Skip to toolbar

তারাশঙ্কর
গৌতম রায়
দিল্লি গণহত্যা ক্লিন্ন ভারত অসহায় মানুষগুলোর বোবা কান্নাটাকে বুঝে ওঠার আগেই কোবিদ ১৯ গোটা বিশ্বের মতোই ভারতের গোটা সামাজিক কাঠামোটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিতে শুরু করেদিল।ধর্মের ভিত্তি , ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে ভাইরাস বাহিত একটি অতিমারী সংক্রমিত হতে পারে, এমন একটি অপবিজ্ঞান একটি দেশের শাসক দলের কর্মী , সমর্থকেরা তোলেন, আর তাঁদের শীর্ষ নেতারা , এ নিয়ে পালন করেন গভীর নীরবতা এটা গোটা বিশ্ব দেখল।
                প্রতিবেশি দেশ , বাংলাদেশে , বরিশালে মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্তের বাসগৃহে কলেজের নামকরণ ঘিরে সাম্প্রদায়িক বিতর্ক তোলার সবরকম চেষ্টা করে সে দেশের সংখ্যাগুরু মৌলবাদীরা।সরকার এখনো পর্যন্ত একটা প্রকৃত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, সাম্প্রদায়িকতার দাবানলকে ছড়াতে দেন না।ভারতের সংখ্যাগুরু মৌলবাদীরা গোটা দেশকে মুসলমানেরা করোনা ছড়াচ্ছে – বলে বিভাজিত করলেও , বাংলাদেশের সজাগ প্রশাসনের দৌলতে সেদেশের সংখ্যাগুরুরা এই গুজব ছড়াতেই পারে না যে, হিন্দুরা করোনা ছড়াচ্ছে।
                          এমন একটি দহনকালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে সবথেকে প্রাসঙ্গিক মনে হয় , তাঁর , ‘ কলিকাতার দাঙ্গা ও আমি’ নামক ছোট গল্প টি।এই গল্পটি সৃষ্টির পটভূমি থেকে প্রায় পঁচাত্তরটা বছর অতিক্রম করে এসেছি আমরা।ছয়ের দশকের দাঙ্গার ভয়াবহকতাকে অতিক্রম করে , আটের দশকে দেখেছি ভাগলপুরের দাঙ্গা।সেই দশকের শুরুতেই দেখেছিলাম জামশেদপুরের দাঙ্গা। এগুলি কেমন যেন ‘ দাঙ্গা’ শব্দটির প্রয়োগের বিষয়টিকেই আমাদের কাছে কেমন যেন একটা ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসতে শুরু করেছিল।
                         ‘৪৬ এ কলকাতার দাঙ্গাকে , আমরা দাঙ্গা ই বলব । কারণ, এই দাঙ্গার পাল্টা হয়েছিল বিহার , নোয়াখালি ইত্যাদি জায়গাতে।কিন্তু ‘৭৯ সালে রামনবমীর ঝান্ডা নিয়ে শোভাযাত্রা ঘিরে জামশেদপুরের দাঙ্গা এই সঙ্কেত ই দিতে শুরু করল যে, হিন্দুর দাঙ্গায় এখন আর মুসলমান প্রতিরোধের ক্ষমতাতেও পর্যন্ত থাকতে পারছে না।জামশেদপুর দাঙ্গা মুসলমানের যে প্রান্তিকতার ছবি র ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিল, তার যেন একটা ভয়ঙ্কর পূর্ণতা আমরা দেখতে পেলাম , ঠিক তার দশ বছর পরে।’৮৯ সালের ভাগলপুর দাঙ্গাতে।
                             রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে মুসলমান নিধন ই যে এখন আগামী ভারতের ভবিষৎ- তার যেন অশনি সঙ্কেত বয়ে এনেছিল ভাগলপুর দাঙ্গা।প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার নিরিখে বলতেই হয়, ভাগলপুর দাঙ্গাতে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী , কংগ্রেসের জগন্নাথ মিশ্রের ভূমিকা এবং পরবর্তীতে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর উত্তরপ্রদেশে বিজেপির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের ভূমিকা আর গুজরাট গণহত্যার পর সেই রাজ্যে বিজেপির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকার ভিতরে এতোটুকু মৌলিক ফারাক নেই।
                                ছেচল্লিশের দাঙ্গার অভিব্যক্তিতে তারাশঙ্কর , রবীন্দ্রনাথের ;’ হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’ র দ্যোতনায় উচ্চারণ করছেন;” সে গানকে ঢেকে দিয়ে , চেপে দিয়ে, ধুচে দিয়ে( ধুচে কথাটি একটু অভিনব ই।শহুরে বাংলাতে এই শব্দের ব্যবহার আজ ও খুব একটা হয় না), মহানগরীর পথে পথে জেগে উঠল শ্মশানের কোলাহল, আকাশ থেকে শবমাংসলিপ্সু শকুনের দল নেমে এল- পাখা ঝাপটে লোভার্ত চিৎকার করে।”
                      এই অভিব্যকাতির ভিতর দিয়ে সময়ের চিত্রকল্প নির্মাণে তারাশঙ্কর লিখছেন;” আবর্জনাস্তূপে শবদেহের প্রাচুর্য কৃমিকীট ছড়াতে লাগল- সুন্দরবনের অন্ধকার স্যাঁতসেতে তলদেশের অগণ্য বিষাক্ত কীটপতঙ্খের মত।” এই দ্যোতনা আমাদের অজানা নয়।মীজানুর রহমানের ‘ কৃষ্ণ ষোলই’ থেকে আরো বহু সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান নির্ভর রিপোর্টাজে সেই সময়কালের দ্রোহণপর্ব সম্পর্কে আমরা জেনেছি।এই জানা যে শেষ হয়ে গেছে – তা কখনোই বলা যাবে না।আজ ও হয়তো সেই নারকীয়তার সবটুকু আমাদের সামনে উঠে আসে নি।ভবিষৎতে আসবে।
                     তারাশঙ্কর লিখছেন;” ফেব্রুয়ারী নভেম্বরে হিন্দু মুসলিমের মিলিত সংগ্রামোদ্যমের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলবুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার বীর্যের মধ্যে, মিলিটারী লরি পোড়ানোর উন্মত্ততার মধ্যে , সেই সম্ভাবনাকে উত্তরার খর্ভে পান্ডব বংশের ভ্রূণকে হত্যা করার জন্য অশ্বত্থামার খুপ্ত ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের মত তৃতীয় পক্ষের এটা ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ।”
                       হিন্দু মুসলমানের যৌথ আন্দোলন যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের ক্ষেত্রে সবথেকে প্রতিবন্ধক — সেটা বোঝাতে অসাধারণ চিত্রকল্প নির্মাণ করতে প্রাচীন ভারতীয় মিথলজিকে তুলে ধরছেন তারাশঙ্কর। হিন্দু- মুসলমানের যৌথ লড়াই যে মিলিটারিরাজের ও তোয়াক্কা করে না- এটা বুঝতে পেরেই যে ধূর্ত ব্রিটিশ, হিন্দু ও মুসলমান – উভয় সম্প্রদায়ের ই ধর্মান্ধ মৌলবাদী , সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উভয়ের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষায় দাঙ্গাতে মাতিয়ে দিয়েছে- এই চরম সত্যের অভিব্যক্তিতে মহাভারতের উপাখ্যানের চরম বস্তুবাদী উপস্থাপনা করেছেন তারাশঙ্কর।হিন্দু- মুসলমান , উভয়ে যদি যৌথ আন্দোলন করে ব্রিটিশ কে দেশ ছাড়া করে , তাহলে হিন্দু এবং মুসলমান – উভয় সম্প্রদায়ের ই সাম্প্রদায়িক – মৌলবাদী শিবিরের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষা পাবে না।
                বর্ণ হিন্দুর স্বার্থ রক্ষা পাবে না। ধনী- উচ্চবর্ণের আশরাফ মুসলমানদের স্বার্থ ও অক্ষুন্ন থাকবে না। রক্ষিত হবে; হিন্দু – মুসলমান নির্বিশেষে গরিব গুর্বো, কুলি – কামিন- মজদুর, কৃষক- মেহনতী জনতার স্বার্থ। এটা ব্রিটিশ এবং উভয় ধর্মের মৌলবাদীরা যে উপলব্ধিতে এনেছিল চরম ভাবে, সেটা বোঝাতেই মহাভারতের উপাখ্যানকে আশ্রয় করে দাঙ্গার পরিমন্ডলকে বুঝিয়েছেন তারাশঙ্কর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *