Skip to toolbar

লক ডাউন- ইঁদুলআরার ইন্দিরে মাসী
গৌতম রায়
নড়বড়ে জানলার পাল্লাটা খানিক্ষণ ধরেই দরাম দরাম করে পড়ছিল।ঘুমের ঘোরে আওয়াজটা কানে এলেও পাত্তা দেয় নি ইঁদুলআরা।বৃষ্টির ছাটটা গায়ে লাগার পর আর গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকাটা সম্ভব হল না।চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে নিজের গালের মতোই তোবড়ানো জানলার কপাট দুটো দড়ি দিয়ে কষে বাঁধতে গিয়ে ইঁদুলের মনে হল,ফজরের আজান পড়তে কতো দেরি?
                          ইঁদুলের কাছে আজানটা খোদাতালার দরজারে নামাজ আদায়ের সঙ্কেতবাহী নয়।আজাদের তাল রেখে বৌচন্ডীর মাঠের ধারের বিলে যাওয়ার আহ্বান হয়ে ফজরের আজান তার কাছে উঠে আসে।এভাবেই নীতিনীষ্ঠ নামাজির মতোই এশার আজান ও তাকে তার এই অকেজো ,ক্লান্ত ,শোকতপ্ত শরীরখানাকে একটু জিরিয়ে নেওয়ার হাউসে মাদুর টার ভালোবেসে এত্তেলা পাঠানো।
                       কথোয় কি রোগ হয়েছে, তাই ট্রেন সব বন্ধ হয়ে গেল বলে।রোজ ই শিয়ালাদা থেকে রাত থাকতে ট্রেনে উঠতে এমনটা শুনে আসছে ইঁদুলআরা।একে তো বাজারে বসতে দেয় না মিসবালটির নতুন বাবুরা।তাই নৈহাটি বাজার ছেড়ে এখন কাঁকনাড়া র মুসপালটির সামনে বসে ইঁদুল।এই কদিন আগে ভোটের সময় কিসব হলো।কতোদিন বাজার বসে নি।তখন মদনপুরের রতনের মা চুপি চুপি তাকে বলেছিল;
                       এই যে ইন্দুরবিবি।হেঁদু- মোছলমান আবার গোল বেইন্দেচে।একেনে হেঁদু নেতা জিতিচে।তুমি তোমার নামটে মোছলমানী করে আর কয়ো নি কো।বুইয়েচো? বইলবে ইন্দিরে।
                       সেই থেকে কাঁকিনাড়া তে বাজারে বসতে না পারলেও বাসরাস্তার ধারে, ফুটপাতের উপরে ডুমুর ,কলমী, কুলেখাড়া, থানকুনি নিয়ে বসা ইঁদুলআরা ,হয়ে গিয়েছে ইন্দিরে মাসী।দাদা,পরদাদার সহবতে ইঁদুলআরা আল্লার কসম খেত।পেটের কসরতে এখন সে কালীর কিরা কাটে।পাঁচ ওয়াক্তি নামাজি হওয়ার সময় তার কোনো দিন ছিল না।তবে আজ ও এশার কালে সেজদা দিতে গিয়ে খোদাতালার কাছে হেফাজত চেয়ে নেয় সে।
                       মৌলবীরা সেবার তার গাঁয়ে এসে জালসা করে বলে গিয়েছিল, খোদার কাছে হাফিজুল চাইবা না।হুজুরের সেই চিৎকার; কি বললাম? সমবেত জনতার প্রত্তুত্তর, কেমন যেন এইসবে ভ্যাবাচাকা খাওয়ার মাঝেই ইঁদুল শুনেছিল,সাদা আলখাল্লাতে সারা শরীর ঢাকা হুজুর সাহেব বলছেন; হাহিজুল চাইবা আল্লাতালার কাছে।তারপর থেকেই ইঁদুল দেখতে থাকলো, গাঁয়ের মসজিদের ইমাম সাহেব থেকে পাশের ঘরেকে তালবেলেম টাও,ট্রেন থেকে কেনা লেবেনচুষ পেলে পরে আর খোদা হাফেজ বলে না।বলে আল্লা হাফেজ।
                          ইঁদুল ভাবতে থাকে, আজ যাবে নাকি ইস্টিশনের দিকে।সক্কলে যেমন কাল বলত্যেছেলো, গাড়ি নাকি বন্ধ হয়ে যাবে।যদি গিয়ে আর ফেরার গাড়ি না পায়? চিন্তাটা আঁদুলের মনে তাড়া করতে থাকে।সেই চিন্তাটাকেই একটু অন্যখাতে বইয়ে দেয় পিঠের চুলকুনিটা।
                                        বের পর একবার খালাশাউড়ির বাড়ি গেছিল ইঁদুর তাঁর মরদের সাথে।ট্রেনে করে সকলিগলিঘাটে নেমে বালির ঝড় পেরিয়ে স্টিমার।তারপর আবার ট্রেন।অমন কতো অজানা পথ বেয়ে কোচবিহারের ঢানঢিঙগুড়িতে গদাধরের পাশে তার খালা শ্বশুড়ের বাড়ি পৌঁছেছিল।পরের দিন মাঠ করতে নদীর ধারে গিয়ে জল বিছুটি লাগিয়ে ফিরে কিছুতেই ব্যাপারটা বাড়ির লোককে বোঝাতে পারে নি ইঁদুল।  
                           শেষে তার খালা শাশুড়ি বলে; বুইচি, ছোতরাপাতা লাগছে।তা ওই চুলচুইল্লা গাছের বাদারে গিছিলি কেনে তুই।
             বসিরহাট বাজারে কিছুদিন ছাতু ( পাতালকোড়) বেচতো ইঁদুলের মরদ।বসিরহাটে যশোর,সাতক্ষিরের লোক ভর্তি।সেখানে ইঁদুল শোনে বেশোতক্তা পাতা অস দে নাকি কুষ্ঠু রুগী ও ভালো হয়ে যায়।
                এরাকিন মোল্লা, বসিরহাটের ধলতিতে গাঁয়ের হেকিম সাব।ইঁদুলের মরদের বুকধরফরানির তরে কয়েছেলো; বেশোতক্তার অস দে দাওয়া বানাবে।যে দাওয়া খেইলে মরদ তার ভালো হয়ে উঠবে।
                বসিরহাটের ছেইল্যে আকাশ মাষ্টার তার ইঁদুলমাসীকে বলেছিল ; এরাকিন হেকিম ভুল বলেনিকো তোমারে।এগিয়া ইভোলুকাড়াটার রসে ট্রাকি কার্ডিয়া সারে গো মাসী।
                   এসব বলেই আকাশ মাষ্টার বুঝেছিল, তার ইঁদুলমাসী কিছুই বোঝে নি।তাকে বোঝাবার চেষ্টা যখন সে অবিরাম করে যাচ্ছে,তখন হিন্দিভাষী খৈনিওয়ালা ইঁদুল কে বলেছিল;
                  ও মৌসি, তু পিতপরানি গাছ কো নেইখে চিনত?
                     খৈনিওয়াল কথা শুনে সুনুন্দা বুড়ি, হাঁস,মুরগির ডিম বেচে; নিখাদ মাতৃভাষায় বলে ফেলে;
                  কাসালাক্কু তমো ন চিনচো মাস্ সী?
               একদম ভাষাতত্ত্বের ক্লাস হয়ে যাচ্ছে দেখে আর কথা বাড়ায় নি আকাশ মাষ্টার।
                           কাল বৌচন্ডীর মাঠের ধারে ডোবাটাতে নেমে সুষনি শাক তুলতে গিয়েছিল ইঁদুল।কদিন ধরেই একটা আধ বুড়ো এদিক ওদিক খুব সুষনি শাকের খোঁজ করে।বুড়োর নাকি ঘুমের ব্যায়রাম আছে।নোকে তাকে বলেচে, সুষনি শাক ভাজ্যা খাও দিকি নি।দেখবে একদম কুম্ভকন্নের মতো ঘুমোবে।কোনো ওসুধ লাগবিনি কো।
                     বুড়ো টা এদিক ওদিক খুব ঘুরেছে ওই রাস্তার বাজারে।কেউ ই ঠিক মতো সুষনি শাক এনে দেওয়ার কথা বলতে পারে নি তাকে।বুড়ো শুধিয়েছিল ইন্দের মাসীকে;
                       তুমি পারবে মাসী? সবাই বলছে, সুষনি শাক খেলে ভালো ঘুম হয়।কতো ওসুধ খাই গো।ঘুম আর আসে না।
                      সেই বুড়োটাকে কথা দিয়েছিল ইঁদের মাসী সুষনি শাক এনে দেওয়ার।কাল পুকুর ধার থেকে কতো শাক তুলেছে সে।দুয়োওরের বাইরে খপরের কাগুজে বিচিয়ে রেকেছিল্য ইঁদুল।পাশে নষ্ট হয়ে যায়।পানির হাউসে রাতেই আবার সেসব ঘরে তুলে বুড়ি।
                        বচ্চরটাক যখন কাঁকনাড়া বাজারে বসছে ইন্দের মাসী হয়ে তখন তার একমাত্র অসুবিধে ছিল কথায় কথায় পানি খাওয়ার হাউস আর আল্লার কিড়া কাটা।এই এক বচ্চরের ভিতরেই বাজারের বজরংবলীর লাড্ডু আর শিবের থানের খিঁচুড়ি তার পেট বাঁচিয়ে আল্লা – শিব- বজরংবলী – জল আর পানি কে কোথায় ঘেঁটেঘুঁটে দিয়েছে, সে নিজেও ভালো করে মালুম করতে পারে না।
                ছোঁয়াছানির রোগের তরাসে রেলগাড়ি বন্ধ হতে পারে, এমন বেতমিজ, বেশরমী কথা ইঁদুলের দাদা কোন ছাড়,পরদাদাও শোনে নি।ছোঁওয়া ছানির রোগ , তা সে অপাড়া , কুপাড়া যেসব জোয়ান মদ্দ যায়, তাদের হয় বৈ কি কখনো সখনো, তা বলে দেশ – গাঁ সুদ্দু ব্যাবাক লোকের ছোঁওয়া ছানির ব্যামো?
                        সেদিন বাজারে যেতে না পেরে পাশের ঘরের দুগ্গার মা তারকদাসীকে সব শাক পাতা দিয়ে দিয়েছিল ইঁদুল।এসব না দিয়ে তো তার উপায় ছিল না।বচ্চর টাক তার অব্যেস হয়ে গেছে বাজার সেরে শিবের মন্দিরে খিচুড়ি খেয়ে ফিরতি ট্রেন ধরার।রাত্রে সদু ময়রার দোকান থেকে দু টাকার রসগোল্লার রস আর রাসুল্লির কাছ থেকে দুটো রুটি।এতেই রাতের খাওয়া সারে ইঁদুল।উনুনের পাট আর বাড়ি ঘরে রাখেই নি বুড়ি।সকালের চা টা বড়ো রাস্তায় রাজকুমারের দোকান থেকে সেরে নেয়।
                         লোকে বলে রাজকুমার নাকি ওর বৌকে পেটায়।তা নিয়ে কতো থানা- পুলিশ ও হয়েছে।তবে সেই রাজকুমার ই ইঁদুরনানীকে দেখলে চায়ের সাথে দুটো পটল বিস্কুট রোজ দেয়।দাম দিতে গেছিল বুড়ি।একদিন, দুদিন কখনো নিয়েছে, কখনো নেয় নি বিস্কুটের দাম রাজকুমার।শেষে একদিন বেশ ঝাঁঝের গলাতেই বলেছে;
                          ঠাঙ্ মা, আমি না হয় খারাপ ছেলে।বৌ পেটাই।তা আমি তো পুরুষ মানুষ।যতো দোষ আমার ।তাই সই।তাবলে তোমার পানা আমার একটা ঠাঙ্ মা ছ্যেলো গো ।জ্যাটার মেয়েদের নুকিয়ে আমার নেগে কমলা নেবু আনিচিল বলে জ্যাঠার মেয়েরা বুড়িকে কি খিস্তি দ্যালো।তুমি আমার সেই ঠাঙ্ মা।বিস্কুটির দাম না হয় লাতিটাকে নাই বা দিলে ।
                           তিন কালে কেউ না থাকা ইঁদুলের মনে হয়েছিল ,সে হয়তো একা নয়।আত্মীয়হারা ,স্বজনহারা, কারবালার মাতমে সে বোধহয় নিঃসঙ্গ নয়।
                            লক ডাউনের প্রথম দুটো দিন পাশের ঘরের দুগ্গার মা তারকবালা দুপুরের ভাতটা দেয় ইঁদুলআরা কে।ইঁদুল এই দুটো দিন একটা ছেঁড়া চটের থলেকে জায়নামাজ করে আসের, মাগরিবে নামাজ আদায় করে।বার বার সেজদা দেয় খোদাতালার দরবারে।এমন তরো চললে খাবে কি সে? ঘরে যে কুড়িটার বেশি টাকা নেই।উনুন, রান্নার হাড়িপাতিল, কাঠকুটো– সে সবের সাথে তো আজ কতোকাল এতোটুকু সম্পর্ক ই নেই।নৈহাটিতে যখন বাজারে বসতো, বাজার শেষে ফেরার পথে, তিনটে, সাড়ে তিনটে নাগাদ পাকিস্থান বাজার লাগোয়া কোনোদিন পাঁচ টাকায় সবজি ভাত, একটু হাতে টাকা থাকলে দশ টাকায় মাছ ভাত খেতো।এতো বেলায় ঝটতি পটতি যা থাকতো সেই হোটেলে, বেশ কম দামেই জুটে যেত ইঁদুলের।
                       কাঁকনাড়া বাজারে তো সে ইন্দের মাসী।পাশে নারকোল,কলা নিয়ে বসা মদনপুরের বুড়িটা এইসা বড়ো তিলক টেনে দিতো ইঁদেরের নাকে।সেই রসকলির জেরে ইঁদুলআরা, ইন্দের মাসী হয়ে রোজ শিবের ভোগ খিচুড়ি পেত।
                         একটু যেদিন দেরি হয়ে যেত, পাশের রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে দেহাতি বৌ,বুড়িদের সাথে কেত্তন গাইতে বসে যেত ইঁদের।মনে মনে গুনার জন্যে খোদাতালার আরসে বার বার মাথা ঠুকে গলা ছেড়ে চ্যাঁচাত,হরেঅঅঅঅঅ কিকিকিকিকি ষ্ণ ওওওওওওও করে।কেত্তন শেষে বেশ পেট পুরেই কোনোদিন দইচিঁড়ে মাখা, কোনোদিন কলাটা, শশা টা জুটে যেত।সেদিন আর রুটি নয়।রসোগোল্লার রস তো নয় ই।দু দুটো টাকা আস্ত খরচ করে রাতে সেটা খাওয়ার পর এক পালি  পানি খেয়ে ঘুমের রাজ্যে ঢলে পড়তো বুড়ি।
                    বাবুদের বাড়িতে এই লক ডাউনের কালে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স কতোটা বেড়েছে ,তা নিয়ে সোশাল মিডিয়াতে গবেষণা কি রকম চলছে, টিভিতে চায়ে পে চর্চাতে শোভা বাজারের সেই ছেলে খুন করা বৃদ্ধ কতোটা ঠাঁই করে নিতে পেরেছে, সে সম্পর্কে রাজকুমার বা তার বৌ ইলার কোনো ধারণা কল্পনা শক্তির শেষ বিন্দুটি খাটিয়েও আসবে না।তবে প্রতিবেশিরা সবাই আন্দাজ করছে, এই বন্ধির বাজার , নক ডাউনের হালচালের পেটের তাড়াসে আর বোধহয় রাজকুমার আর ইলার চুলোচুলি ঘিরে তাঁদের মহল্লায় মামাদের কখনো ঢুকতেই হবে না।
              শোনো ঠাঙ্ মা, তোমার এই লাতি,লাত বৌ যদি খেতি পায়, তোমার এই নক ডাউনের কালে প্যাটের ভাত্যের অবাব হবে নি কো- ইঁদুল কে বলে রাজকুমার।
                    সেই থেকে এই কটা দিন রাজকুমারের বৌ কখনো ইঁদুলের ঘরে এসে খাবার দিয়ে যায়, কখনো বা ইঁদুল কে ধরে নিয়ে যায় তাদের ঘরে।আসলে হিন্দু- মুসলমানের ছোঁয়াছানি, এইসব ভদ্দরলোকিপানা এঁদের কারুর ই নেই।কারণ, এঁরা তো কেউ ই শহুরে ভদ্রলোকদের মতো রিফাইন্ড জেন্টলম্যান নয়।শহুরে রিফাইন্ডনেস এঁদের কোনোদিন ছিল না।হবে ও না আর কোনোদিন ও।
                      ইঁদুলকে সাথে নিয়ে চালের রিলিফে এসেছে রাজকুমার।পাট্টির লোককে বলে সে;
                           এনি আমার ঘরের পাশ কে থাকে।এনিকেও একটু চাল দ্যাও গো দাদা।
                         রিলিফের দলের ভলেন্টিয়ার টা বলে, সকালে তো ওদের পার্টি থেকে ভালোই বাগিয়েছো।
                            ইঁদুলের ব্যাগে ভলেন্টিয়ার চাল ঢেলে দেওয়ার পর তাদের নেতা বেশ ভারিক্কি চালে , সঙ্গীত শিল্পীদের মতো ফলস ভয়েসে বলে;
                            জানি তুমি তোমার মা কে নিয়ে এসেছো বাড়তি চাল নিতে।তোমাকে আমরা মুখ চিনি।তা বলে  নিজের মাকে অন্য বাড়ির লোক বলো না।যাও আজকে তোমার সাথে তোমার মাকেও আলাদা করে চাল দিয়ে দিলাম।
                              ইঁদুলআরা ধীর পায়ে রাজকুমারের সাথে রাস্তায় পা দেয়।দুজনের ই হাতে ধরা রিলিফের চালের বস্তা।
                 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *