অনাথ হল বাংলা ভাষা
গৌতম রায়
” হঠাৎ ভোরের রোদে দেখি দিন অশ্রুঢাকা, প্রয়াণী গেছেন রাত্রে, বিশ্ববাসী পরম আত্মীয় হারা”- অ্যালবার্ট সোয়াৎজারের মহাপ্রয়াণে বিশ্বনাগরিক অমিয় চক্রবর্তীর এই পঙতি টিই মুক্তবুদ্ধির উপাসক আনিসুজ্জামানের মহাপ্রয়াণের পর মনে পড়ছে।করোনা অতিমারী আর কাঁটাতার যেন আমাদের দূরের বসে থাকা ক্ষুব্ধতাকে স্বদেশে পরবাসের একটা যন্ত্রণাবাদ্ধ অন্তহীন জাগরে উপনীত করবে।কাঁটাতার যেমন নজরুলকে ভাগ করতে পারে নি, তেমনি ই পারে নি বাংলা ভাষার দুই নক্ষত্র ডঃ শাহিদুল্লাহ এবং আনিসুজ্জামানকেও।উত্তর চব্বিশ পরগণার বসিরহাট মহকুমার এই দুই প্রাতঃস্মরণীয় বাঙালি তাঁদের জীবন দিয়ে মূর্ত করে গেলেন স্যার গুরুসদয় দত্তের সেই কথা; বিশ্বমানব হবি যদি শাশ্বত বাঙ্গালি হ।শহিদুল্লাহের গ্রাম ছিল বসিরহাটের পেয়ারা, আনিসুজ্জামানের মামুদপুর ।
                                 এ পার বাংলাতে যাঁরা প্রগতিশীল ভাবনা ভাবেন, বাংলা ভাষা- সাহিত্য নিয়ে চর্চা করেন, তাঁদের অনেকের ই আপনার থেকে আপন মানুষ টি আজ চলে গেলেন।তাঁর এই চলে যাওয়ার প্রেক্ষিতে আশাপূর্ণা দেবীর প্রয়াণের পর নবনীতা দেবসেনের কথাটাই কানে বাজছে;’ যে কুসুমটি ঝরিয়া যায়, সেই কুসুমটি আর ফোটে না,।”
                              আনিসুজ্জামানের বৈদগ্ধ্যের পরিচয় প্রত্যক্ষ ভাবে বাংলাদেশের মানুষ পেয়েছেন।এপার বাংলার ও কিছু মানুষ পেয়েছেন।এপার বাংলার শিক্ষক , গবেষককুল , বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের সুপ্ত ধর্মীয় পরিচয় বোধের নিরিখে প্রবাহমান বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে দেশি- বিদেশি পন্ডিতদের যতো ব্যবহার করেন, আনিসুজ্জামান কে তার দশ শতাংশ ও ব্যবহার করেন না।কিন্তু বাংলা ভাষা বা সাহিত্য ই কেবল নয়, বাংলা তথা বাঙালির আর্থ- সামাজিক- সাংস্কৃতিক আকাশ নিয়ে সামান্যতম আলোচনা করতে গেলেও আমাদের আনিসুজ্জামানের,’ মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ ব্যাতীত দ্বিতীয় রাস্তা নেই।
                           বহুত্ববাদী ভারত, সমন্বয়ী বাংলার যেন কোরান, গীতা, বাইবেল, ত্রিপিটক আনিসুজ্জামানের এই মহাগ্রন্থটি।মতিঝিল প্রাসাদে শাহ্ মত জঙ্গ আর সউলত জঙ্গ অপরদিকে মনসুরগঞ্জ প্রাসাদে সিরাজের ‘ হোলি’ উৎসব পালন– ইতিহাসের পরত উন্মোচন করেই কেবলমাত্র নয়, সামাজিক আখ্যানের মর্মমূল থেকে তুলে এনে এই বাংলার হিন্দু- মুসলমানের সম্প্রীতি, পবিত্র ইসলামের ঔদার্য যে ভাবে আনিসুজ্জামান তুলে এনেছিলেন- তা আমরা এপার বাংলার সাধারণ মানুষের কথা বাদ ই দিএ, সারস্বত সমাজ ও সেভাবে উপলব্ধি করতে চাই নি।এই না চাওয়াটা যে সার্বিক ভাবে বাঙালির কাছে কতোখানি ক্ষতি তা হয়ত আজ ও আমরা ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছি না।
                          আনিসুজ্জামানের পিতৃদেব অন্তর থেকে চান নি ভারত ত্যাগ করতে।কিন্তু বিভাজিত ভারত, এমন কি বাংলাও কিভাবে তাঁর ভূমিপুত্রদের প্রতি স্নেহের সামান্যতম পরশটি দিতে কার্পণ্য করেছিল, আনিসুজ্জামানের পরিবারের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্থানে ( তখন ও চলতি কথায় পূর্ববঙ্গ,’৫৬  সালে অবিভক্ত পাকিস্থানে প্রথম সংবিধান রচিত হয়।তারপর থেকে পূর্ব পাকিস্থান শব্দটির প্রচলন হয়।) চলে যাওয়ার ভিতর দিয়ে তা বোঝা যায়।যেমন বোঝা যায় শওকত ওসমান( আজ তাঁর ও প্রয়াণ দিবস), কলিম শরাফিদের ভারত ত্যাগের ভিতর দিয়ে।
                     ভারত ত্যাগ করতে বাধ্য হলেও ভারতের দিগন্ত থেকে নিজেদের মুছতে না পারার অশ্রুসজল দিঠিতেই আনিসুজ্জামানের পরিবার ‘৪৭ সালের অক্টোবর মাসে বাসা বাঁধেন খুলনাতে।আনিসুজ্জামান তখন ক্লাস সেভেনে পড়েন।সুভাষচন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠ শহযোগী শাহনাওয়াজ খান পাকিস্থানের নাগরিক হওয়ার পর ও অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কে বলেছিলেন; পাকিস্থানের যেখানেই আমাকে করব দিক না কেন, তার উত্তর- দক্ষিণ- পূব- পশ্চিম, কোনো একটি কোনে তো ভারতবর্ষ থাকবেই।আজ আনিসুজ্জামানের চিরবিদায়ের পর , ক্লাস সেভেনের ছাত্র থাকাকালীন তাঁর সেই দেশত্যাগ আর খুলনায় যাওয়ার পর ও আকাশের দিকে তাকিয়ে ,নিজের জন্মস্থান বসিরহাটকে খুঁজে ফেরার কাকুতি, যে খোঁজা থেকে তিনি জীবনের উত্থান- পতন- বন্ধুর– কোনো সময়েই একমুহূর্তের জন্যে নিজেকে সরাতে পারেন নি– সেই আন্তর্জাতিকতা, মনের কোনো সীমান্তরেখা না টানার অননুকরণীয় অভিব্যক্তি– তার কথা খুব মনে হচ্ছে।
                            ডঃ শাহিদুল্লাহ, সুনীতি বাবু, আবদুল হাই, আনিসুজ্জামান, বাংলা ভাষার শেষ নক্ষত্রটা আজ ঝরে গেল।আনিসুজ্জামান কেবল পুঁথিগতবিদ্যাধিপতি তো ছিলেন না।তাঁর সম্প্রীতি বোধ, সার্বিক ধর্মনিরপেক্ষ মনন– এইসব নিয়ে আগামী দিনে অনেক চর্চা হবে।বস্তুত মুসলিম সাহিত্য সমাজ, ‘ শিখা’ গোষ্ঠী, যাকে অন্নদাশঙ্কর বাংলার দ্বিতীয় জাগরণ বলতেন, সেই কর্মপ্রবাহের  সাথে আনিসুজ্জামানের প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকলেও, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শেষ ঋত্ত্বিক বলে তাঁকে সহজেই অভিহিত করতে পারা যায়।
                           বৈদগ্ধ্যচর্চার পাশাপাশি একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিশেবে বাঙালির ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শাহাদাত ফরণের পর তাঁদের পরিবারের একমাত্র জীবিত দুই সদস্য শেখ হাসিনা আর শেখ রাহানার কার্যত তিন অভিভাবক ছিলেন।প্রথমজন বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল।অপর দুইজন হলেন কবীর চৌধুরী এবং আনিসুজ্জামান।বঙ্গবন্ধুর কন্যারা এই দুই শিক্ষকের প্রত্যক্ষ ছাত্র ও বটে।আর সুফিয়া কামাল তো ছিলেন হাসিনা, রেহানার আত্মার আত্মীয়, ফুফু।
                          আনিসুজ্জামান নয়ের দশকের গোড়ার দিকে নরেন বিশ্বাসের সাথে যৌথভাবে ‘ ঐতিহ্যের অঙ্গীকারে’ র জন্যে একটি পুরস্কার পেলেন।এক ই সঙ্গে পৃথক ভাবে সেইবার ওই পুরস্কার টি পেয়েছিলেন অন্নদাশঙ্কর এবং শামসুর রাহমান।একটি ছেলে অনুষ্ঠানের ভিডিও করলো।এই ভিডিও করবার সুযোগ টা তার পাওয়ার পিছনে আমার একটু ভূমিকা ছিল।শেষে আমি লজ্জায় মরি, যখন শুধলাম, ছেলেটি আনিসুজ্জামান এবং নরেন বিশ্বাস , দুজনকেই তাঁদের হোটেলে গিয়ে সেই সময়ের পাঁচশো টাকা করে সেই ক্যাসেটটি বিক্রি করে গেছে।বিষয়টি নিয়ে কিন্তু মজাই করলেন পরে আনিসুজ্জামান।আমাকে লিখলেন; বুঝলাম ছেলেটি বেশ করিতকর্মা!
                       শেখ হাবিবুল হক, আনিসুজ্জামানের মামাতো ভাই।বৃদ্ধ পিতাকে সফিউন্নেসা জানাবেন না তাঁর ফুফাতো ভাইয়ের এই চিরবিদায়ের কথা।কেবল মনে পড়ছে , শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের চিরবিদায়ের পর শামসুর রাহমান বলেছিলেন; একছুটে চলে যেতে মন চাইছে শক্তির নিথর দেহটির পাশে।অথচ কাঁটাতার।
               সেই কাঁটাতার ই শেখ হাবিবুল হকের সাথে কতোদিন দেখা করতে দেয় নি তাঁর আপন পিসতুতো ভাইকে।কেবল মনে পড়ছে গৌরকিশোর ঘোষের ‘ প্রতিবেশী’ র ‘ ফুলকি’ র জিজ্ঞাসা।’ দেশ টা তবে কি? পিঁপড়ের বাসা ভাঙলো, আর পিঁপড়ে গুলো ছন্নছাড়া হয়ে গেল।দেশটা কি তবে পিঁপড়ের বাসা? তোওয়াব চাচা?”
                           

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *