Skip to toolbar

করোনা, লকডাউন এবং ক্ষুধা
গৌতম রায়
আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন কেন্ট হামসুন।আজ ২০২০সালে করোনা অতিমারীর এই ভয়াবহ সঙ্কটের ভিতরে হামসুনের উপন্যাসে র নরওয়ের একটি শহরের আখ্যান যেন এই দুঃসময়ে খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।উনিশ শতকের শেষ লগ্নে নরওয়েজিয়ান শহরের আর্থ- সামাজিক প্রেক্ষাপট যেন আজকের এই অতিমারীর পিছনে চুপ করে বসে থাকা ভয়াবহ ‘ ক্ষুধা’ নামক শব্দটিকে একটি নোতুন অভিধারার ভিতর দিয়ে আমাদের সামনে উঠে আসছে।চরম দারিদ্র কি ভাবে নরওয়ে তে একটা সময়ে শারীরিক সঙ্কটকে অতিক্রম করে একটা প্রবল মানসিক সঙ্কটের ভিতর দিয়ে গোটা সামাজিক গতিপ্রবাহকে ভয়াবহ সঙ্কটের ভিতরে এনে ফেলেছিল- হামসুনের সেই অনুধ্যান , আজকের বিশ্বের সামাজিক প্রেক্ষিতে যেন একটা জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিশেবে আমাদের সামনে কয়লায় কালো সত্য কে তুলে ধরছে।চিন্তার যৌক্তিক আলিম্পনের দুনিয়াটাকে ক্ষুধা কি ভাবে বিপন্নতার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, উনিশ শতকের শেষদিকের প্রেক্ষিতের নিরিখে হামসুন সেটিকে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।আজ হামসুনের সেই খোলা চোখ যেন করোনা জনিত সঙ্কট এবং সেই সঙ্কটের সঙ্গে গা জড়াজড়ি করে ধীর পায়ে এগোতে থাকা ‘ ক্ষুধা’ কে ঘিরে একশো বছর আগের সত্যটাকে আবার হিরন্ময় পাত্রের আবরণ সরিয়ে আমাদের সামনে সত্য হিশেবে উঠে আসছে।
                        হামসুন দেখিয়েছিলেন ক্ষুধা কিভাবে চুরি থেকে শুরু করে দুর্নীতি, সম্পত্তি ধ্বংস- গ্রাসের মতো বিষয়গুলিকে সমাজের বুকে জ্বলন্ত সত্য হিশেবে দেগে দেয়।বস্তুত , হামসুনের এই বাস্তব অন্বেষণের ভিতরেই কিন্তু এতোকাল  লুকিয়েছিল অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের একটা বড়ো অংশের সঙ্গে অপরাধজগতের কাছাকাছি থাকার প্রশ্ন টি।সেই বিষয়টিই এখন এই অতিমারীকে কেন্দ্র করে ক্ষুধার ভূগোল কে যে কোন খাতে প্রবাহিত করবে- তা ঘিরে আমাদের ভাবনা এখন ক্রমশঃ দুশ্চিন্তাতে পর্যবসিত হতে চলেছে।
                 গত একুশে এপ্রিল জাতিসঙ্ঘের খাদ্য কর্মসূচির পরিচালক  বছরটিকে ক্ষুধাজনিত মহামারী বলে সতর্ক করেছেন।জাতিসঙ্ঘের অনুমান, ক্ষুধা জনিত সঙ্কট ঘিরে যদি এই মুহূর্তেই না উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে গোটা বিশ্বে আগামী তিন মাস প্রতিদিন গড়ে তিরিশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হবে।ক্ষুধা আমাদের কোন দিকে পরিচালিত করতে পারে, জাতিসঙ্ঘের এই হুঁশিয়ারির ভিতর দিয়ে আমাদের কাছে অনেকটাই পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে।
                 যদি কেবলমাত্র ভারতের প্রেক্ষিত ই আলোচনা করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে, এই ক্ষুধাকে ঘিরে লক ডাউনকালে সবধরণের শ্রমিক সমাজ একটা বড়ো রকমের সঙ্কটের ভিতরে রয়েছে।শ্রমিকদের ভিতরেও পরিযায়ী শ্রমিকেরা এই লক ডাউন কালে পেটের খিদেকে কেন্দ্র করে ক্রমশ দুর্বিসহ অবস্থার একদম খাদের কিনারাতে চলে আসছেন।যাঁর যাঁর নিজের গ্রামে তাঁরা ফিরে আসতে চাইছেন রোগের ভয়ের থেকেও অনেক বেশি পেটের জ্বালার তাগিদ থেকে।লক ডাউনের অপরিকল্পিত যাবতীয় প্রেক্ষাপট শ্রমিকদের, বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিতরে পেটের খিদে কে ঘিরে একটা চরম অনিশ্চিত জীবনের ভিতরে ঠেলে দিয়েছে।ক্ষুধার পাঠটি যে সার্বজনীন, এই পাঠে যে কোনো সীমান্তের বিধিবিধান নেই– করোনা, লক ডাউন যেন চোখে আঙুল দিয়ে গোটা বিশ্ববাসীর কাছে তা দিনের আলোর মতো পরিস্কার করে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *