শিবরামের নির্লিপ্ততা
ডঃ বিশ্বম্ভর মণ্ডল
শিবরাম চক্রবর্তী কে নিয়ে লিখতে গিয়ে ওনার কোন দিকটা নিয়ে লেখা যায়, কি নিয়ে কম লেখা হয়েছে বা আদৌ লেখা হয়েছে কিনা ভাবতে গিয়ে কূলকিনারা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা প্রবল । প্রবল ঢেউয়ের সমুদ্রে উথালপাতাল নৌকার মত লেখকের অবস্থা হতে পারে। এত বৈচিত্র তার জীবনে যে প্রতিপাদ্য ঠিক করাই কঠিনতর কাজ হয়ে ওঠে। ধান ভানতে গিয়ে শিবের গান গেয়ে ওঠার অবস্থা হয় । বর্তমান প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য শিবরাম চক্রবর্তীর নির্লিপ্ততা।
সুখের লালসায় নির্লিপ্ত
উত্তরবঙ্গের ছোটখাটো জমিদার বাড়ির ছেলে। বন্ধনহীন স্বাধীন জীবনেই নজর যার তাকে আটকে রাখতে পারে না কোন সুখের লালসাই। তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে সোজা কলকাতা । পথে পথে কাগজ বিক্রি করে পেট ভরানোর বন্দোবস্ত। থাকা মেস বাড়ির অন্ধকার ঘরে । অর্ধাহার আর অনাহার নিত্য সঙ্গী, কিন্তূ মুখে উজ্জ্বল হাসি সবসময় । ছাপাখানার কাজ করেছেন। গদ্য, পদ্য সহ নানা ধরনের লেখা লিখে পেটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন।
অর্থে নির্লিপ্ত
কোন্‌ লেখা কোথায় ছাপানো হলো, কোন্‌ প্রকাশক কতবার ছাপলেন, প্রকাশকদের থেকে রয়্যালটি ঠিক ঠিক পেলেন কিনা এসব বিষয়ে কোন হিসাব রাখার ধার ধারতেন না। টাকাপয়সার অভাবে বহুবার বিপন্ন হয়েছেন । অনেকে ঠকিয়েছে তাঁকে বারবার, বঞ্চিত করেছে বারবার, কিন্তূ কোন কিছুই তাঁকে কব্জা করতে পারেনি হতাশার সমুদ্রে ভাসিয়ে । দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটে গেলেই দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে ধুতির উপর সিল্কের পাঞ্জাবি চাপিয়ে কোঁচাটা পকেটে গুঁজে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিজের ছন্দে । সঞ্চয়ের ভাবনাতে, আরামের জীবনের ভাবনায় নিজেকে কখনো ব্যতিব্যস্ত করতেন না। অর্থ উপার্জন নিয়ে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার ছিল – প্রতিদিন যতটুকু প্রয়োজন তাঁর বেশি উপার্জন করতে তাঁর কোন আগ্রহ ছিল না । অর্থ উপার্জন করে বিলাসবহুল জীবনযাপনের স্বপ্ন তাঁর ছিল না।
নালিশে, ঈর্ষায় নির্লিপ্ত
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একান্তেও কারো বিরুদ্ধে কোন নালিশ প্রকাশ করেন নি। জীবনযাপনে অত্যন্ত সহজ, সরল, অনাড়ম্বর ছিলেন । পাশাপাশি অন্যের প্রাচুর্য আর সম্পদ দেখে ঈর্ষা তাঁর ছিল না। অন্যকে প্রশংসার ক্ষেত্রে তিনি অকৃত্রিম ও উদার ছিলেন। কিন্তূ নিজের প্রশংসা অন্যের কাছে শুনতেন না ।
জীবনযাপনে নির্লিপ্ত নির্লোভ
তিনি ছিলেন আদ্যন্ত দেশপ্রেমিক । ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে অনেক দিন জেল খেটেছেন। ইংরেজের পীড়নমূলক ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন বারবার। তবু লেখা ছাড়েন নি। আর জীবনে কখন আদর্শ বিচ্যুতির প্রশ্নে আপোষ করেন নি। তাঁর জীবনযাপনের নির্লিপ্ত নির্লোভ দিকটা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। মনে প্রাণে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ ছিলেন। সারা জীবন সাহিত্য চর্চা করেছেন, কখনো সাহিত্য ব্যবসায়ী হবার চেষ্টা করেন নি।
পরিশেষে তাঁর লেখা কবিতার দুটি লাইন উল্লেখ করছি যা পড়ে দেশের মানুষের শোষণ বিষয়ে তাঁর অনুভব আর উপলব্ধির গভীরতা সচেতন পাঠকের চেতনালোকে ধরা পড়বে-
“রাষ্ট্র-ধর্মশাস্ত্র-গুরু-মন্ত্র-তন্ত্রে দিয়া সিংহাসন
ষড়যন্ত্রে চলিতেছে মানুষের শোষণ–শাসন । ”

One thought on “শিবরাম”
  1. “শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিবরাম চক্রবর্তীর জীবনস্্গ্রাম, সাহিত্য সাধনার কথা প্রান্ঞ্জলভাবে ফুটে উঠেছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *