ঝড়ের পাখি: ডিরোজিও
গৌতম রায়
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কার্ল মাক্স লিখছেন;  কলকাতায় ইংরেজদের তত্ত্বাবধানে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অল্প পরিমাণে শিক্ষা পাওয়া ভারতের দেশীয় অভিবাসীদের ভেতর এমন একটি শ্রেণী গড়ে উঠেছে ,যাঁরা  সরকার পরিচালনায় যোগ্যতা সম্পন্ন ।তাঁরা ইউরোপীয় বিজ্ঞানে সুশিক্ষিত।
                        এই ধারাতে ই  উনিশ শতকের নবজাগরণ, যার মূলে রয়েছে হিন্দু কলেজ, ডেভিড ড্রামন্ডের ,’ধর্মতলা একাডেমী’  ডিরোজিও (১৮০৯,১৮ ই এপ্রিল-১৮৩১, ২৬ শে ডিসেম্বর) এবং তাঁর শিষ্য গান, যাঁদের ইয়ংবেঙ্গল বলা হয়,  রাজা রামমোহন,   বিদ্যাসাগর ,মাইকেল মধুসূদন প্রমূখ।
                       তবে নবজাগরণের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অনুল্লেখিত থেকে গেলেও এ কথা বলতে হয় যে ,প্রথাগত আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সেই ভাবে না পেলেও দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিন (  ১৭৩৩-১৮০৯) যেভাবে তাঁর গোটা জীবন ধরে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার চর্চার ভেতর দিয়ে , নানা ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন, তার বিচার বিশ্লেষণ করে বলতে হয়  যে , তিনি হলেন আধুনিক ভারতের প্রথম  ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক  মানুষ ।
                               ১৮১৪  সালে রামমোহন কলকাতায় আসেন ।জ্ঞান বিজ্ঞান চিন্তা এবং দর্শনের ক্ষেত্রে রামমোহন বাংলা তথা ভারতের অতীতের সামাজিক পরিকাঠামোর খোলনোলচে বদলে ফেলবার প্রাথমিক কাজ, যেটি হাজি মহঃ মহসিন শুরু করেছিলেন, সমসাময়িক কালে  সেই টিকে একটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। ডিরোজিও, সেই গোটা পর্যায় ক্রমের ভিতরে যেন একটি যোগসূত্র রচনা করেছিলেন।
                              উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের উৎসমুখে অন্যতম প্রধান কীতিস্তম্ভ রচনা করেছিলেন ডিরোজিও।মাত্র  ১৭ বছরের এক তরুণ শিক্ষক ,যাঁকে আমরা বলতে পারি ,নব যুগের প্রবর্তক ,যাঁকে আমরা অভিহিত করতে পারি বাংলার সক্রেটিস হিশেবে।আধুনিক ভারতের মানব  বিপ্লবের তীর্থকেন্দ্র হলো হিন্দু কলেজ।আধুনিকতার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অন্যতম সেরা কীর্তি স্তম্ভ হলেন মানব বিপ্লবের তীর্থকেন্দ্রের অন্যতম প্রধান রচয়িতা হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।
                      একটা প্রচন্ড ভূমিকম্প সামাজিক ক্ষেত্রে যে ধরনের অদলবদল ঘটাতে পারে না , তেমন টাই অদলবদল ঘটিয়ে দিয়ে গিয়েছেন বাংলার সামাজিক ক্ষেত্রে এই ডিরোজিও এবং তাঁর শিষ্যেরা, যাঁরা ,’ইয়ংবেঙ্গল ‘ নামে পরিচিত।  নয়া বাংলার আধুনিক চিন্তা চেতনার তাঁরা অগ্রদূত।
                     ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ।আর সেখানে ১৮২৬  সালে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ডিরোজিও।  জন্ম পরিচয় ইউরোপীয় হলেও  ,বাংলার এবং বাঙালি সমাজের জন্য ডিরোজিওর অবদানের জন্যে তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা বাঙালি হিসেবে অভিহিত করতে পারা যায়।
                         ১৭৫৭  সালে পলাশীর বিপর্যয়ের পর মুর্শিদাবাদ থেকে সব কিছু সরতে শুরু করেছে তখন।নতুন শিল্প শহর কলকাতা, নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার প্রাণচাঞ্চল্যে তখন সবে মুখর হতে শুরু করেছে ।সামন্ততন্ত্র কে খানিকটা পাশ কাটিয়েই নতুন করে গড়ে উঠছে ধণতন্ত্রের নয়া পরিকাঠামো।  শিল্প সভ্যতার এক ধরনের ইমারত ।এইরকম একটি সময়ের ভেতরে উচ্চবিত্ত জমিদার, সামন্ততান্ত্রিক  পরিবারগুলির  ভেতর বিদ্যাচর্চা তে আগ্রহী এবং অত্যন্ত বেশি রকমের ঐশ্বর্যবান তরুণরা তখন হিন্দু কলেজের ছাত্র।
                     ডিরোজিওর চিন্তাধারার আধুনিকতায় এই ছাত্রেরা ক্রমশ মুগ্ধ হচ্ছেন তখন।মন মানসিকতার ঔদার্য এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি পাশ্চাত্য সাহিত্য ও মননে আলোকপ্রাপ্ত হয়ে ডিরোজিওর এই সব ছাত্রেরা, যাঁরা ইয়ংবেঙ্গল নামে পরিচিত,  বাংলা র সামাজিক ইতিহাসে  তখন ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। এঁদের ভেতরে আছেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ ,রসিক কৃষ্ণ মল্লিক ,শিবচন্দ্র ,যাদব ঘোষ, হরচন্দ্র ঘোষ ,প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদার, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ,তারা চক্রবর্তী প্রমুখেরা।
                      এই সময়ে ,অর্থাৎ;  ১৮৩১  সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যালকাটা মান্থলি  জার্নাল পত্রিকাতে  হিন্দু কলেজের  এক  ছাত্র একটি চিঠিতে লিখলেন ;
                      ইংরেজরা ভারতবর্ষে জয় করার আগে এদেশে মানুষ বর্বরতা স্তরে ছিল ,ইংরেজিদের এই  কথা মনে করবার অধিকার কে দিয়েছে ? ভারত  শিল্প সমৃদ্ধ উন্নত এবং সভ্য দেশ ।আর আমেরিকার দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে ,ইংরেজদের পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করে ,স্বাধীনতা অর্জন করতে পারলে তবেই ভারতবাসীর দুর্গতির মোচন হবে।
                       ছাত্রদের মনে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগিয়ে তোলা -‘ এটি হলো ডিরোজিও র  জীবনের সবথেকে বড় কীর্তি ।তিনি  ছাত্রের জন্যে  অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করে ,বিভিন্ন পত্র পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। সেই উদ্যোগটিকে আমাদের দেশের প্রথম ছাত্র সংগঠন তৈরি প্রথম আয়োজন।  ছাত্রদের সংগঠিত করে , তাঁদের মাধ্যমে পত্র পত্রিকা প্রকাশের ও প্রথম উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করা যায় ।
                        ডিরোজিওর তৈরি অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন তার  ভেতর দিয়ে যেন আমরা খুঁজে পাই সক্রেটিসের সেই আলোচনা সভা কে ।এই আকাদেমিক অ্যাসোসিয়েশন নামক সভার ভেতর দিয়েই অন্যায়, মিথ্যা, ধর্মান্ধতা ,কুসংস্কারের  বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্র সমাজের গর্জে ওঠার সূচনা ঘটেছিল। সমসাময়িক বাংলায় বা ভারতেই শুধু  নয়, পরবর্তীকালে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, আত্মজাগরণ এবং চিত্র জাগরণের যে আলোকমালার জ্যোতি  ভারতবর্ষের ছাত্রসমাজ পেয়েছে,তা প্রথম  জ্বলেছিল  অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের  ভেতর থেকে ।
                  লালবিহারী দে লিখছেন;  এই সংগঠনের  পক্ষ থেকে তিনি  সপ্তাহের পর সপ্তাহ কলকাতার সেরা তরুণ দের নিয়ে  তৎকালীন প্রধান প্রধান  সামাজিক নৈতিক ও ধর্মীয় প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতেন ।প্রচলিত ধর্মীয় সংস্কার, রক্ষনশীলতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ই ছিল তাঁদের আলোচনার মূল সুর (রি কালেকশন অফ আলেকজান্ডার ডাফ- লালবিহারী দে পৃষ্ঠা -২৫)।
                  কেবলমাত্র বাঙালি বা ভারতবাসীর কাছে নয়,  আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি যুক্তিবাদী,  বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন মানুষের কাছেই ডিরোজিও হলেন একটি প্রতীকী চেতনা ।বাংলার নবজাগরণে ,বিশেষ করে বাংলা তথা ভারতবর্ষের সামাজিক-রাজনৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম ,আধুনিকতার চর্চা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আর উদার মানসিকতার উৎস স্থল হিসেবে ,আকাশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতোই হল ডিরোজিওর অবস্থান।
                   ডিরোজিওর আগে বাঙালির মনন  এবং দর্শনে অন্য কোন সংগঠন বা ব্যক্তি  এভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছে কি না, তা তর্ক সাপেক্ষ। বাংলা তথা ভারতবর্ষের হাজার হাজার বছরের প্রথাবন্ধ ,প্রাচীন চিন্তাভাবনার ভিতে যে আলোড়ন তুলেছিলেন ডিরোজিও,সেঈ  বিরোধীতা এবং বিদ্রোহী মনন, তা যেন ছিল , প্রকৃতপক্ষে ভূমিকম্পের মতো একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ।
                   ডিরোজিও এবং  ডিরোজিয়ানরা আধুনিক মননশীলতার কাছে ,জীবন জিজ্ঞাসা এবং আত্মজিজ্ঞাসা কে তীব্রতর করে তোলার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। আধুনিক বিশ্ব জগত সম্বন্ধে অনুসন্ধিতৎসা জাগিয়ে, আমাদের মন ,মানসলোক এবং চিন্তা-চেতনার পরিব্যক্তি তে একটি সুসংবদ্ধ  দৃষ্টিভঙ্গি ,বিজ্ঞানসম্মত চেতনার মিলনের ক্ষেত্রে ,ডিরোজিও  এবং তাঁর শিষ্যরা হলেন কার্যত ধ্রুবতারা ।
                      ডিরোজিও যেন এক বন্দি প্রমিথিউসকে প্রমুক্ত করেছিলেন। হাজার বছরের অন্ধকারে  আবদ্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন। আলোর মিছিলে তিনি যেন আমাদের এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। উপহার দিয়েছিলেন  এক উজ্জ্বল আকাশ। শত শত বছরের ধর্মীয় গোঁড়ামির বৃত্ত ভেঙে ,অনাচার ,অন্ধবিশ্বাস, অন্ধবিচার কুসংস্কারের অচলায়তন কে  খানখান করে দিয়ে,সতীদাহ, বাল্যবিবাহ ,বহুবিবাহ, গৌরিদান ,নরবলি, অন্তর্জলী যাত্রার অন্তর্জাল কেটে , ডিরোজিয়ান রা  ,প্রমিথিউসের সত্যনিষ্ঠা ,জ্ঞানপিপাসা ,যুক্তি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ,স্বদেশের প্রতি অনুরাগ, উদার মানসিকতা, সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক, ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ,মানবিক চেতনার ভেতর দিয়ে এক বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ের   উপস্থাপিত করেছিলেন।জীবনভর সাহস, সংযমের ভেতর দিয়ে বাস্তবতাকে উপস্থাপিত করার ক্ষেত্রে একটি চেতনা হিসেবে এগুলিকে  নিজেদের জীবন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন ডিরোজিও এবং ডিরোজিয়ানেরা।
                                 ইউরোপের নবজাগরণের মূল শর্ত ছিল ধর্মীয় বৃত্তের  ঘাত অভিঘাতের বাইরে নিজেকে উপনীত করা। ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি।  মানবজমিন উদাত্ত জায়গা র উন্মেষ।বাংলার নবজাগরণের ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষিতগুলিকে ডিরোজিও যে ভাবে উপস্থাপিত করেছিলেন, তেমনটা নবজাগরণের আর অন্য ব্যক্তিত্বেরা কতোখানি  করেছিলেন,সে বিষয়ে দ্বৈতসত্তা নিয়ে চলেছিলেন কি-না ,তা নিয়ে কিন্তু বিতর্কে যথেষ্ট অবকাশ আছে।
                      রামমোহন তাঁর যাপন চিত্রে মধ্যাহ্নভোজনে  নৈষ্ঠিকতার সঙ্গে পিঁড়ি পেতে বসে আহারাদি সমাপন করে ,রাত্রে একদম সাহেবদের মত  টেবিল-চেয়ারে, সাহেবি কায়দায় ডিনার করছেন, তার সবিস্তার বর্ণনা শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ রেখে গিয়েছেন( পৃষ্ঠা-৯২)।
                       রামমোহন সম্বন্ধে বলতে গিয়ে রমেশচন্দ্র মজুমদার  সাতের দশকের মধ্যে লগ্নে এশিয়াটিক সোসাইটিতে বলেছিলেন, বৃষ্টলে রামমোহন যখন মারা যান ,তখন তাঁর গলায় যজ্ঞোপবীত ছিল( ডঃ মজুমদারের এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত,’ On Raja Rammohan Roy’ তে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে)।
                   সিরাজদৌলার উদ্দেশ্যে ইংরেজদের আরোপিত ,’অন্ধকূপ হত্যা’ র  রোমহর্ষক বিবরণের বই অনুবাদ করেন বিদ্যাসাগর ।আর ঢাকাতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সময় কালে মুসলমান সমাজের জন্য সেই মুহূর্তে ঢাকা শহরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বঙ্কিমচন্দ্র ।
                         এই ধরনের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং বিপরীতমুখী প্রবণতা ডিরোজিওর  চরিত্রে একটিবারের জন্যে ও  দেখতে পাওয়া যায় না। দেশপ্রেম, দেশের মানুষের জন্য ,দেশীয় আঙ্গিকে আধুনিক শিক্ষার দাবি ,মাতৃভূমির উন্নতির দাবি ,মাতৃভাষার উন্নতি দাবি– এগুলির পক্ষে সচেতনতা তৈরীর জন্য  উনিশ শতখের নবজাগরণের কালে ,কোন রকমের পারস্পরিক দ্বৈততা ছাড়াই  সর্বপ্রথম সোচ্চার হয়েছিলেন ডিরোজিও ।
                       এই দাবি গুলি  কিন্তু ডিরোজিয়ানদের  ভেতরে প্রথম জাগ্রত হয় । সেই দাবি গুলি ডিরোজিও  তাঁর শিষ্যদের মধ্যে প্রসারিত করেছিলেন।  ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক ইংরেজবিরোধী, জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনার উন্মেষের  ক্ষেত্রেও ডিরোজিওর  দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার  সঞ্চারণ আমাদের কেবল নভজাগরণের ইতিহাসচর্চার প্রেক্ষিতেই নয়, জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাস চর্চার আঙ্গিকেও যদেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
                    দেশকে নতুন করে উপলব্ধি করবার ক্ষেত্রে ডিরোজিও যে আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তেমনটা কিন্তু কোন ভারতীয় ,সুস্পষ্ট ভঙ্গিতে ,তার আগে করেন নি। ইংরেজ যে বিদেশি শাসক ,আর ভারতবর্ষ  একটি পরাধীন দেশ, ডিরোজিও এটি নিজে উপলব্ধি করে ,সেই উপলব্ধির চেতনাকে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে জাগ্রত করেছিলেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গি গোটা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ও অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
                     সামন্ততান্ত্রিক খোলসকে ভেঙে চুরমার করে ,পরাধীনতা আর ঔপনিবেশিক  শাসন এবং শোষণ থেকে নিজেদেরকে বের করে এনে ,নতুন এক ধরনের স্বাধীন ,সার্বভৌম ,গণতান্ত্রিক, দেশের জনগণ ,ভারতবর্ষের বুকে মাথা তুলবে, এই স্বপ্নের জাল বিস্তারে ডিরোজিওর ভূমিকা ঐতিহাসিক।
                         ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার এই সুসংবদ্ধ চিন্তা  প্রথম করেছিলেন ডিরোজিও এবং তার শিষ্যগণ   ।শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন;
                       নিতান্ত উপর উপর যারা বিচার করেন,  তারাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন যে ,শুধুমাত্র সামরিক শক্তির জোরেই ভারতকে পরাধীন রাখা সম্ভব হয়েছে ।সৈন্য সরিয়ে নাও ।অমনি দেখবে ইংরেজ শাসনের প্রতি অনুরাগ বদলে যাচ্ছে( শিবনাথ শাস্ত্রী প্রণীত রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯)।
                গরিব ভারতবাসীর কষ্টার্জিত অর্থ কেন কেটে নেওয়া হবে?  তারা নিরন্ন, অর্ধ  উলঙ্গ থাকবে ,আর বিদেশির  শাসন-শোষণের বিজাতীয় লোকেদের  মাহাত্ম্য কীর্তনের  জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা অপচয় করা হবে কেন?’ ডিরোজিও র মত এই প্রকাশ্য উক্তি করবার সাহস নবজাগরণের যুগে খুব কম মানুষের ছিল( আর্যদর্শন- ২য় সংখ্যা,১৮৯১)।
                      ডিরোজিওর প্রভাবে তাঁর শিষ্য মন্ডলের  উপর কতখানি গভীর প্রভাব ছায়া বিস্তার করেছিল ,তা বুঝতে পারা যায় ,সেই সময় কালে,’ শতবর্ষ পরে তোমার কল্পনার ভারতবর্ষ’,  শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা থেকে।
                  এই প্রতিযোগিতায় ডিরোজিওর শিষ্য তথা হিন্দু কলেজের ছাত্র কৈলাস চন্দ্র দত্ত,  তখন তিনি মাত্র ১৬ বছরের এক  বালক,   অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৫ সালে,  ৪৮ ঘণ্টার রোজনামচা  নামক একটি প্রবন্ধ লিখে, প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।
                    সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধটিতে কৈলাস চন্দ্র লিখছেন ;  আজকের যুগে ( অর্থাৎ, বিশ শতকের চারের দশকের যে কল্পিত ভাবনার কথা বির্তক প্রতিযোগিতায় ছিল) , সশস্ত্র সংগ্রামের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বর্বরতা এবং লোমহর্ষক অত্যাচারের কথা।এই  জর্জরিত উৎপীড়িত হয়ে ভারতবর্ষের মানুষেরা এক সশস্ত্র গণসংগ্রাম করেছেন। আর সেই গণসংগ্রামের ভেতর দিয়েই তারা বড়লাট লর্ড কেল বচারকে  ক্ষমতাচ্যুত করে,  দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ ভক্তদের নিয়ে, একটি বিপ্লবী জাতীয় সরকার তৈরি ।
                    এই কার্যক্রম বর্ণনা করার ক্ষেত্রে একদম শেষ লগ্নে এসে কৈলাস চন্দ্র লিখছেন কিভাবে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলো। কেন ব্যর্থ হলো ।আর তরুণ বিদ্রোহী বাঙালি নেতার মৃত্যুদণ্ড কিভাবে সমকালীন সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করল । এইসবের এক অসামান্য বিবরণী কল্পিত সেই ঘটনাক্রমের  শেষপর্বে দণ্ডিত বাঙালি নেতা ,ফাঁসির মঞ্চে উঠে দেশমাতৃকার জন্য স্বাধীনতার জন্য, জনগণের মুক্তির জন্য ,প্রাণ দেওয়ার চেয়ে মহৎ কাজ কিছু হতে পারে না –এই যে আপ্তবাক্য, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, এই লেখার  মধ্যে থেকে যেন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল।
                            ব্রিটিশের অর্থনৈতিক শোষণ সম্বন্ধে ভারতবাসীকে অবহিত করার যাবতীয় কৃতিত্বও ইতিহাসের গবেষকেরা দাদাভাই নওরোজি সহ জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে  নেতৃত্ব কে দিয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অনেক আগে ১৮৩৩ সালে সনদ গৃহীত হবার দু’বছরের ভেতরেই ,বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে কোটি টাকা র রাজস্ব ,ইংল্যান্ডে পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে প্রথম  সোচ্চার হয়েছিলেন ডিরোজিও।
                       এই প্রেক্ষিত আলোচনা করে ডিরোজিও ও  তাঁর শিষ্যেরা কিন্তু খুব স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন ; বাংলা  তথা ভারত থেকে অর্থ বিদেশে চালান দেওয়ার ঘটনা কিন্তু আগামী বছরগুলোতে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি  পাবে।তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন ; বাংলার মানুষের থেকে শোষণ করা এই টাকা, বিদেশে রপ্তানি করা হলেও, সেই টাকা দিয়ে বিদেশের সমৃদ্ধি হলেও ,তার ভগ্নাংশ কিন্তু ভারতবর্ষের দুর্গতির অবসানের জন্য খরচ করা হচ্ছে না ।ভারতবর্ষের মানুষদের রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে শুরু করে স্কুল-  কলেজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কোন স্বাস্থ্যকর, জনকল্যাণকর বিষয়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে না।
                    এই প্রেক্ষিত আলোচনা ভেতর দিয়ে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ব্রিটিশের অর্থনৈতিক শোষণ সম্বন্ধে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অনেক আগে , উনিশ শতকের  নবজাগরণের মধ্যভাগে ভারতবাসীর ভেতর একটি সচেতনতা তৈরি এবং জাতীয় চেতনার উন্মেষের  ক্ষেত্রে ডিরোজিও এবং  তাঁর ছাত্রীরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই পর্যায় ঘিরে পর্যালোচনা করে  ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চিন্তা চেতনার উন্মেষের  অন্যতম আদিগুরু হিসেবে  বর্ণনা করতে পারা যায় ডিরোজিকে।
                          ইয়ং বেঙ্গলের  পক্ষ থেকে খুব স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছিল ইংরেজরা ভারতবর্ষে করবার আগে এই ভারতবর্ষ বর্বরতা যুগে ছিল, এইটা ইংরেজরা ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের সামনে প্রচার করে থাকে। এই অসত্য প্রচারের অধিকার তাঁদের  কে দিয়েছে?– এই প্রশ্ন  ইয়ং বেঙ্গলের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল।
                  তাঁরা খুব স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে, ইংরেজরা ভারতবর্ষে অধিকার করবার আগে ভারতবর্ষের শিল্পসমৃদ্ধ উন্নত দেশ ছিল। আমেরিকা দৃষ্টান্ত দিয়ে তাঁরা অত্যন্ত জোর দিয়ে  বলেছিলেন, ইংরেজদের পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করে ,স্বাধীনতা অর্জন করতে পারলে ,ভারতবর্ষ এই দুর্গতির হাত থেকে বাঁচতে পারবে ।
                মধ্যকালীন ভারতের সমন্বয়ী চেতনা ধ্বংসের ভেতর দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন রেখাটি কে তীব্র করে, ইংরেজ ,  বিভাজন ও শাসনের  যে প্রক্রিয়া চালিয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াটিকে কিন্তু মানুষের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা প্রথম নিয়েছিলেন ডিরোজিও  ও তাঁর সহকর্মীরা।
                     মধ্যকালীন ভারত যে কোন অবস্থাতেই অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল না, সেটি অত্যন্ত জোরের সাথে  বলবার ক্ষেত্রে উনিশ শতকের বাংলার বুকে ঐতিহাসিক ভূমিকা ডিরোজিও এবং তার সতীর্থরা পালন করেছিলেন। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ডিরোজিয়ানদের  পক্ষ থেকে বলে হয়েছিল;
                ইংরেজ রাজত্বের শুরু থেকেই আমাদের শাসকশ্রেণীর মতলব ছিল, আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা ।আর স্বাধীনতাহীনতা ই  আমাদের সমস্ত দুর্দশার এক এবং একমাত্র কারণ ।তাই আমাদের প্রস্তাব ;
                   প্রথমত,   দেশের দুর্গতি মোচনের জন্য আমাদের প্রথমত ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
               দ্বিতীয়ত ,দেশকে ভালবাসতে হবে ।দেশের ভিত্তি  এবং সেই ঐক্যের ভিত্তিতে একটা শক্তিতে পরিণত করে,সবটাকে  পরিচালিত করতে হবে জাতীয় কল্যাণের পথে। ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের ও অনেক আগে ইয়ং বেঙ্গলের  পক্ষ থেকে এই উচ্চারণ কিন্তু ভারতবর্ষে ইংরেজ বিতারণের প্রথম ডাক বলে  অত্যন্ত  যুক্তিসঙ্গতভাবে চিহ্নিত করা যায় ।
                    ডিরোজিওর চিন্তা ধারায়, নিজেদের  চিন্তাভাবনাকে পরিচালিত করে ,তাঁর শিষ্যরা ই প্রথম ভারতীয়, যাঁরা যুক্তিবাদের সাহায্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন ;
               গঙ্গার পবিত্রতায় তাঁরা বিশ্বাস করেন না।
                তাঁরা বলেছিলেন;  পুজোর ঘরে মন্ত্রোচ্চারণের নামে ইলিয়াডের  অংশবিশেষ আবৃত্তি হলো অনেক বেশি মানসিক শান্তির পক্ষে ইতিবাচক।   প্রথম প্রশ্ন তুলেছিলেন ; এটা কি সত্য নয় যে,  আমাদের শাস্ত্রে নারী শিক্ষা নিষিদ্ধ? খোলাখুলিভাবে না হলেও ,কার্যত নিষিদ্ধ নয় কি?  যুক্তির দ্বারা অনুমোদিত নয়, এমন কোনো অনুশাসন যদি শাস্ত্রগ্রন্থে থাকে ,তবে সে শাস্ত্রগ্রন্থ কে আমি পদদলিত করি ।
                    এই কথা বলার মত সাহস এবং স্পর্ধা কিন্তু দেখাতে পেরেছিল ডিরোজিও এবং তাঁর শিষ্যেরা( রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ শিবনাথ শাস্ত্রী পৃষ্ঠা -৮৭)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *