একটু আগে নান্দুদিদি ফোন করেছিল।দুধনাথ সাউয়ের নাতনী।সীতারাম ছিল ওঁর বাবার নাম।আমার দিদির বিয়ের পরের বছর, সেই ‘৮৪ র দাঙ্গার কালে ভাইফোঁটা তে দিদি আসতে পারে নি,আমি ও যেতে পারি নি।
ভাইফোঁটার দিনে আমার শুকনো মুখ দেখে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমাকে ফোঁটা দিয়েছিল।নান্দুদিদির মেয়েটাকে দেখলেই রামায়ণ পাঁড়ে বলত ;
কা হো? ফুলাউরিওয়ালা নইখে আইলবারণ?
              নান্দুদিদির বর কলকাতা শহরের কোথায় ফুলুরি সানত তা জানা ছিল না।তবে এটা জেনে ফেলেছিলাম, একজন নীপিড়িত মানুষ, তাঁর থেকেও পেষণে থাকা মানুষ, আজকের ভাষায় যাকে বলে , চাক্কি পিসিং, দেখলে , তাকে আর একটু পিষে রক্ত বের করার ভিতরে কেমন যেন একটা আত্মতৃপ্তি অনুভব করে।
            বর নিতো না নান্দুদিদিকে।তাই তাঁর মেয়েটাকে বাপের অবহেলার দগদগে ঘা টা খুঁচিয়ে দিয়ে নান্দুয়ার মতো এক ই শ্রেণী অবস্থান অথচ জাতের বিচারে উঁচুতে থাকা রামায়ণ পাঁড়ে র সেই আত্মশ্লাঘা ভরা মুখটা আমাকে দুনিয়া চিনতে অনেকটা সাহায্য করেছে।
                        তা আজ নান্দুদিদি ফোনে জানতে চাইল; ভাই এই পাড়াতে কখন তারানে( ত্রাণে) সমন ( জিনিষ) বাটবে( বন্টন করবে) জানিস কিছু? সকাল থেইকে রাস্তা উপ্ রে থাকি তারানের জন্যে, পুলিশ তাড়া করে, বাড়ি পোলিয়ে আসি।
                          স্বামীপরিত্যক্তা নান্দুদিদি এখন ভাইদের গলগ্রহ।যদিও মেয়েটাকে পরগোত্তর করতে পেরেছে।আর এই পারার জেরে ইসকিমিক হার্টের রুগী নান্দুদিদিকে নিয়ম করে হার্টের ওসুধ খেতে হয়।বান- মা মরা, ভাইদের সংসারে গলগ্রহ এই মানুষটি নিয়ম করে ওসুধ খেতে পায় না।
                          পেট পুরে ভাত জুটলে, তবে তো ইলাজ।তারপর দাওয়া।ভরপেট ভাত জুটলে তো আজ এই করোনা মহামারী র প্রলয়কালে কখন কে একটু চাল, একটু ডাল বিলোবে,আর  দাঁত কেলিয়ে ক্যামেরার সামনে সেটা নেওয়ার তসবির ঘিঁচতে হবে ,সবটা জেনে শুনে ও রিলিফের আশাতে চটকলিয়া বিরাদরির সেই কানা গলি ছেড়ে বড়ো রাস্তায় হাপিত্যেশ করে দাঁড়াতে হতো না নান্দুদিদিকে।লক ডাউন ভাঙার জন্যে পুলিশের তাড়া খেয়ে জঙ ধরা হৃদয় খানাকে লাফিয়ে তুলে বাড়ির দিকে ছুটতে হতো না।বাড়ি পৌঁছে বুকের ধরফরানি আর হাঁফের টান সামলাতে হতো না।
                             নান্দুদির ফোন আমাকে মনে করিয়ে দিল আমার পিসীমণির কাছে শোনা তাঁর ছাত্রজীবনের ঘটনা।নারী আত্মরক্ষা সমিতির ত্রাণ শিবিরে দুধ বিতরণের সময়ে সামনে বউ টির বাটিতে দুধ ঢালতে যাবেন পিসীমণি, হঠাৎ সেই দুধের লাইনের পিছন থেকে আর একজন মহিলা বলে উঠলেন;
                     ওকে দুধ দিওনিকো, ওর কোলের ছেইলে না মরা!
                       নান্দুদিদির ফোন কি আমাদের কাছে তেমন দিনের সঙ্কেত ই বয়ে আনছে?
                   পিন্টুদার ছোটমামা র স্বভাব টা একটু শুচি বামনী গোছের।একপাল ঠাকুর,তাদের বাসনকোসন, ধুপের ছাইতে সিমেন্টের মেঝেতে পরু আস্তরণ- এসব নিয়েই কেটে যায় মামার।
একাদশীতে শষ্যদানা দাঁতে কাটে না মামা।অন্যদিন অবশ্য মাছ ছাড়া ভাত রোচে না মুখে।এই লক ডাউনের কালেও মামা রোজ বাজারে যায় মাছ কিনতে।ঠাকুরের নকুলদানা কিনতে।ঘরে ঢুকে কেবল চটিটা ছেড়ে অন্য কাজে লেগে পড়ে।
                      মামাকে নিয়ে কখনো একবর্ণ পি এন পি সি না করা পিন্টু কালকে থাকতে না পেরে এসব বলেই ফেলল ফোনে।
                      নান্দুদিদির বাড়ির পাশেই কিন্তু থাকে পিন্টু আর তার মামা।জ্যান্ত ঠাকুর নান্দুয়া খেত পেল কি না, জানার – বোঝার সময় কোথায় মামার? তার পাথরের, ধাতুর ঠাকুরগুলোকে নকলদানা, বাতাসা না খাওয়ালে যে রৌরব নরকেও তাঁর ঠাঁই হবে না।
                       তাই লক ডাউন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসংস্থা নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি– এসবে থোড়াই পরোয়া আমাদের মামার।লোকটা কিন্তু নিছক ধর্মকম্ম নিয়ে সময় কাটায় না।দিস্তের পর দিস্তে লিখে যায়।পাশের বস্তির অভাগা মেয়েটার অ্যাটোভাসটেটিন কেনার টাকা জোয়ার হয়েছে কি না, সেটা জানার প্রয়োজন না থাকলেও মামা কিন্তু পকেটের পয়সা খচ্চা করে কলকাতায় দৌড়োদৌড়ি করে নিজের দিস্তে দিস্তে লেখা দিয়ে আস্ত একখানা উপন্যাস ছেপে ফেলেছে।শহরের দোকানগুলোতে সেইসব বই,  বিক্রির জন্যে শুধু পৌঁছে দেওয়াই নয়, কেমন বিক্রি হচ্ছে , তা জানার জন্যে দোকানমালিকের কানের পোকা নিয়মিত কচমচিয়ে খেয়ে থাকেন।
                        সত্যি ই, আমরা মধ্যবিত্ত এখনো কৌতুকে, করুণায় নান্দুয়া, নান্দুয়াদের দেখে চলেছি।তাই না? অনেকটা সেই পুরনো বাংলা প্লবাদ,’ঘুঁটে পোড়ে, গোবর হাসে’র মতো করে দেখছি।দেখেই চলেছি।সেই প্রবাদের পরের শব্দ,’এমন দিন তো সবার আসে’,এটা বুঝতেই চাইছি না।ভাবতেই চাইছি না।অথচ, তেমন দিন আসতে বুঝি আর বেশি দেরি নেই।দরজায় কড়া নাড়ার খটখট শব্দ শুনতে পাচ্ছেন কি?
                           আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে এক উকিলবাবু থাকেন।যেশ্চার-পশ্চারে অশোক সেন,নানী পাল্কিওয়ালা ,রাম জেঠমলানী ও হার মানে।তাঁর রিটায়ার্ড দাদা নাকি একটা সময়ে বামফ্রন্টের এক শরিক দলের ফায়ারব্রান্ড শ্রমিক নেতা ছিলেন ।বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নাকি সেই নেতাকে নিয়ে কবিতা পর্যন্ত লিখেছিলেন।
                          ওই উকিলবাবুর বাড়িতে পাড়ার কেলাবের ছেলেরা গেছে লক ডাউনে সমস্যায় পড়া মানুষদের কিছু চাল ,আনাজ দেবে, এই উদ্দেশে সামান্য আর্থিক সাহায্য চাইতে।উকিলবাবু এবং তার সেই একদা ফায়ারব্রান্ড শ্রমিক নেতা দাদা আগন্তুকদের বললে; একটা লোক তুই আগে আমাকে দেখা না খেতে পেয়ে আছে।না খেতে পেয়ে মারা গেছে।
                          শোকহীন বাড়ি থেকে সর্ষে আনলে মৃতে প্রাণসঞ্চার করবেন বলে গৌতমবুদ্ধ বুঝিয়েছিলেন, শোকহীন সমাজ সোনার পাথরবাটি।আমাদের পাড়ার এই উকিলটি না বোঝাতে চাইলেও এটাই বোঝালেন, মধ্যবিত্ত আসন্ন আকাল ঘিরে এখন ও উন্নাসিক।আসলে মধ্যবিত্ত যে এই সহজ বিষয় টি ভুলে গেছে যে, পাশের চালে আগুন লাগলে, আমার বাড়িটাও বাঁচবে না।এই ‘ না’ বোঝাটা ওই উকিলবাবুর মতো লোকেরা বোঝালেন, এই লক ডাউনের কালেও পছন্দের কেলাবে ফিস্টির জন্যে ‘ তেলে’র যোখান দিয়ে ।কারণ, পছন্দের কেলাবেই যে তার নিত্যসেবার মদের বোতলের মিশ্রণ গুলি তার একদা ফায়ারব্রান্ড নেতা দাদাকে না দেখিয়ে চামচে রা  যাযাবরের ‘ দৃষ্টিপাতে’ র পেগের সঠিক অনুপানে তেরি করে।
                       নববর্ষের ফোনে সম্ভাষণ জানাতে গিয়ে একটি বামপন্থী তাত্ত্বিকৃর সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য তার একটু আগেই বলেছিল, তার দেশের বাড়ি আসামে করোনার উৎপাত ছিল ই না।নিজামুদ্দিন থেকে লোকগুলো ফিরেই এই উৎপাত বাঁধিয়েছে।হ্যাঁ, এই প্রগতিশিবিরের মান্যগণ্য টি একটি বামপন্থী দলের সর্বক্ষণের কর্মী ই শুধু নয়, তাদের দলের কবি, সাহিত্যিকদের সংগঠনের রাজ্য নেতা ও বটে।
                          ওই নেতার ই এক ততোভাই ও সেদিন ফোন করে জানতে চেয়েছিল, আপনাদের ওখানে যে লোকটার করোনা ধরা পড়েছে, ওই লোকটা দিল্লিতে নেড়েদের উৎসবে গিয়েছিল না?
                    কেতাদুরস্ত ভাব এই লোকটার নেই।সে চা খাইয়ে তাবড় তাবড় নেতাদের আনন্দ দিলেও আগের ওই সুসংস্কৃত’  সমোসকিতি’র নেতার মতো বেশি গুছিয়ে কথা বলতে জানে না।তাই তার অনুভূতি টা তে সুগারকোটিং ছিল না।
                    আমি শুধু বললাম, দিল্লি যেতে গেলে যে টাকা দরকার ,সেইটাকা পেলে গত লোকসভা ভোটের পর থেকে রাজনৈতিক চাপান উতোরে কর্মহীন হয়ে পড়া লোকটা তার মুখের আর পায়ের ঘায়ের চিকিৎসা করাতে পারত।
                    বামপন্থী কর্মী দুইজনকেই কিন্তু এটা বোঝানোর ই চেষ্টা করি নি,কাঁকিনাড়ার আনোয়ার ফুরফুরা তরিকাভুক্ত আর আসামের সাপোটগ্রামের বেশিরভাগ মুসলমান সোহরাওয়ার্দি তরিকার।তবলীগ জামাত কিন্তু যে কোনো পীরতন্ত্রের বিরুদ্ধে।
                    মুসলমান হলেই সে নিজামুদ্দিনে প্রার্থনাতে গিয়েছিল – এই সরলীকরণ যদি নিজেকে বামপন্থী বলে পরিচয় দেওয়া মানুষেরাও করেন, তাহলে আর আর এস এস- বিজেপির বিষ ঢালা নিয়ে কিই বা আর আলাদা করে বলার থাকে?
               নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরকার, সেই তরিকার বিশ্ববিশ্রুত মুরিদ আমীর খসরু আর তাঁর বেড়াদড়ি আর নিজামউদ্দিনের তবলিগ জামাতের এবাদত সম্পূর্ণ আলাদা– করোনা সংক্রমণ ঘিরে যারা মুসলমানেদের উদ্দেশে বিষ ছড়াচ্ছেন, তারা কি তার বিন্দুবিসর্গ ও জানে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *