেশের রাজনীতিতে যোগদান করিয়া কয়েকবছর সুনামের সহিত মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশের সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে ব্যাপকভাবে সুনিশ্চিত অভিমত ব্যক্ত করেন। এই সদস্যরূপে কাউন্সিলের অধিবেশনে তিনি কৃষক ও মজুরদের সমস্যা,  রাজস্ব ও আয়কর ইত্যাদি বিষয়ে কয়েকটি মূল্যবান মতামত প্রকাশ করেন।”
                          পরবর্তীকালে তিনি অবশ্য কখনো সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি  এ সম্পর্কে ইকবাল  খুব স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন; ” লোকে নিজের কোনো না কোনো স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কাউন্সিলের যায় ,আমার তো নিজের কোন স্বার্থ নাই  “।
                    ১৯৩০  সালের ২৯ শে  ডিসেম্বর সারা ভারত মুসলিম লীগের এলাহাবাদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন ইকবাল। সেই অধিবেশনে তাঁর ভাষণকে ঘিরে তাঁকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের এবং পাকিস্তানের অন্যতম স্থপতি বলা হয় ।এ সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শহিদুল্লাহ লিখছেন ;”
              ইহা লক্ষ্য করিবার  বিষয় যে তিনি ওই অভিভাষণে পাকিস্তান পরিকল্পনার আভাস দান করেন ।তাহার পূর্বে অবশ্য  ১৯২৫ সালে পাঞ্জাবের’ বীরকেশরী নেতা’  ও ভারতীয় কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার প্রথম সভাপতি লালা লাজপত রায় এইরূপ মুসলিম স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রের প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী ও আরো কয়েকজন ভারতীয় ছাত্রের ঐ রূপ মত ছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদী কোনও  সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ই  ইহার গুরুত্ব তখন ও উপলব্ধি করেন নাই ।এমনকি ১৯৩৩  সালে জয়েন্ট কমিটি অফ কনস্টিটিউশনাল রিফর্মের বিবরণীতে   প্রকাশ যে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ ই ইহাকে ছাত্র দের স্বপ্ন (স্টুডেন্ট  স ড্রিম), উদ্ভট ও অবাস্তব বলিয়া মন্তব্য করিয়াছিলেন।”
                 এই প্রসঙ্গে চৌধুরী খালিকুজ্জামান ‘ পাথ ওয়ে  টু পাকিস্তান’  গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে ও শহীদুল্লাহ দেখিয়েছেন ,ইকবালের ওই ভাষণ সেই সময় কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। এমনকি সম্মেলনের কার্যবিবরণীতে পর্যন্ত কোনো প্রকার লিখিত বিবরণ বা প্রস্তাব হিসেবে সেটি গৃহীত হয়নি ।
                   বিষয় টি নিয়ে শহিদুল্লাহ জিন্নাহের  জীবনী কার হেক্টর বালিথোর  ‘জিন্না, ক্রিয়েটার  অব পাকিস্তান’  গ্রন্থ থেকে ও বিস্তারিত উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
                   ইকবালের রচনাবলীর যে সামগ্রিক পরিচয় শহিদুল্লাহ তাঁর ইকবাল সম্পর্কিত  গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,  তা নিয়ে আজ পর্যন্ত এপার বাংলায় সেভাবে আলোচনাই হয়নি –এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্য পরিতাপের বিষয় ।ইকবাল রচিত ‘ বাঙ্গ ই দরাবাংলা , অর্থাৎ; ঘণ্টাধ্বনি , আসরার ও রুযুম–  রহস্য ও গুপ্তকথা , পয়াম ই মশশিক–  প্রাচ্যের বাণী , যবূর ই আজম –আরব দেশীয় মহা গীতি , জাওঈদ নামা– অমর গীতি,  বাল ই জিব্রীল–  জিব্রাইলের ডানা , যর্ ব ই কলীম– মুসার যষ্টি আঘাত,  পস্ চি বায়দ কর্দ-‘অতঃপর কি কর্তব্য,  আরমুগান ই  হিজাব –হিজাবের উপঢৌকন,  দি রিকনস্ট্রাকশন অফ রিলিজিয়াস থট অন ইসলাম ইত্যাদি গ্রন্থাবলী  ভারতীয় সভ্যতার ঐতিহ্য শীল,  সমন্বয়ী চিন্তা-চেতনার ধারাবাহিকতার  এক জীবন্ত দলিল।
                      আচার্য শহীদুল্লাহ যেভাবে ইকবালের ভাবনা ,আর্থ-সামাজিক- সাংস্কৃতিক -ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের নিরিখে আজ থেকে প্রায় আশি- নব্বই  বছর আগে বাংলার তথা বাঙালির  সমাজ জীবনের সামনে তুলে ধরে গেছিলেন, তা আজকের দিনের প্রেক্ষিতে আবার নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরা একান্ত জরুরি।
                          শহীদুল্লাহ ইকবালের অনুবাদ করে লিখছেন;
            হে ভারত তোমার দৃশ্য কাঁদায় আমাকে,   সকল উপাখ্যানের মধ্যে তোমার উপাখ্যান উপদেশপ্রদ।
                   তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ জাওঈদ  নামা’ র আর অনুবাদে  শহিদুল্লাহ লিখছেন;
             দেশের সাথে দেশবাসীর এক বিশেষ সম্পর্ক আছে , কেননা তাহার মাটিতে একরূপ জাতীয়তার উদয় হয় ।……..(হে ব্রাহ্মণ! )  তুমি মনে করে পাথরের মূর্তি তে খোদা আছেন,  আমার কাছে স্বদেশের ধূলির প্রতিটি কনাই দেবতা ।
                এই টি ই  হলো মহাকবি ইকবালের   জীবনবোধের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি ।ভারতীয় সংস্কৃতির এই সুমহান ঐতিহ্য বাংলা তথা বাঙালি সমাজের কাছে প্রথম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছিলেন ভাষাচার্য শহীদুল্লাহ ।তাঁর এই ইকবাল চর্চা ছিল পবিত্র ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির ভিতরেই সমন্বয়ী চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশের লক্ষ্যে যাত্রা পথের এক শুভ সূচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *