অনুভবে রবীন্দ্রনাথ

       গৌতম রায়

মৃত্যুকে নীরবে ত্বরণের অনুভূতি বুঝি জ্ঞাত বা অজ্ঞাত সব অবস্থাতেই মানুষ পায় রবীন্দ্রনাথের কাছে।আমার মায়ের নশ্বর শরীর যখন পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তখন কান্নার দলা গুলো আমার গলাতে ” আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছিল।শ্মশানের আশেপাশের লোকজন অবাক আর বিরক্তি দুই মিশিয়েই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।কেউ ভেবেছে পাগল, কারো মনে হয়েছে নাটকবাজি।কারণ , শ্মশানে শোকাতুরের কন্ঠে হরিনাম শোনা গেলেও রবীন্দ্রনাথ তো সচরাচর শোনা যায় না।মায়ের চিতাগ্নি যখন নদীর জলে ভাসিয়ে দিচ্ছিলাম , তখন ও আমার কাঁপা কাঁপা গলাতে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ই।আমার কান্না হয়ে ঝরে পড়ছিল;” তোমায় নতুন করে পাব হারাই ক্ষণে – ক্ষণ/ ও মোর ভালোবাসার ধন।দেখা দেবে বলে তুমি হও যে অদর্শন / ও মোর ভালোবাসার ধন।ওগো, তুমি আমার নও আড়ালের, তুমি আমার চিরকালের– ক্ষণকালের লীলার স্রোতে হও যে নিমগন/ ও মোর ভালোবাসার ধন। আমি তোমায় যখন খুঁজে ফিরি ভয়ে কাঁপে মন– প্রেমে আমার ঢেউ লাগে তখন।তোমার শেষ নাহি, তাই শূন্য সেজে শেষ করে দাও আপনাকে যে– ওই হাসিরে দেয় ধুয়ে মোর বিরহের রোদন/ ও মোর ভালোবাসার ধন।” 

                     বিচ্ছেদের মাঝে ভালোবাসার ধন কে ফিরে ফিরে পাওয়ার এই অনুভূতি বুঝিবা রবীন্দ্রনাথ ব্যাতীত আর কেউ কোনোদিন দেন নি। হয়তো দেবেন ও না।ব্যথার গভীনে ডুব দিয়ে ও এক টুকরো ভালোলাগা কে ডুবুরির মতো তুলে আনার নাম ই রবীন্দ্রনাথ।তিনি এমন ই এক আশ্রয় যে ব্যথায় কথা ডুবে গেলেও যদি খড় কুটোর মতো তাঁকে আমরা ধরে থাকি , তবে বুঝি বা আমরা তলিয়ে যাব না।এক অন্তহীন জিগ্যাসার পথে আমরা হাঁটছি।প্রাসাদে পৌঁছনোর রাস্তাটা সবাই ই খুঁজছি।রাস্তা খুঁজতে গিয়ে অলি গলি হাতড়ে মরছি,কিন্তু সদর টা কেউ ই ঠাওর করে উঠতে পারছি না।

                     আচ্ছা , সদরের রাস্তা কেন আমরা খুঁজি? সদরের পথ দিয়ে না হাঁটলে কি প্রাসাদে পৌঁছনো যায় না?রবীন্দ্রনাথ কি কেবল সদরের ই অনুভূতি তে ধরা দেন?আমাদের মতো মফস্বলিদের চিন্তার আকাশ টা সেই যে জ্ঞান হওয়া তক তিনি ছেয়ে আছেন একটা নিবিড় ছায়া দিয়ে তা তো সূর্যের মতো অমোঘ সত্য।আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে বসে থাকা সত্তাটির নাম রবীন্দ্রনাথ।বেদনায় আকীর্ণ পেয়ালা কে যিনি ভাবনা দিয়ে স্বপ্নিল মায়ায় ভরিয়ে দিতে পারেন তিনি।স্বপ্নে মেঘাচ্ছন্ন আবেশ থেকে আমাকে বাস্তবের মাটিতে পা দিতে শেখানোর নাম ও রবীন্দ্রনাথ ই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *