ভারতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের সঙ্কট প্রসঙ্গে
গৌতম রায়
নেতৃত্বের প্রশ্নে গোটা ভারত জুড়েই একটা সঙ্কটের আবর্ত ইন্দিরা গান্ধীর নির্মম হত্যাকান্ডের পর তীব্র হয়ে উঠতে থাকে।ইন্দিরার জীবদ্দশাতেই নেহরু জামানার মতোই প্রশ্ন উঠত, ইন্দিরার পর কে?এই প্রশ্নটা সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুর পর নানাভাবে আবর্তিত হতো।অনেক প্রাজ্ঞ মানুষদের ই গভীর সংশয় ছিল রাজীবকে ঘিরে।রাজীব অবশ্য ঘটনাচক্রে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রবীণ মানুষদের সেই সংশয়কেই শীলমোহর দিয়ে গিয়েছেন।এতো অনভিজ্ঞ অথচ গরিষ্ঠতার গরিমায় প্রবীণদের অগ্রাহ্য করে কিচেন ক্যাবিনেটের দ্বারা পরিব্যাপ্ত, সেই কিচেন ক্যাবিনেট থেকে একে একে অমিতাভ বচ্চন, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এমন কি অরুণ নেহরুর ও সরে যাওয়া থেকেই বোঝা যায়, মা – দাদুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার বিন্দুমাত্র রাহুলের ছিল না।   
                     এই প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর পরে কে ধরবেন বাংলার রাজনীতির হাল, সেই প্রশ্নটাও ধীরে ধীরে উঠে আসতে থাকে।ইন্দিরার শূন্যস্থান রাজীব পূরণ করে  সাময়িক ভাবে যে পরিবারতন্ত্রের প্রবণতাকে পরিপুষ্ট করেছিলেন, নিজের অপরিণত রাজনৈতিক মানসিকতা, নিজের দল এবং বিরোধী প
দলের প্রবীণদের প্রতি অসম্মানজনক( ‘৮৭ র পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটের আগে জ্যোতিবাবুকে রিটায়ার করিয়ে ছাড়বেন বলে যে স্পর্ধোক্তি করেছিলেন) আচরণ সামগ্রিক ভাবে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে একটা সঙ্কটের আবর্ত তৈরি করেছিল। ।পরিবারতান্ত্রিক ঝোঁক থেকে বৈচিত্রময় ভারতের বেশিরভাগ অংশ থেকেই যে একটা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, সেটা বিশ শতকের শেষপ্রান্তে বেশ ভালোভাবেই মালুম হতে থাকে।
                            পশ্চিমবঙ্গে বাম আমলের  রাজনীতিতে বিরোধীকন্ঠ হিশেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উঠে এলেও জ্যোতি বসু সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ণ;’ কমিউনিস্টরা দেহত্যাগ না করলে, পদত্যাগ করেন না’- মমতার রাজনৈতিক রুচির যে পরিচয় রাখে তা মেট্রোপলিটন বাঙালিমন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয় না।ফলে, জ্যোতিবাবুর অবসর গ্রহণের পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দুটি পর্যায়ে কেবল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকেন , তাইই নয়।রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভারতের জাতীয় আন্দোলন উত্তর পর্বের প্রতিনিধি হিশেবে তিনি ক্রমশঃ একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা পেতে থাকেন।জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত প্রজন্মের স্বাভাবিক অবসানের পর রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পরের প্রজন্মের মানুষদের নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে বুদ্ধদেববাবু যে নজির স্থাপন করেন, তা রাজনীতির প্রাঙ্গনকে অতিক্রম করে সামাজিক অঙ্গনকেও বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করে।
                       জ্যোতিবাবুর মুখ্যমন্ত্রীত্বকালেই উঠে এসেছিল এই প্রশ্ন; জ্যোতি বাবুর পরে কে? দীনেশ মজুমদার এবং শঙ্কর গুপ্ত ছিলেন জ্যোতিবাবুর পরের প্রজন্মে নেতৃত্বদানকারী হিশেবে ন্যাচারাল চয়েজ।এই দুজন নেতার অকালমৃত্যু তুলে এনেছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম।   সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে দীনেশ মজুমদার এবং শঙ্কর গুপ্ত আর বামেদের দলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে রবীন সেনের হঠাৎ মৃত্যু কেবল বামপন্থী দলগুলির ই ক্ষতি নয়, বামপন্থী আন্দোলনের ও শুধুমাত্র ক্ষতি নয়, সামগ্রিক ভাবে সেটা ছিল বাংলার ক্ষতি, বাঙালির ক্ষতি।যে অবক্ষয়ের অভিযোগ বামপন্থীদের সম্পর্কে ওঠে, যে ছিদ্রপথে মমতার মতো ব্যক্তিস্বর্বস্ব মানুষ নেত্রী হয়ে ওঠেন, এই পরিবেশ তৈরি ই হতো না যদি রবীন সেনের মতো মানুষ বেঁচে থএ সাংগঠনিক ভাবে বামেদের নেতৃত্ব দিতেন।
                  বুদ্ধদেববাবুর উত্তরাধিকারী হিশেবে যে নামটি উঠে আসতে শুরু করেছিল, সেই নামটি কোনো নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিজনিত কারণে উঠে আসছিল না।সেই নামটি কিন্তু উঠে আসছিল এমন একজন মানুষকে ঘিরে যিনি একাধারে যুব আন্দোলনের নেতৃত্বের ভিতর দিয়ে কেবল বাংলা নয়, গোটা ভারতে যুব আইকন হয়ে উঠেছেন।অপরপক্ষে দীর্ঘ বারো বছরের সাংসদ জীবনে বামপন্থী সাংসদ হিশেবে জ্যোতির্ময় বসুর গ্রহণযোগ্যতার সর্বোত্তম উত্তরসূরি হিশেবে উঠে আসা গীতা মুখার্জীর জীবদ্দশাতেই , যিনি নিজেকে গীতার মতো সতীর্থ এবং তীব্র বিরোধী – সকলের কাছেই সমান গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছিলেন।
                  বুদ্ধদেববাবু ২০০১ সালে মন্ত্রীসভা গঠনের পর তাঁর দলের তরুণ তুর্কি মহঃ সেলিমকে তাঁর মন্ত্রীসভাতে আনেন।তুখর যুব নেতা সেলিম তার আগে ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ।রাজ্যসভার চেয়ারম্যান প্যানেলে সবথেকে কনিষ্ঠ ব্যক্তি হিশেবে রাজ্যসভা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে দক্ষতার পরিচয় সেলিম রেখেছিলেন, তাতেই পরিস্কার হয়ে উঠেছিল, প্রশাসক হিশেবে তাঁর ভূমিকাটি।সেই ভূমিকার একটা সার্থক রূপায়ন আমরা দেখতে পেলাম অনলবর্যী সেলিমের রাজ্য মন্ত্রীসভার সদস্য হিশেবে।তাঁর প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপে যে দূরদর্শিতা এবং দক্ষতার পরিচয় মানুষ পাচ্ছিল, তাতে এটাই উঠে আসতে শুরু করেছিল যে, বুদ্ধদেবের পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব হিশেবে যোগ্যতম ব্যক্তি হলেন সেলিম।তাঁর দূরদর্শিতা প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ ই যথেষ্ট, স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বৈজ্ঞানিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ মডেল তিনি রেখেছিলেন, সেটি যদি অনুসৃত হতো , তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হাজার হাজার ছেলেমেয়ে দীর্ঘদিন যাবত প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও , চাকরি না পেয়ে এমন চরম অনিশ্চয়তার ভিতরে দিন কাটাতেন না।
                           মন্ত্রী হিশেবে সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করতে যে পথ তিনি তৈরি করেছিলেন , তাকে অটলবিহারী আজপেয়ীর মন্ত্রী পর্যন্ত রাজ্যসভাতে ভারতের সেরা মডেল বলে অভিহিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।সেলিমের অনবদ্য নেতৃত্বে গোটা ভারতে এটা প্রমাণিত হয়েছিল, সরকারী ঋণখেলাপি হিশেবে পশ্চিমবঙ্গে তখন একজন মুষলমান ও চিহ্নিত হন নি।প্রযুক্তিগত শিক্ষায় গরিব মানুষ নিজেদের প্রশিক্ষিত করে অর্থনৈতিক ভাবে সামলম্বী হয়ে উঠুক, এই লক্ষ্যে শহরের বস্তি অঞ্চলগুলিতে তিনি যে কারিগরিবিদ্যার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা যদি বজায় থাকতো , তাহলে পশ্চিমবঙ্গে গরিব মুসলমানেদের আর্থিক মানোন্নয়নে একটি ঐতিহাসিক পর্যায় রচিত হতে পারত।
                           ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেলিম প্রার্থী হন।জেতেন ।ফিরে যান জাতীয় রাজনীতিতে।সেলিমের মতো ব্যক্তিত্ব তাঁর অনলবর্ষী অভিধারাতে ভারতের সংসদে জ্যোতির্ময় বসুর যোগ্য এবং সার্থক উত্তরসূরে হিশেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেও , সিঙ্গুর – নন্দীগ্রাম ইত্যাদি ইস্যু কে হাতিয়ার করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যে সঙ্কট তৈরি হয়, সেই পর্যায়ে রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর অভাব খুব বেশি ভাবে প্রকট হয়ে উঠতে থাকে।দোদুল্যমানতা বা সিদ্ধাতহীনতা — এগুলি যেমন একজন রাজনীতিকের কাছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে প্রশ্ন চিহ্নের সামনে এনে দেয়, তেমনি ই সাধারণ মানুষের জীবন- জীবিকা কেএনে দেয় চরম অনিশ্চয়তার ভিতরে।উদাহরণ হিশেবে মুখ্যমন্ত্রী হিশেবে প্রফুল্লচন্দ্র সেনের কর্মধারার কথা আমরা স্মরণ করতে পারি।পাশাপাশি বলতে হয়, একজন দক্ষ প্রশাসকের ক্ষেত্রে সময়োচিত ধৈর্য প্রদর্শন হল সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট্য।যে ধৈর্যের পরিচয় সল্ট লেকের পরিপূর্ণতা দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্যোতি বাবু দেখিয়েছিলেন।রাজারহাট- নিউটাউনের ক্ষেত্রে ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তার সন্মিলনের যে আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন জ্যোতিবাবু, সেলিমের মননশীলতা, ধৈর্য, বাস্তববোধ, সততা, সবাইকে নিয়ে চলবার মানসিকতা, ভদ্রতা এবং সমুচিত দৃঢ়তা আর তার সাথেই প্রয়োজনে দৃঢ়তম সিংহপুরুষ হয়ে ওঠার মতো ব্যক্তিত্ব , সেই জ্যোতি বাবু, বুদ্ধবাবুর পরের প্রজন্মে দুর্লভ ভাবে উপস্থিত আছে সেলিমের ভিতরে।সেলিমের মতো দক্ষ , সর্বাংশে সৎ ব্যক্তিকে যদি সেদিন যথোচিত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক গুরুত্ব দেওয়া হতো, নিশ্চিত করে বলা যায়, এই দুরবস্থা বামেদের হতো না, বাংলার মানুষের হতো না।
              জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের যোগ্য উত্তরসূরি হিশেবে মহঃ সেলিমের আপামর মানুষের কাছে যে গ্রহণযোগ্যতা সেই সময়ে  তৈরি হয়েছিল, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেই পর্যায়ক্রম কে যদি বামপন্থী শিবির ব্যবহার করতেন, তাহলে কেবল বামপন্থী রাজনীতির আজকের সঙ্কট নয়, সাধারণ মানুষের জীবন – জীবিকার ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হয়েছে, নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় , এই দুরবস্থার ভিতরে আমাদের পড়তে হতো না।সঙ্কট কোন ছিদ্রপথে প্রবেশ করতে পারে, মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগে সেটা বোঝার মতো সেলিমের যে ক্ষমতা এবং দক্ষতা, তাকে একমাত্র তুলনা করা যায় জ্যোতিবাবুর দক্ষতার সঙ্গে।এই তুলনার সাথেই বলতে হয়, জ্যোতিবাবুর মতো রাশভারি ব্যক্তিত্বের মানুষ নন সেলিম।আবার এতোটুকু তরল ব্যক্তিত্ব নিয়েও তিনি চলেন না।একটা নিজস্ব ঘরানা তিনি তাঁর ব্যক্তিত্বে ফুটিয়ে তোলেন, তাই খুব সহজেই তিনি সব প্রজন্মের মানুষ দের, জাতি- ধর্ম- বর্ণ- ভাষা- লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষদের হৃদয়স্পর্শ করতে পারেন।
                         এইরকম একটি মানুষ যদি ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতে বামেদের অভূতপূর্ব জয়ের অব্যবহিত পরেই সিঙ্গুর – নন্দীগ্রাম ঘিরে যে সঙ্কট তৈরি হল, সেই সময়ে প্রত্যক্ষ ভাবে আরো বেশি বাংলার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতেন, তাহলে বামেদের এই বিপর্যয়, মমতার মতো প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার ধারক বাহক, যাঁর একমাত্র লক্ষ্য আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে সব ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা– এইসব কোনো কিছুই ঘটতো না।সর্বোপরি মানুষের এই ভয়ঙ্কর দুরবস্থা, সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার উপক্রম, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বদলের অপচেষ্টা– এইসবের বিরুদ্ধেই গণসংগ্রামকে অনেকবেশি শক্তিশালী করা যেত যদি বামেদের এই নির্বাচনী বিপর্যয় না ঘটত।আর সেলিম যদি ২০০৬ এর পর থেকে রাজ্য রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয় থাকতে পারতেন, তাহলে বামেদের এই বিপর্যয়কে ও সহজেই রুখে দেওয়া সম্ভব হতো।যেভাবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ম্যালাইন করতে নন্দীগ্রামে গুলি চলেছিল, সেইসব ঘরের শত্রু বিভীষণদের অনেক আগেই সমূলে উৎপাটিত করে ফেলতে পারতেন অনলবর্ষী সেলিম।
                           পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের জোট নিরপেক্ষ অবস্থানকে ধ্বংস করে, এ দেশে একটি মার্কিন মুখী সরকারকে ক্ষমতায় আনা।গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদীদের মুক্তাঞ্চলে পরিণত করতে ভারতে একটি হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী দলকে ক্ষমতায় আনা ছিল মার্কিন কর্তাদের কাছে একটি অবশ্য পালনীয় কাজ।এভাবেই তারা বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ , গণতান্ত্রিক সরকারকে ও বেকায়দায় ফেলবার বিষয়টিকেও  কৌশল হিশেবে নিয়েছিল।সেই কৌশলের ই অঙ্গ ছিল পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের পর্যুদস্ত করা।অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলি সেদিন এটা বুঝতে পারে নি যে, সেদিন প্রথম টার্গেট হয়েছিলেন বামপন্থীরা।পরের টার্গেট যে তাঁরা সেটা অবিজেপি দল গুলি বোঝে নি।বিজেপির বন্ধু মমতা সেটা জানতেন।আর সেটা জানতেন বলেই বাংলাদেশে মৌলবাদীরা খুশি হয়ে, ভারতের মৌলবাদীদের বিস্তারের সুযোগ যাতে তারা করে দেয়, সেজন্যে মুখ্যমন্ত্রী হয়েই বাংলাদেশকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিসসা দিতে আপত্তি করেছিলেন।
                                বামপন্থীদের ভিতরে এমন কিছু লোকেদের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অঙ্গ হিশেবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাদের একমাত্র কাজ ছিল বামপন্থীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সবরকম ভাবে বিভ্রান্ত করা।সেই কাজের ই অঙ্গ হিশেবে নন্দীগ্রাম যে জেলাতে অবস্থিত , সেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাতে বামফ্রন্ট সরকার, বিশেষ করে সেদিনের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে সবরকম ভাবে হেনস্থা করতে একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র হয়েছিল।এই ষড়যন্ত্রে তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, পি ডি এস, অতি বাম, এন জি ও গুলি এমন কি কংগ্রেস সহ বামপন্থীদের ভিতরে থাকা একটি অংশ , যারা সংসদীয় রাজনীতিতেও ক্ষমতাশীল ছিল– তারা বিশেষ রকমের ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছিল। এঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল , যে কোনো উপায়ে বামপন্থীদের ক্ষমতাচ্যুত করা।এই গোটা প্রক্রিয়াটি বুদ্ধবাবু যথার্থ ভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হতেন যদি সেলিমের মতো সহযোদ্ধা রাজ্য রাজনীতিতে তখন সার্বিক ভাবে সক্রিয় থাকতেন।সেলিমের ভিতরে যে আত্মপ্রচার বিমুখ, ব্যক্তিস্বার্থহীন, ঘরের ভিতর ঘর তৈরির মানসিকতাবিহীন প্রকৃত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী, বুদ্ধিমত্তা এবং সবথেকে বড়োকথা গলাবাজির চাতুর্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত না করবার একটি অনন্যসাধারণ প্রবণতা আছে, সেটি যথার্থ ভাবে সক্ষম হতো ঘরে বাইরে যাবতীয় ষড়যন্ত্রের জাল কে ছিন্ন করতে।
                            এই সার্বিক পরিস্থিতি সেদিন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পক্ষে মোকাবিলা করা অনেকখানি সহজ হতো যদি তাঁর প্রশাসনের ভিতরে মহঃ সেলিমের মতো ব্যক্তিত্ব সার্বিক সক্রিয় থাকতেন।বুদ্ধবাবুর পরে , আজকের মতো , সেদিন ও , মানুষের কাছে সেলিম ছিলেন একমাত্র বামপন্থী নেতৃত্ব , যাঁকে ঘিরে এতোটুকু বিতর্ক নেই।
                        ক্ষমতা থেকে অর্থ– একটি বিতর্ক ও সেলিমকে কখনো স্পর্শ করতে পারে নি।ধর্মনিরপেক্ষতার মূর্ত প্রতীক হিশেবে যাঁকে যথার্থ ভাবে মুজফফর আহমদ এবং জ্যোতি বসুর সার্থক উত্তরসূরি বলা যায়।যুব আন্দোলনের আইকন হিশেবে দীনেশ মজুমদারের সার্থক প্রজন্ম হিশেবে যাঁকে চিহ্নিত করা যায়।এই মানুষটি যদি সেদিন সর্বাংশে বুদ্ধদেব বাবুর পাশে সক্রিয় থাকতে পারতেন, তাহলে কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা ভারতে আজ যেভাবে বামপন্থীদের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তা আদৌ সম্ভব হতো না।
                  আজ যেভাবে বাংলাদেশে জামাত- বি এন পি কে শক্তিশালী করা আর শেখ হাসিনার শক্তিক্ষয়ের তাগিদে মোদি- মমতার যৌথ উদ্যোগে তিস্তার পানির ন্যার্য প্রাপ্তি থেকেবাংলাদেশকে বঞ্চিত করা হয়েছে , তা সম্ভবপর হতো না।যেভাবে ২০১১ তে ফেলানি খাতুন নামক এক কিশোরীকে বি এস এফ নির্মম ভাবে হত্যা করে সারারাত তাঁর নিষ্প্রাণ দেহটাকে কাঁটাতারে ফেলে রাখার মত নির্মমতার পর , আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে রবার বুলেটের প্রতিশ্রুতি দিয়েও প্রতি নিয়ত না লঙ্ঘন করে চলেছে, এই অমানবিকতা সম্ভবপর হতো না , যদি  বামপন্থীরা আজ অতীতের মতো ভারতে গণসংগ্রাম এবং সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী থাকত।আর বামপন্থীদের সেই সক্রিয়তা বজায় রাখতে তাঁদের সবথেকে বড় হাতিয়ার সেলিমকে যদি আজ ও সার্বিক ভাবে নেতৃত্বের শীর্ষে তুলে ধরা হয়, তাতে কেবল পশ্চিমবঙ্গ নয়, কেবল ভারত নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিই ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে নোতুন করে উজ্জীবিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *