Skip to toolbar

লক – আনলক ঘিরে
গৌতম রায়
পথেঘাটে- হাটেবাজারে– যেখানেই যান , ক্লান্ত, অভুক্ত , জীর্ণ, শীর্ণ মানুষের যেন মিছিল বেরিয়েছে।একটু বেলা হলে ররাস্তার এখানে শেখানে চারটি শাক, একখাবলা পটল, ভিন্ডি, পেঁপে নিয়ে বেচতে বসা শীর্ণ নারীপুরুষের ক্লান্ত মুখমন্ডল বিক্রি না হওয়ার হতাশাতে ক্লিন্ন।ওইটুকু সবজি বিক্রি করলে তার ঘরে চুলো জ্বলবে।হাঁড়ি বসবে।ভাত ফুটবে।কয়েকটা ভুখা পেটে দুটো দানাপানি পড়বে।এটুকু সবজির পুরোটা এতো বেলা বয়ে যাওয়ার পরেও সে বেচতে পারে নি।এগুলো সংরক্ষণ করা, অর্থাৎ; ফ্রেজে রেখে দিয়ে কাল নিয়ে এসে বিক্রি করা , তার কাছে স্বপ্ন।এগুলোর পুরো নাম ও হয়তো সে মহাজনকে পুরোপুরি দিতে পারে নি।সারাদিনের রোদঝলসানো সবজি তো আর মহাজন ফেরত নেবে না।নিজে যদি বাড়িতে রান্না করে খায় ও , রাঁধবার উপকরণ তার কোথায়? কেরোসিন তেল আছে ঘরে? প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনায় গ্যাসের চুলোর স্বপ্ন ই তো সে কেবল দেখে গেছে।নির্খচ্চায় গ্যাস নাকি মোদি সরকার দিচ্ছেন।অথচ সেই গ্যাস নিতে গেলে ডিলারের কাছ থেকে বাজার দামের ও বেশি কড়ি ফেলে তেল মাখতে হবে।মানে, গ্যাসের উনুন কিনতে হবে।পাইপ কিনতে হবে।রেগুলেটার কিনতে হবে।কোন মোদি সরকার এই সবের খোঁজ রাখে?
                           এসব সাত পাঁচ ভেবে ক্লান্ত দুটো চোখে বাসরাস্তার ফুটপাতেই বাজারওয়ালা, বাজারওয়ালীদের চোখে ঘুম নামে।অনিন্দ্রা বলে রোগ টি বেশিরভাগ সময়েই আর সব রোগের মতো এইসব হতভাগাদের ছুঁতে পারে না।চরম দুশ্চিন্তা কোথা থেকে এই হা অন্ন মানুষগুলোর দুচোখ বেয়ে ঘুম নামিয়ে আনে।হয়তো অনেক সময় সে ঘুম মরণ ঘুম হয়।সেই মরণ ঘুমের ছবি ই লক ডাউন কালে আমরা দেখেছি পাটনা স্টেশনের সেই হতভাগা মা আর সন্তানের ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও টিতে।খিদের জ্বালায় মা মরে কাঠ।অবোধ শিশু সন্তান বুঝতেও পারছে না , মা আর নেই।ঘুরে ঘুরে জাগাতে চাইছে , চিরঘুমের দেশে থাকা মাকে।
                   এই দৃশ্য কেবল বিহারের নয়।এই দৃশ্য গোটা দেশের।পাটনা রেল স্টেশনের এই ভিডিও কারো ক্যামেরাতে ধরা পড়েছে।সে কারণেই সেই ছবি ভাইরাল হয়েছে।গোটা দুনিয়ার মানুষ জেনেছেন সেই ভয়ঙ্কর হৃদয় বিদারক ঘটনা টি।আমার শহরে, আপনার গাঁয়ে, আমাদের মফল্লাতে কতো হরবখত ই এমন ঘটনা হয়তো ঘটে চলেছে।আমরা কে খবর রাখছি , সেই নিষ্ঠুরতার? প্রশাসনের কি কোনো হেলদোল আছে? বামপন্থী রাজনীতি করেন , এমন কিছু মানুষ, তাঁদের সাধ্যমতো কিছু চেষ্টা নিরনাতর ভাবে করে চলেছেন।তার বাইরে? তার বাইরে যাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো না কোনোরকম ভাবে জড়িত আছেন , সেসব মানুষজনেরা, তাঁরা কোথায় বন্ধক রেখেছেন তাঁদের বিবেকখানা? কোথায় রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার? রাজ্য সরকার ই বা কোথায়? কেন্দ্র, রাজ্যের শাসকদের মদতে বিদেশি টাকায় ফুলে ফেঁপে ওঠা এন জি ও গুলি ই বা কোথায়?
                     কোবিদ ১৯ জনিত অতিমারী, লক ডাউন – এইসবের ভিতরেই পশ্চিমবঙ্গে এখন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের অবাধ ফাটকা কারবার চলছে।অত্যন্ত গরিব মানুষেরা বাজার সেভাবে না বসার জন্যে , সামানায কিছু আনাজপত্র ধারদেনা করে এনে রাস্তার ধারে, পাড়ার মোড়ে বসছেন।লকডাউনের ফলে এতো ব্যাপক আকারে ছাঁটাই চলছে, যার জেরে অত্যন্ত দ্রুত হারে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিণত হচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্তে।সেই কারণে, এইসব পথচলতি বাজার গুলিতেও প্রায় ক্রেতা নেই বললেই চলে।ক্ষুধা একটা ভয়াবহ জায়গা নিয়ে আমাদের সমাজজীবনকে গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে।অথচ কি রাজ্য, কি কেন্দ্র, কি প্রধানমন্ত্রী , কি মুখ্যমন্ত্রী- কারো কোনো হেলদোল নেই।
                               চাল- ডাল- তেল – নুনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্র নিয়ে চলছে অবাধ কালোবাজারি।পাঁচ টাকার জিনিষ , বিকোচ্ছে পঁচিশ টাকায়।যাঁদের জমানো প্রচুর টাকা আছে, তাঁরাই একমাত্র পারছেন সেইসব জিনিষপত্র কিনতে।বাকি মানুষেরা কোনো রকমে দিনগুজরান করছে।তেতাল্লিশের মন্বন্তরের কালে যেভাবে খিদের জ্বালায় কচু থেকে শুরু করে অখাদ্য – কুখাদ্য মানুষ খেতে বাধ্য হয়েছিল, পেটের জ্বালা মেটাতে, বাংলার গ্রামেগঞ্জে কাজ হারিয়ে, চাষ হারিয়ে, উৎপন্ন ফসলের দাম না পেয়ে, মহাছনের দেনা এইসবের ভিতরেই চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ সহ শোধের ভয়াবহ অবস্থাতে , মানুষকে ক্রমশঃ অখাদ্য- কুখাদ্য ই খেতে হচ্ছে।এই অবস্থায় সবথেকে বেশি অপুষ্টিতে ভুগছেন মহিলারা।বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির মহিলারা যেখানে যেটুকু জোগার করতে পারছেন খাবার দাবার, তা খাওয়াচ্ছেন বাড়ির মানুষদের।নারীর স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যে তাঁরা আধপেটা খেয়ে, সামান্য চিঁড়ে – মুড়ি খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।ফলে সাধারণ মানুষদের ভিতরেও নারীরা একটা ভয়াবহ অবস্থার ভিতরে ক্রমশ চলে যাচ্ছেন এই ক্রান্তিকালে।অথচ প্রশাসন নীরব।নারী স্বাস্থ্যের এই দিকটি ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলির ও আলাদা করে কোনো বিশেষ রকমের সজাগ দৃষ্টি প্রায় নেই ই বলা যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *