কার্ল মার্ক্স
ড. বিশ্বম্ভর মণ্ডল
মূর নামে ডাকতেন আত্মীয়-বন্ধুরা । সারা পৃথিবী তাকে চেনে কার্ল মার্ক্স নামে।মানুষের সেবার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াকে তিনি নিজের জীবনের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। ইতিহাস, দর্শন, শিল্পকলা, সাহিত্য, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি নানা শাখায় নিয়মিত পড়াশোনা করেছেন এবং সেই অধ্যয়নজাত সম্পদকে সমৃদ্ধতর ও আধুনিক করে লিপিবদ্ধ করেছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য। দর্শন শাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভের পরে চাকরিবাকরির চেষ্টা না করে সংগ্রামের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার জন্য পত্রিকা সম্পাদনার কাজে যুক্ত হন । তাঁর সম্পাদিত “রাইন” পত্রিকা সরকারকে জীবনের নানা দাবিদাওয়ার প্রশ্নে এমন নাস্তানাবুদ করে তোলে যে, জার্মান সরকার ঐ পত্রিকার প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন । একই সাথে তিনিও জার্মান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি প্যারিস চলে যান ও সেখান থেকে পত্রিকার কাজ করতে থাকেন । প্রাশিয়া সরকার তাঁকে বহিষ্কারের আদেশ জারি করে । তিনি বেলজিয়ামের ব্রাসেলস চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তূ তখন তাঁর চূড়ান্ত আর্থিক দুরবস্থা । ব্রাসেলস যাওয়ার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না। এই অবস্থায় বাড়ির কিছু আসবাবপত্র বিক্রি করে কিছু অর্থের ব্যবস্থা করেন। তাতেও সমস্যার সমাধান হ্য় না । এই সময়ে তাঁর পাশে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এঙ্গেলস । সেই সাহায্য ও আসবাবপত্র বিক্রির টাকা নিয়ে তিনি ব্রাসেলস চলে যেতে সফল হন । কিন্তু প্রাশিয়ার সরকার বেলজিয়ামেও তাঁকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় নি। ১৮৪৫ থেকে ১৮৪৯ সালের মধ্যে চার বার তাঁকে পরিবারশুদ্ধু বহিস্ক্রিত হতে হয়। যদিও এই কঠিন সময়েও তিনি একটুও হতোদ্যম হয়ে পড়েন নি। তাঁকে বেলজিয়াম ছেড়ে যেতে হয় । তিনি লন্ডন চলে যান। অর্থের অভাবে সন্তানদের ও অন্তঃসত্বা স্ত্রীকে প্যারিসে রেখে যেতে হয় । অর্থসংস্থান করে পরিবারের সবাইকে লন্ডনে নিয়ে আসেন । এখানে গিয়েও অর্থের অভাবে তাঁরা খুবই দুরবস্থার মধ্যে পড়েন। বাড়ি ভাড়া দিতে না পারায় তাঁদের সম্পত্তি ক্রোক করা হয় । বাড়িতে পাওনাদারদের হামলা শুরু হয় ।নিজেদের শোওয়ার খাট বিক্রি করে ওঁর স্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দেন । প্রতিদিন দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, শাসকের চোখরাঙানি, দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে বেড়ানো তাঁকে মানুষের কল্যাণের কাজ থেকে সরিয়ে রাখতে পারে নি । স্বাভাবিক জীবনযাপনের ফুরসত টুকু তাঁকে দেওয়া হয় নি দিনের পর দিন, সৃজনীমূলক কাজের পরিবেশ তো দূরের কথা। প্রতিনিয়ত তাঁকে শাসকের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্যোগকে সামলাতে হয়েছে । নিদারুণ অর্থাভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী । একের পর এক সন্তানের অকাল মৃত্যু তিনি দেখেছেন।১৮৫০-৫২ সালে পরপর তাঁর দুই সন্তান প্রায় বিনা চিকিৎসাতে মারা যায়। ১৮৫৫ সালে তাঁর ৮ বছর বয়সের ছেলে মারা যায়। এইরকম চরম প্রতিকূল সময়েও ভেঙে না পড়ে তিনি নির্বাসিত জীবনের সমস্ত গুরুভার সামলে, শ্ত্রুদের কুৎসাকে উপেক্ষা করে নিয়মিত পড়াশোনা ও লেখালেখির কাজ চালিয়ে গেছেন । বন্ধু এঙ্গেলসের ও তাঁর শ্রম ও সংগ্রামের প্রতিদিনকার ভাগীদার স্ত্রী জেনির সাহায্য ছাড়া তাঁর পক্ষে “পুঁজি” গ্রন্থটি শেষ করা সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ আছে, দারিদ্রের চাপে পড়ে তিনি নির্ঘাত মারাই যেতেন । বোঝাই যাচ্ছে, যারা জীবনের নানা ধাক্কায় মুশড়ে পড়েন না, বিভ্রান্ত হন না, হতাশায় ভোগেন না, হাত-পা ছুঁড়ে কাঁদেন না বা ঈশ্বরের দয়ার ভরসাতে অপেক্ষা করেন না, সেই বিকল্প পথের চিরসন্ধানী, সাহসী ও বিজ্ঞানমনষ্ক ভাবনার দিশারীদের অন্যতম প্রধান একজন হলেন মার্ক্স ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *