আজ ও কেন প্রাসঙ্গিক লেনিন
গৌতম রায়
জন্মের দেড়শো বছর পরেও লেনিনের প্রাসঙ্গিকতার সবথেকে বড়ো উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো,তাঁর অননুকরণীয় বাস্তব পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা।তাত্ত্বিক বোধ যে বাস্তবের নিক্তির বাইরে হয় না।হতে পারে না।আবার বাস্তবতাও যে তাত্ত্বিক বোধ নিরপেক্ষ হয় না- নিজের প্রতিটি পদক্ষেপের ভিতর দিয়ে এই ঐতিহাসিক সত্যটিকে হাতে কলমে দেখানো ই আজ এই একুশ শতকের প্রায় মধ্যবর্তী সময়ে ও লেনিনকে ঠিক আজকের দিনে উপস্থিত একটি ব্যক্তিত্বের মতো ই প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।আগামীতেও রাখবে।
প্রয়োগজনিত বাস্তবতার আঙ্গিকের ক্ষেত্রে বাস্তবের সঠিক বিশ্লেষণ আর তাত্ত্বিক ভিত্তির প্রয়োগের যৌক্তিকতার দিক টি লেনিন উপলব্ধির ক্ষেত্রে সবথেকে বড়ো শিক্ষা নিয়েছিলেন তাঁর পারিবারিক পরিমন্ডলের ভিতরে।লেনিনের বড়ো দাদা শাসা উইলিয়াভ ছিলেন গোপন বিপ্লবী দলের সদস্য।উৎপীড়ক জারতন্ত্র কে সমুলে উৎপাটিত করতে রুশ বিশপ্লবীদের অনন্য সাধারণ আত্মত্যাগের তুলনা চলে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র পথে লড়াই করা সেনানীদের সংগ্রাম, ত্যাগ, তিতিক্ষা, দেশপ্রেমের সাথে।
ভারতের বিপ্লবীরা যেভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে ব্রিটিশ শাসকদের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিত্বদের হত্যার ভিতর দিয়ে ব্রিটিশকে ভারত ছাড়া করবার স্বপ্ন দেখেছিলেন, ঠিক তেমন ভাবেই জার বিরোধী বিপ্লবীরা জার সম্রাটকে হত্যা করে দেশকে জারের শাসনতন্ত্রের হাত থেকে বাঁচাবার স্বপ্ন দেখেছিলেন।এটাকেই তাঁরা পথ হিশেবে ধরে নিয়েছিলেন।
এই ধরণের একটি কর্মকান্ডের সাথে নিজেকে খুব নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করেছিলেন লেনিনের বড়ো দাদা শাসা উইলিয়ানভ।জারতন্ত্র শাসা সহ তাঁর চারজন সহপাঠীকে এই কাজের জন্যে গ্রেপ্তার করে।বিচারের নামে প্রহসন চালায়।বিচারের সময়ে বিপ্লবীদের উপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার করে জারের পুলিশ।প্রহসনের বিচারের শেষে শাসা সহ তাঁর চার সহপাঠী তথা সহযোদ্ধার ফাঁসি হয়।
এই ঘটনাক্রম লেনিনকে এক ই সাথে গভীর ভাবে ব্যথা দেয় আবার তাঁর চিন্তার দুনিয়াকে ও নোতুন ভাবে অভিমুখ খুঁজে নিতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করে।বড়ো দাদার মতোই মনপ্রাণ দিয়ে ই তিনি ও ছারতন্ত্রের উচ্ছেদ চাইছেন, কিন্তু লেনিনের ভিতরে এই চিন্তা প্রবল হয়ে উঠলো যে;
তৃতীয় আলেকজান্ডার, যিনি আগে সম্রাট ছিলেন, তাকে ও তো বিপ্লবীরা হত্যা করতে পেরেছিল।কিন্তু সেই হত্যার ফলে কি রুশ দেশের মানুষের জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র কোনো অদল বদল ঘটেছে? একটি জারের জায়গায় তার বংশ থেকেই আর একজন জার হিশেবে অধিষ্ঠিত হয়েছে।সম্রাট হিশেবে নোতুন জার তৃতীয় আলেকজান্ডারের পথ , নীতি সব কিছুর ই নগ্ন পরিপূরক হয়ে উঠেছে।সাধারণ মানুষ যে জায়গাতে ছিল,ঠিক সেই জায়গা নয়, আরো খারাপ জায়গাতে এসে পড়েছে।
লেনিন এটাই বুজলেন, ব্যক্তি হত্যা ই একমাত্র পথ নয়।ব্যবস্থাপনার বদল টাই হলো একমাত্র পথ।আর এই ব্যবস্থাপনার বদলের পথ অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেই লেনিনের উপলব্ধি , পরিচিতি,’ কমিউনিস্ট ইস্তেহার ‘ এবং ‘ পুঁজি’ গ্রন্থের সাথে।
এইখানেই লেনিনের অনন্যতা।এখানেই তাঁর সাথে সমসাময়িককালে বা পরবর্তী সময়ে মানুষের মঙ্গলকামনারত মানুষদের চিন্তা চেতনার মৌলিক পার্থক্য।লেনিনের থেকে ঠিক দু বছরের ছোট ছিলেন বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ।লেনিনের জন্ম ১৮৭০ সালে।আর অরবিন্দ ঘোষের জন্ম ১৮৭২ সালে।
এই বিপ্লবী অরবিন্দের সাথে কিন্তু প্রথম জীবনের সংযোগ থেকেই ব্রিটিশ তাড়াতে বিপ্লবীদের সাথে, বিশেষ করে অরবিন্দ ঘোষের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ।কিন্তু তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল; বিপ্লবীদের ভিতরে হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রাধান্য।সেই সাথে মৌলানা আজাদ অনুভব করেছিলেন, প্রতিটি বিপ্লবী দল ই তীব্র ভাবে মুসলিম বিদ্বেষী( India Wins Freedim- Maulana Abul Kalam Azad, Madras Edition, 1988, Page-5) ।
মৌলানা আজাদের মতো উপলব্ধি কিন্তু লেনিনের একজন সহযোদ্ধার ও হয় নি।জাতি- ধর্ম- ভাষাগত- লিঙ্গগত যেসব বৈচিত্র ভারতের ক্ষেত্রে ছিল বা আজ ও আছে, তার সব কটিই সেই বিপ্লবপূর্ব রুশ দেশে ছিল।এই বৈচিত্রগুলি থাকা স্বত্ত্বেও সেখানে লেনিনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবীদের কারো মৌলানা আজাদের মতো অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয় নি, কারণ, মতাদর্শগতভিত্তির জায়গা টা লেনিন বাস্তবের নিরিখে ই দেশ এবং সময়ানুগ করেই তাঁর বিপ্লবী দলকে পরিচালিত করেছিলেন।আর আজ, তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষে তাঁর এই বাস্তবানুরাগের সাথে সঠিক আদর্শবাদের সংমিশ্রণের ঐতিহাসিক বাস্তবতাই তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে এবং রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *