নিভৃত সাধক কামালউদ্দিন খান: চেতনার  অহঙ্কার
গৌতম রায়
বাঙালি মনীষার এক বিরল আলোকবর্তিকাবাহী ব্যক্তিত্ব কামালউদ্দিন খান(১৯০৭,১০ ই মে-১৯৭৭,৩রা অক্টোবর) ।বাঙালির ইতিহাসের বিস্মৃতপ্রায় উত্তরাধিকারের যে প্রদীপটি কামালউদ্দিন খান জ্বেলেছিলেন আজ ও তা নির্জন রাতে বাঙালির ঘরে আলো জ্বালে।গত শতাব্দীর দুইয়ের দশকের শেষ প্রান্তে ‘ মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং তাঁদের মুখপত্র ‘ শিখা’ কে কেন্দ্র করে বাংলার নবজাগরণের যে দ্বিতীয় পর্যায় উন্মোচিত হয়েছিল ,সেই কার্যক্রমের অন্যতম পুরোধা কামালউদ্দিন স্বীয় ব্যক্তিত্বেই নিভৃত সাধনাকেই তাঁর জীবনের ব্রত করেছিলেন।বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সেনানী কামালউদ্দিনের জীবন এবং সৃষ্টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নবজাগরণের ঋত্ত্বিক হিশেবে, রেঁনেসাঁসের  সন্তান হিশেবে আলোর পিপাসু যে কোনো মানুষের কাছে আজ ও তিনি ভীষণ ভাবে জীবন্ত এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।সমাজ বিকাশের স্বার্থে ইতিহাসকে একটি গঠনমূলক ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবার ভাবনা বাঙালি সমাজে বিকশিত করবার ক্ষেত্রে ইতিহাস বিজ্ঞানের আধুনিক সজ্ঞাকার ই এইচ কারের বাঙালি রূপ হিশেবে তাঁকে খুব পরিস্কার ভাবে উল্লেখ করতে হয়।ইতিহাসকে যেভাবে অতীত আর বর্তমানের চিরায়ত কথোপথনের আঙ্গিকে দেখবার দিকনির্দেশ কার করেছিলেন, পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র কামালউদ্দিন ,কারের সেই সজ্ঞা নিরুপনের ও অনেক আগে বিংশ শতকের গোড়ার দিকে( ইতিহাস দর্শনের ক্ষেত্রে তখন টয়েনবির দিকনির্দেশ ই সবাই মেনে চলতেন) তিনি যেভাবে ভূবণানয়ন ঘটালেন, দুঃখের বিষয়, বাঙালি সমাজে তার সম্যক আলোচনাও সে ভাবে হয় নিই বলা যেতে পারে।
                         বাঙালির মেরুদন্ডের একটা সার্বিক আদর্শ হলেন কামালউদ্দিন খান এবং তাঁর পত্নী বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল।এই সদাজাগ্রত দম্পতির যাপনচিত্রের মেরুদন্ডের শক্ত বনিয়াদ কখনো অন্যায়ের কাছে, চাপের কাছে, ঘুষ বা ঘুষির কাছে মুহূর্তের জন্যে আত্মসমর্পন করে নি।আর্নেস্ট হেমিংওয়ে যেন মূর্ত হয়েছিলেন কামালউদ্দিনের জীবনের সামগ্রিকতার ভিতরে।কামালউদ্দিন দেখিয়ে গিয়েছেন; মানুষ ধ্বংসের ভিতর দিয়েও নিজের বিজয়বার্তার পরাজয় ঘোষণা করে না।মানুষের অপরাজেয়তার অদম্য বার্তা ঘোষণাই যেন ছিল কামালউদ্দিন খানের জীবনবেদ।নিভৃতসাধক কামালউদ্দিনের গোটা জীবনটাই ছিল মেরুদন্ড সোজা রেখে একটি পরিক্রমা।এই মেরুদন্ডের দৃড়তার ভিতর দিয়েই তিনি যেমন আত্মজনেদের জীবনের সৌন্দর্য বিকাশে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেই ভূমিকা নিজের কর্মের ভিতর দিয়ে ব্যপ্ত করে গিয়েছেন অচেনা- অজানা মানুষদের উদ্দেশেও।মানবপ্রেমের মূর্ত প্রতিচ্ছবি কামালউদ্দিন এতোটাই নিভৃত সাধক ছিলেন যে তাঁর সমকালেও খুব কম মানুষ ই এই হিউম্যানিস্টটিকে সম্যক জানতে পেরেছিলেন।নিজেকে নিয়ে তাঁর নিভৃতযাপনের অঙ্গ এমন টাই ছিল যে, তাঁর আত্মজদের কাছে ও তাঁর পরিণত বয়সের ফটোগ্রাফ প্রায় নেই ই বলা চলে।আজকের এই প্রচারকাঙাল প্রজন্মের কাছে তাই কামালউদ্দিনকে ঘিরে হয়তো জানার আগ্রহ ও তেমন নেই।তবু যাঁরা তাঁকে জানতে ও চান না, তাঁদের জন্যেও একটি শোষণহীন, মুক্তচিন্তার পৃথিবীর ছবি কামালউদ্দিন আজন্ম দেখেছিলেন।মানবপ্রেমের অন্তহীন জাগর হিশেবে কামালউদ্দিন আর সুফিয়া কামাল ছিলেন যেন একে অপরের পরিপূরক।
                 বাঙালি মুসলমানের সম্যক আধুনিকতার দিশারি কামালউদ্দিন কিন্তু নাস্তিক ছিলেন না।আবার তাঁর ধর্মবোধকে তিনি বিজ্ঞানমনষ্কতার বাইরে কখনো উপস্থাপিত করেন নি।জড়বাদ আর ভাববাদের দ্বন্দ্বের কেতাবী চর্চার ভিতরে নিমজ্জিত থেকে বাঙালির জীবনবোধের মৌলিক সূত্রকে তিনি একটি বারের জন্যে ও এড়িয়ে যান নি, অস্বীকার করা তো দূরের কথা।বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর নাম কুদরত ই খুদা, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কাজী মোতাহার হোসেনের সাথেই এক ই বন্ধনীতে উচ্চারিত হওয়ার স্পর্ধা রাখে।কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের এইখানেই যে, নিভৃতসাধককে ঘিরে কখনোই বাঙালি কোনোরকম উৎসাহ দেখায় নি।মানুষের ঈশ্বর কে কামালউদ্দিন যেভাবে নিজের সার্বিক বোধের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তার সম্যকচর্চার ভিতর দিয়ে , সেই বোধ যদি আমাদের জীবনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে, আজকের এই চরম সঙ্কটের কালে মানবজাতির সার্বিক যাপনচিত্র  ই পরিবর্তিত হয়ে যাবে।
                         প্রকৃত ধার্মিক যে কখনো ধর্মমোহের শিকার হন না, কামালউদ্দিন খান- সুফিয়া কামালের গোটা জীবন দিয়ে তা আমাদের দেখিয়ে গিয়েছেন।প্রকৃত ধর্মপ্রাণতার সঙ্গে যে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিন্দুমাত্র সংযোগ থাকতে পারে না– এটা ও কামালউদ্দিন- সুফিয়া তাঁদের গোটা জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন।আত্মনিবেদিত মানবপ্রেমি অথচ মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণার ক্ষেত্রেও আন্তরিকতার কমতি নেই– এটাই ছিল এঁদের যাপনচিত্রের সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য।মনুষ্যত্ব আর মানবতার মুক্তির দিশারি হিশেবে বাংলা- বাঙালির গন্ডিকে কে অতিক্রম করে এঁরা সর্বকালের এক আন্তর্জাতিক প্রতিভু হয়ে উঠেছিলেন।সততা , সার্বিক আদর্শবোধ আর সর্বাঙ্গীন মূল্যবোধের উপর জীবন প্রতিষ্ঠিত করলে কিভাবে যাবতীয় প্রতিকূলতাকে হাসিমুখে অতিক্রম করা যায় কামালউদ্দিন তাঁর গোটা জীবন দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছেন।ঝড়কে সাথী করেই কিকরে সঙ্কটের মোকাবিলা করা যায়, সঙ্কোচের বিহ্বলতাকে অতিক্রম করা যায় তার জীবন্ত পাঠ হল কামালুদ্দিনের জীবন।
                            চট্টগ্রামের ‘ চুনতি’বাংলার সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা একটি নাম।বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে বাংলার তথা ভারতের সমাজ জীবনে প্রোথিত করবার ক্ষেত্রে চট্গ্রামের লোহাগড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের চুনতি গ্রাম তাঁর স্বমহিমায় আন্তর্জাতিক দুনিয়া তে স্থান করে নিয়েছে।এই গ্রামটির দক্ষিণপূবের পাহাড় আর উত্তর পশ্চিমেরষকোল বরাবর চলে গেছে আরাকান সড়ক।হালের চট্টগ্রাম- কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন এই অঞ্চলটি ছিল বাংলাতে মরমীয়া সুফী সাধকদের অন্যতম প্রাচীন আবাসভূমি।গোটা অঞ্চলটিকে সমন্বয়ী সংস্কৃতির এক তীর্থভূমি হিশেবে উল্লেখ করা যায়।এই চুনতির ডেপুটি বাড়ির সন্তান ছিলেন কামালউদ্দিন।এই চুনতি এবং সেখানকার ডেপুটি বাড়ির একশো শতাংশ শিক্ষার অগ্রগতি বিংশ শতাব্দীর বাংলায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল।
ব্যক্তি জীবনে কামালউদ্দিন ছিলেন এই চুনতির ডেপুটি বাড়ির ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন খানের দৌহিত্র তৈয়বউদ্দিন খান এবং মোছলেমা খাতুনের সন্তান।প্রখ্যাত রাজনীতিক হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর সঙ্গে কামালউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার কথা অনেকে বলেন।কিন্তু প্রকৃত তথ্য হল; তাঁদের ভিতরে কোনো আত্মীয়তা ছিল না, ছিল আত্মীয়প্রতিম বন্ধুত্ব।সেই বন্ধুত্বের সুবাদেই হাবিবুল্লাহ বাহারের জ্যেষ্ঠাকন্যা  সেলিনা বাহার , সুফিয়া কামাল কে আজীবন ,’ বৌমা’ বলে সম্বোধন করেছেন।এই শতাব্দীর ( একুশ শতক) সূচনাপর্বে হাবিবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত ‘ বুলবুলে’ র একটি নির্বাচিত সঙ্কলন বর্তমান নিবন্ধকার তুলে দেন জ্যোতি বসুর হাতে। তখন অবিভক্ত বাংলার আইনসভাতে হাবিবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে সময় অতিবাহিত করবার স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে তাঁর আত্মীয় কামালউদ্দিন খানের সঙ্গে পরিচয়ের প্রসঙ্গের অবতারণা জ্যোতি বাবু করেছিলেন।’৪৬  এর দাঙ্গা প্রশমনে কামালউদ্দিন এবং সুফিয়া কামালের ভূমিকার সশ্রদ্ধ উল্লেখ জ্যোতিবাবু করেছিলেন।প্রসঙ্গত বলতে হয়, হাবিবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা হেতু ‘বুলবুলে’ র প্রায় প্রতিটি সম্পাদকীয় কামালুদ্দিন লিখে দিতেন।
                           বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল এই নিবন্ধকার কে ‘৯৬ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বলেছিলেন; আমি ঘর ভাঙার নারীবাদে বিশ্বাস করি না।এই ঐতিহাসিক অভিমত সংগঠনে কামালউদ্দিন খানের চিরজাগ্রত ভূমিকার কথা না বললে, ইতিহাসের পাঠক্রমের যথার্থতা রক্ষিত হয় না।বাঙালির ভিতু বদনাম , যে শুভনামের কাছে স্তব্ধ হয়ে যায়, সেই সুফিয়া কামালের ‘জননী সাহসিকা’ হয়ে ওঠার অবিশ্রান্ত উৎসমুখ ছিলেন কামালউদ্দিন।নিটোল দাম্পত্যজীবনের ভিতর দিয়ে নারীকে একটি উন্মুক্ত আকাশে ধ্রুবতারা স্বরূপ কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়,তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত হলেন কামালউদ্দিন।তাইই গৃহের নিভৃত কোনে ও কিভাবে দ্রোহের আগুণ জ্বালতে পারা যায় সেই সমাজের বিরুদ্ধে যে সমাজ ঈদের বাজারে হাজার টাকার লেহেঙ্গা কেনবার ভিতর প্রগতি দেখতে পায়, আর উৎসবে দূরের কথা, অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে একমুঠো ভাত পায় না খিদের মুখে– তাঁদের জন্যে আজীবন লড়াই করে বুঝিয়ে গেছেন সুফিয়া কামাল।সুফিয়া কামাল নামক একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সর্বাঙ্গীন বিকাশে কামালউদ্দিন খান যে ঐতিহাসিক অবদান রেখে গিয়েছেন, তা কেবল ঢাকার বত্রিশ নম্বরে, সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক দপ্তরের কার্যালয়টির পিছনের বাড়িতেই আবদ্ধ থাকা কোনো বিষয় নয়।গোটা কার্যক্রম টিই আজ দেশ- কাল- সময়- ভাষা- লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তির বার্তার বিকাশে একটি বীজমন্ত্র হয়ে উঠেছে।
                       মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত (১৯২৬) হওয়ার ঠিক এক বছরের মাথাতেই কামালউদ্দিনের কন্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল;” আমরা যে যুগে বাস করছি, এ হচ্ছে মানবতার যুগ।সাম্প্রদায়িক আন্দোলনের মুখে একবিন্দু সত্য নাই।”( গণদাবি।’ পলিটিক্সের দুর্দশা’ , ১৯২৭, ৪ ঠা আগস্ট) ।কেবল উচ্চারণ ই নয়, হাতে কলমে এই বিশ্বাসের প্রয়োগে কামালউদ্দিন এবং সুফিয়ার ‘৪৬ এর দাঙ্গার কালে নিজের কন্যা আমেনা খাতুন( দুলু), বেগম মরিয়ম মনসুরের কন্যা জাকিয়া মনসুরকে নিয়ে পার্ক সার্কাসের লেডি ব্রাবোর্ণ কলেজে মেয়েদের জন্যে আশ্রয় কেন্দ্রের ঐতিহাসিক অবদানের কথা জ্যোতি বসু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারেন নি।দাঙ্গায় নিঃস্ব মেয়ের অর্থনেতিক পুনর্বাসনের উদ্দেশে পার্ক সার্কাসের ই কংগ্রেস এক্সজিবিশন রোডে ,’ রোকেয়া মেমোরিয়াল স্কুল’ নামে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল সুফিয়া কামাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।এই স্কুলটি তৈরিতে এবং সেখানে শিল্পী কামরুল হাসান, তাঁর ভাই হাসান জান আর মুকুলফৌজের কর্মীদের যুক্ত করার ক্ষেত্রেও কামালউদ্দিন খান ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।এই সময়েই নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে আসার পথে ট্রামের টিকিটের সাদা অংশে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একের পর এক স্কেচ এঁকেছিলেন কামালউদ্দিন খানের।সেই স্কেচ গুলি হয়তো কামালউদ্দিনের পরিবারে এখন আর সংরক্ষিত নেই।সেই স্কেচগুলির কথা বর্তমান নিবন্ধকার শুনেছিলেন কলিম শরাফির কাছে।কলিম শরাফির মতে, স্কেচ গুলি জয়নুল ভাইয়ের’ দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা’ র সমতুল শিল্পগুণের পরিচয় বাহী ছিল।
                সদ্বীপের মানুষ ছিলেন মুজফফর আহমদ। চট্টগ্রামের সাথে ভৌগলিক নৈকট্য এবং সামাজিক , সাংস্কৃতিক ঐক্যের কারণে তাঁর সঙ্গে কামালউদ্দিনের বিশেষ সখ্যতা ছিল।এই সখ্যতার কথা ব্যক্তিগত আলাপচারিতা তে জ্যোতি বসু ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন।এই সংযোগের ক্ষেত্রে কামালউদ্দিনের আত্মীয়প্রতিম হাবিবুল্লাহ বাহারের ভূমিকার কথাও জ্যোতিবাবু বলেছিলেন।আজ যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সাংস্কৃতিক বিকাশ নিয়ে গবেষণা করেছেন, সন্দর্ভ রচনা করেছেন, তাঁরা কেউ ই উল্লেখ করেন নি মুজফফর আহমদ, কামালউদ্দিন খান, হাবিবুল্লাহ বাহার এবং দিদারুল আলমের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা।’২৬, ‘২৯ এবং ‘৩২ সালে নজরুল তিনবার চট্টগ্রামে এসেছিলেন।এই পর্বে কামালউদ্দিনের সাথে নজরুলের বন্ধুত্ব বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।আজকের বাঙালির কাছে প্রায় অপরিচিত ই ব্যক্তিত্ব মাহবুব আলম চৌধুরী।তাঁর লেখা,’ কাঁদাতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ একদিন বাঙালির মুখে মুখে ফিরত।এই বিস্মৃত কবি কেও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে কামালউদ্দিন খানের বিশেষ ভূমিকা ছিল।কামালউদ্দিনের কাজী মোতাহার হোসেনের প্রতি ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা।নিছের ,’ কথায় কথায়’ তিনি তাঁর ‘ গুরু’ কাজী মোতাহার হোসেনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
                          কামালউদ্দিন গভীর ভাবে বিশ্বাস করতেন; ” জ্ঞান সাধনার ভিতরেই মানুষের জন্য অনন্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে।” তাই আত্মমগ্ন নিভৃত সাধনা ই ছিল তাঁর সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য।তাঁর এই নিভৃত এবং সর্বাঙ্গীন সাদাসিদে জীবনের  একটি প্রসঙ্গের অবতারণা করে নিবন্ধের ইতি টানব।
                            এতোটাই নিভৃতচারী ছিলেন তিনি যে, পরিবারের মানুষদের সামান্য বিলাসিতা তেও হতবাক হয়ে পড়তেন।ঘটনাটির বিষয়বস্তু আজকের প্রজন্ম হয়তো উপলব্ধি করতে পারবেন।হয়তো পারবেন না।আজকে দরিদ্র পরিবার গুলিতেও পরিধেয় জনিত সমস্যা দেশভাগ, দাঙ্গা, সত্তরের প্রাকৃতিক ঝঞ্ঝা ইত্যাদি কালের মতো নেই।তাই জানি না, প্রসঙ্গটির উল্লেখ আজকের প্রজন্মের কাছে কতোখানি হৃদয়গ্রাহী হবে।তবু ও কামালউদ্দিন খানকে বুজতে এই ঘটনাটির উল্লেখ করতেই হয়।
                           কামালউদ্দিনের মেজমেয়ে কন্যা সুলতানা তখন পড়াশুনা শেষ করেছেন।  ছাত্রী থাকাকালীন স্কলারশিপের টাকাতে একটু আধটু শখ করে শাড়ি কেনেন।এমন সময়ে চোরে আলমারি ভেঙে বেশ কিছু শাড়ি চুরি করে নিয়ে যান।এই ঘটনাটি শোনবার পর কামালউদ্দিন চোরেদের কাজে বিস্মিত হন নি, অবাক হয়েছিলেন, দেশের এই ভয়াবহ সঙ্কটের লগ্নে তাঁর মেয়ের স্কলারশিপের  উপার্জনে বেশ কিছু শাড়ি কিনে সেগুলি নিজের ব্যবহারের জন্যে সংরক্ষিত রাখার ঘটনাশুনে।
                          ক্ষণজন্মা কামালউদ্দিন কে নিয়ে সম্যক চর্চা আজ ও আমাদের অন্ধকার অতিক্রমের দিশা জাগায়।দেশ,কাল, ভাষার সীমারেখা অতিক্রম করে মনীষী কামালউদ্ধিনকে অন্তরের শ্রদ্ধা, প্রণাম।
              

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *