Skip to toolbar

মহামারীর কোন অভিজ্ঞতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর আমাদের প্রজন্মের নেই। আমরা জানিনা ব্ল্যাকআউট ।আমরা জানি না বোমারু বিমানের সাইরেনের আওয়াজ ।জানিনা জানলার কাঁচে কাগজ সেঁটে ভেতরের আলো বাইরে বেরুতে না দেওয়ার কৌশল।
তবে বাইরের আলো যাতে কোনো মতেই ভেতরে না প্রবেশ করতে পারে ,তার প্যাঁচপয়জার কিন্তু আমরা বেশ ভালভাবে আয়ত্ত করে ফেলেছি। বিষ্ণু দে র ভাষা ধার করে নিয়ে ,আলোকে অন্ধকারের মান্যতা দিয়ে কামনার চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছি।
তাই হঠাৎ করে যখন’ করণা ‘ ভাইরাসের প্রকোপ আমাদের মানব সভ্যতাকে একটা ভয়াবহ সংকটের সামনে এনে দাঁড় করালো ,সংকট বলছি কেন ? অস্তিত্বকে যখন একটা প্রশ্ন চিহ্ন সামনে এনে হাজির করলো, বললে কি আদৌ ভুল হবে? এমন একটা সময়ে কেমন যেন একটা ভ্যাবাচাকা লেগে যাওয়া পরিবেশের আড়ালে নয়, আবডালে আমরা পড়ে গিয়েছি।
আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথ যে ,’ ব্যাধি ও প্রতিকার ‘ নামক প্রবন্ধটি লিখেছিলেন গত শতকের শুরুতেই, সেই বঙ্গভঙ্গের কালে, সেঈ প্রবন্ধটির কথা কি এখন আমাদের মত আমজনতার মনে আছে? নিদেন পক্ষে বাংলা সাহিত্যের ছাত্রদের কি মনে আছে ?
সেই যে সময়কালটা, বিশ শতকের গোড়ার দিক ,ব্যাধি কে রোধ করার জন্য ,প্রতিকারের কি উপায় হতে পারে ,তার যে পথনির্দেশিকা রবীন্দ্রনাথের কন্ঠ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল, সেই পথের চর্চা আমরা কি বিগত একশো বছরে একটি বারের জন্য করেছি ?
তাহলে হয়তো নানা সামাজিক ব্যাধির মত ই করনা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রকোপে গোটা মানবজাতির অস্তিত্বের এরকম ভয়াবহ সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে, আমরা একটি বারের জন্য হলেও, উচ্চারণ করতে পারতাম প্রতিকারের সেই অপ্রতিরোধ্য দীপ্তি।
ঘাতক যখন ব্যাধি , আর সেই ব্যাধি ই যখন আমাদের গোটা মানব সমাজের অস্তিত্বকেই বড় রকমের প্রশ্ন চিহ্ন সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে, তখন সেটি প্রতিকারের জন্য , পাত্রাধার তৈল ,না; তৈলাধার পাত্র, এই আলোচনা কে ই আমরা বড় হয়ে উঠতে দেখলাম।
গতবছরের একদম শেষ লগ্ন থেকে উন্নতশীল বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত একটা বড় বিজ্ঞানীরা এই ঘাতক ভাইরাস সম্পর্কে আমাদেরকে সাবধান করতে শুরু করেছিলেন।কিন্তু আমরা, আমরা বলতে কেবলমাত্র ভারতবাসীর কথা কেন বলছি ? ইউরোপ-আমেরিকার মত উন্নতশীল দেশ গুলি ও কোনো বোধদয় হয়নি ।
মার্কিন প্রশাসন মনে করেছিল; গোটা দুনিয়াকে যেভাবে তারা হাতের মুঠোর মধ্যে ভরেছে, ঠিক তেমনিভাবেই এই মারণব্যাধি কে ও , তারা হাতের মুঠোর মধ্যে ভরে ফেলবে।তাই মারণ ভাইরাসকে আটকাবার লক্ষ্যে বিজ্ঞানীদের নানা রকমের পরামর্শ ,তখন সেগুলোর দিকে কর্ণপাত করবার মতো কোনো প্রয়োজন, ইংল্যান্ড বা আমেরিকার শাসকেরা অনুভব করে নি।
সবকিছুই তাদের হস্তগত ।তাই তাদের কাছে কি মারণব্যাধি কোনরকম থাবা বসাতে পারে ? টাকার জোরে বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে যেভাবে কব্জা করতে পেরেছে তারা, তেমন ভাবেই কব্জা করতে চেয়েছিল বিজ্ঞানকে। অস্বীকার করতে চেয়েছিল সময়ের ঘূর্ণাবর্তে নিজেদের দিকচক্রবাল কে ।
এই সাবধানবাণীকে টাকার জোরে অস্বীকার করবার ভয়ানক মাশুল, আজ গোটা ইউরোপ- আমেরিকা কে দিতে হচ্ছে ।ঠিক এমনটাই অবস্থা আমাদের দেশ ভারতবর্ষের ও। বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কার ,প্রচলিত বিশ্বাসের বাধ্যবাধকতা বানাম ফলিত বিজ্ঞানের গবেষণাগার, কোনটার জয় , এই প্রশ্নটা ভারতবর্ষের বুকে গত কয়েকবছর ধরে ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে বসতে উঠতে শুরু করেছে ।
তাই চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে সংকটাপন্ন হয়ে ,নিজের অসহায়ত্বের কথা বারবার উচ্চারণ করছে, সেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী ,তাঁর দলে তাঁর ই অধস্তন নেতা- কর্মী- মন্ত্রীরা, এই মারণব্যাধি থেকে বাঁচবার জন্য, প্রাথমিক কৌশল হিশেবে বিজ্ঞাননির্ভর কোন পথকে বেছে নেয় নি।
অবলম্বন করতে চেয়েছিল অপ বিজ্ঞানের। বিজ্ঞান যেখানে বলছে, সামাজিক দূরত্ব তৈরি করাই হচ্ছে এই মারন ভাইরাসকে ঠেকাবার সবথেকে বড়, কার্যকরী বিজ্ঞানসম্মত কৌশল, সেখানে এই কৌশল প্রয়োগের জন্য দেশের রাষ্ট্র প্রথম অবস্থায় ,এতোটুকু সক্রিয় ভূমিকা পালন করল না। সরকারের সীমাবদ্ধতা ,যা প্রকারান্তরে অপদার্থতার ই নামান্তর , পরিবেশ-পরিস্থিতি কে এই দেশের বুকে, করোনা ভাইরাস কে, তার অবাধ বিচরণ ভূমি করে তুলতে সব রকম ভাবে সাহায্য করল।
আসলে গত কয়েক বছর ধরে অপবিজ্ঞানকে আমাদের যাপনচিত্রের অঙ্গ করে তোলাবার জন্যে যখন খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেদের সব রকমের শক্তি খরচ করতে শুরু করেছিল, তখন সাধারণ মানুষ আর কি করবে? রাষ্ট্রশক্তি বিজ্ঞান চর্চা, প্রযুক্তি চর্চাকে মিশিয়ে ফেলেছে অপবিজ্ঞান, অপসংস্কারের সঙ্গে।গোবর,গোচোনা কে এখন আর কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস বলা চলে না।করোনা সংক্রমণের পরে যেভাবে কেন্দ্রের শাসক দলের লোকজন প্রকাশ্যে গোবর, গোচনা কে এই মারণ ব্যাধি রোখার দাওয়াই হিশেবে বাতলাতে শুরু করে, তখন আর এই গুলিকে কুসংস্কার বলতে পারা যায় না।বলতে হয় অপসংস্কার।
এই অপসংস্কারের বিরুদ্ধে জানকবুল লড়াইতে কি আমরা ঐক্যবদ্ধ? কেন্দ্রের শাসকের এই অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কেন রাজ্যের শাসক সোচ্চার নন? সর্বদলীয় বৈঠকে যখন করোনা মোকাবিলা সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আস্থা, সম্মতি,সহমর্মিতা সুজন চক্রবর্তী, সূর্যকান্ত মিশ্রদের কন্ঠ থেকে ধ্বনিত হয়, তখন কেন প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার অনুসারী হয়ে থালা, ঘন্টা বাজানো, কেত্তনের দল বেরোনো নিয়ে সুজনবাবু সোচ্চার তখন, তখন কেন নীরব থাকেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী? অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধতা, প্রতিবাদের প্রশ্নেও কি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকে?
আজ এই একুশ শতকের প্রায় মধ্যভাগে এসে দেশের প্রধানমন্ত্রী মহামারী রুখতে জনতার কার্ফু পালনের পর ঘন্টা, থালা বাজানোর মত ধর্মীয় বিধিবিধান পালনের নিদান দেন।সেই নিদান পালন করে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ভক্তি প্রদর্শনে দেশের একটা বড় অংশের মানুষ বিজ্ঞানকে অস্বীকার করতেই কার্যত রাস্তায় নেমে পড়েন।যখন গোটা বিশ্বের বিজ্ঞান মহল বলছে, এই মহামারী রুখতে এই মুহূর্তে সোশাল ডিসট্যান্স ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই, তখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো ব্যক্তিত্ব কার্যত সোশাল গ্যাদারিং ঘটাতে উসকানি দেন।
আজকে এই করোনা জনিত সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়েও এই কথা অত্যন্ত জোর গলাতে বলতেই হয় যে, অপবিজ্ঞানের চাষ ই কেবল প্রধানমন্ত্রী করেন নি।তিনি গোটা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে হামাজিক ঘনত্ব তৈরির এই উসকানি দিয়ে মস্ত বড় সামাজিক অপরাধ ই করেছেন।প্রধানমন্ত্রীর এই অমানবিক, অসামাজিক, বিজ্ঞানবিরোধী ভূমিকা ক্ষমার অযোগ্য।
সামাজিক বিন্যাসের সুষম বন্টনের উদ্দেশ্যে অর্থবিজ্ঞান, শ্রমবিভাজন কে বিশেষ রকমের গুরুত্ব আরোপ করেছে। শ্রমবিভাজন ব্যতীত অর্থনীতির কোন আঙ্গিক ই সুচারুভাবে তার নিজের কার্য সম্পাদন করতে পারেনা। সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এই শ্রমবিভাজন ,অর্থ বিজ্ঞানের সার্বিক কার্যসম্পাদনের মতোই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
সামাজিক শ্রমবিভাজনের সঠিক বিন্যাস ব্যতীত সমাজ জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে না ।করোনা জনিত এই মহামারীর কাল আমাদের কাছে এই প্রশ্নটি খুব গভীরভাবে তুলে ধরেছে যে ;নিজের প্রচার ,দলের প্রচার, ভোট রাজনীতির দিকে তাকিয়ে সার্বিক কার্যসম্পাদন, আর তাগিদ ই কি সমাজ বিজ্ঞানের মূল চরিত্র থেকে আমাদেরকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে দিচ্ছে ?
ভোট রাজনীতির কৌশল কে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রকরা ,সামাজিক শ্রমবিভাজনের চিরাচরিত রীতি নীতি, আঙ্গিককে অস্বীকার করবার ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি গুরুত্ব আরোপ করছেন। এই প্রশ্ন এই কারনে উঠে আসছে যে ,সব রকম পরিস্থিতিতেই শ্রমবিভাজন কে মান্যতা দেওয়া সমাজবিজ্ঞানের একটি চিরাচরিত রীতি ।
এই রীতি যদি মহামারীর এই প্রলয়কালে আমরা বিস্মৃত হই ,তাহলে কি মহামারীকে মোকাবিলা করার প্রশ্নে আমরা বেশি রকমের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারব? নাকি, বিজ্ঞান যেখানে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স কে সবথেকে বেশি গুরুত্ব আরোপ করছে ,মহামারী মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সেই নির্দেশ অমান্য করে ,মহামারীর ভয়াবহতাকেই আমরা বেশি করে আবাহন করব ?
এই প্রশ্নটা এই কারণে খুব জোরদার হয়ে উঠছে যে , আজকের এই সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তা যে ভূমিকা পালন করছেন ,সেই ভূমিকার ক্ষেত্রে তাঁর এই অগ্রবর্তী হওয়াটা কি একান্ত ই জরুরী? প্রশাসনিক শীর্ষকর্তা র এই অগ্রবর্তী ভূমিকা যে পরবর্তীকালে সেই কর্তাব্যক্তিদের রাজনৈতিক প্রচারকার্যে, তাঁকে বা তাঁদের একেবারে দেবত্বের সমার্থক করে তুলবে না, সে ভরসা কোথায় ?
বলা হচ্ছে, এখন নাকি রাজনীতি করার সময় নয়। সত্যিই এই মহামারীর কাল কোন অবস্থাতেই রাজনীতি করার সময় নয়। শাসক-বিরোধী সবাই স্পষ্ট ভাবে বলছেন যে ; না, এখন রাজনীতি নয়। রাজনীতি ভুলে আমরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একে মোকাবিলা করি আসুন। আর সেখানেই থেকে যাচ্ছে সবথেকে বড় ধ্বন্দ। সেখানে ই থেকে যাচ্ছে সব থেকে বড় সংশয়। থেকে যাচ্ছে সব থেকে বড় প্রশ্ন।
রাজনীতি করার সময় যদি নাই হয়, তাহলে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তা কেন সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সের নিয়মকানুনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ,জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ ,সবটাই একার হাতে করতে চাইছেন ? এই যে রাজনীতি না করে , রাজনীতি করা, এই ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক মানসিকতার বিরুদ্ধে সচেতনতা আমাদের কবে জাগবে ? আদৌ জাগবে কিনা , তখন গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব থাকবে কিনা, চারিপাশ দেখেশুনে এই প্রশ্নটাই কেমন যেন তীব্র হয়ে উঠতে শুরু করেছে ।
খোদ কর্তাব্যক্তিরা যদি বিপর্যয় মোকাবিলার নাম করে বিজ্ঞান নির্দেশিত পথ থেকে সরে আসার চেষ্টা করেন ,তাহলে সাধারণ মানুষ লকডাউনের নিয়ম কানুন মানছেন না– এই অপবাদের কি তাঁদের অভিহিত করতে পারা যায়? আমি, আপনি রাস্তায় যদি খুব একান্ত প্রয়োজনে বেরোই ,যেটা বেরোনো ও উচিত নয়, তবু সেখানে আমাদের নাগরিকদের পুলিশের লাঠির ঘা খেতে হচ্ছে ।সবজিওয়ালা সবজি নিয়ে বসলে, তাঁকে ভালভাবে সেই সবজি উঠিয়ে নেওয়ার কথা না বলে ,পুলিশ ডান্ডা উঁচিয়ে সবজি ফেলে দিচ্ছে। দুধ ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সামগ্রী ও মাটিতে ফেলে নষ্ট করে দিচ্ছে ।
আর আমাদের কর্তাব্যক্তিরা সপারিষদ এই , দুই হাত দূরত্ব বজায় রেখে ,বিপর্যয় পর্যবেক্ষণের নামে শহর ময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।এখানে যেন কোথায় পরিস্থিতি অপবিজ্ঞান বনাম প্রচার কাঙালপনা, একটা ঘূর্ণাবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে ।এইসব দেখে মনে হয় প্রায় শ’খানেক বছরের ও আগে ,কলকাতা শহরেই প্লেগ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দ, নিবেদিতা এবং ওই একটি বার ই নিবেদিতার সঙ্গে হাতে-কলমে মানুষের কাজ করতে পথে নামা রবীন্দ্রনাথ নেমেছিলেন, ভাগ্যিস সে যুগে সেলফির চল ছিল না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *