Skip to toolbar

লক ডাউন- মেট্রোপলিটান মন আর বামপন্থীরা
গৌতম রায়
                       একটা  সামাজিক অবসন্নতার উৎকর্ষ ভূমি হিশেবে আমার স্বদেশকে প্রতিপন্ন করবার ধারাবাহিক তাগিদের প্রয়োগ ,করোনা জনিত ক্রান্তিকাল কে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করে উঠে এসেছে।এই উঠে আসা টা ,  এটা কি একদিনে সম্ভব হয়েছে? একজন শৌখিন মজদুর যদি মনে করেন, ভেক ধরে তিনি চাষী হবেন, তাহলে তাঁকে হয় পৈতৃক চাষাবাদের জমির উপর ভরসা করতে হয়।নতুবা গাঁটের কড়ি খরচা করে চাষের জন্যে জমি কিনতে হয়।
                         ভারতবর্ষকে প্রতিক্রিয়াশীলতার নোতুন চাষিবাদের পৈতৃক আবাদভূমি হিশেবে ধরা হয়েছিল সংসদীয় রাজনীতিতে বামপন্থীরা কোনঠাসা হওয়ার সময় থেকেই।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক স্তরে তৈরি হয়েছিল, সেখানে ঠান্ডা লড়াই টা হয়ে উঠেছিল কুটনীতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ।কুটনীতির এই প্রয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সেদিন একধরণের আচরণ করেছে।মার্কিনীদের সেই ষড়যন্ত্র ভেস্তে দিতে আবার সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন ও সেদিন হাত পা গুটিয়ে বসে থাকে নি।তাই সেদিনের পরিস্থিতিতে সামাজিক প্রগতির ধারা বজায় রাখতে কেবলমাত্র সংসদীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের উপস্থিতিকে একমাত্র মাপকাঠি বলে ধরা হয় নি।সামাজিক ক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে , রাজনীতি ব্যাতিরেকে বামপন্থীরা কি ভূমিকা পালন করলেন– সেদিকে লক্ষ্য লেখে সমাজপ্রগতির ধারা উপধারার বিচার বিশ্লেষণ সেদিন হয়েছিল।
                          আজ যে নয়ের দশক থেকে ক্রমবর্ধমান মার্কিন সাম্রজ্যবাদের পরিবর্তিত রূপ ‘ নয়া উদার অর্থনীতি’ র তান্ডব আমরা দেখছি, যার জেরে গত প্রায় দশ বছর ধরে সংসদীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের কোনঠাসা হওয়ার নিরিখে, সোভিয়েট ইউনিয়ন বা পূর্ব ইঊরোপের মতো বাংলায় তথা ভারতে বামপন্থা এবং বামপন্থীরা শেষ হয়ে গেছে বলে শীবারব উঠেছে তার ভিত্তিভূমি কিন্তু আন্তর্জাতিক দুনিয়া তেই তৈরি হয়েছিল স্টালিনের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের রাজনীতির গহীনে।এই সময়েই গোটা বিশ্বের মতোই ভারতে এবং বাংলাতেও মার্কস পড়া একদল বুদ্ধিজীবী সমাজে খুব প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেন , যাঁদের একমাত্র কাজ ছিল বামপন্থাকে অন্তর্ঘাতের ভিতর দিয়ে শেষ করা। দুঃখের হলেও এ কথা বলতেই হয় যে, বাংলাতে এই কাজ গুলি করবার ক্ষেত্রে মানবতার মুখোশ পরে, গণতন্ত্রের কথা বলে, সংখ্যালঘু মুসলমানেদের ‘ উপকারী’ হিশেবে আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাবে নিজেকে তুলে ধরছেন, সেই ভাবে নিজেদের তুলে ধরে , বামপন্থার বিরোধী একটা সমান্তরাল , দেখতে প্রগতিশীল, কাজে আপাদমস্তক প্রতিক্রিয়াশীল, ধর্মের রাজনৈতিক কারবারি, গণতন্ত্রের কথা বলে বামপন্থাকে খতম করতে আত্মনিবেদিত কিছু মানুষ আসরে অবতীর্ণ হয়েছিল।উন্নত মেধাকে তাঁরা পরিপূর্ণ ভাবে ব্যবহার করেছিলেন ভারত থেকে বামপন্থাকে আপাদমস্তক খতম করে এ দেশকে প্রতিক্রিয়াশীলদের বাসযোগ্য করে তুলতে।এই কাজে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন গান্ধীবাদী বিনোবা ভাবে থেকে বামপন্থী বলে শিরফোলানো সমর সেন, অম্নান দত্ত, গৌরকিশোর ঘোষ, শিবনারায়ণ রায়েরা।
অম্লান দত্ত সি আই এ র টাকাতে ‘ কোয়েস্ট’ চালাতেন বামপন্থীদের এই অভিযোগকে তথ্য সহ স্বীকৃতি দিয়ে গিয়েছেন সুরজিৎ দাশগুপ্ত( বইয়ের দেশ, জুলাই- সেপ্টেম্বর,’১৯)[ পৃষ্ঠা-১৩৩]।
                               এই পটভূমিকা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তির সওদাগরেরা করলেও, তাকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য তারা করে উঠতে পারেননি দীর্ঘদিন বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকবার  ফলে,বামপন্থীরা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সক্রিয় থাকার  ফলে । প্রতিক্রিয়াশীলদের  সেই কর্ষিত  ভূমি এবং কল্পিত আবাসের ইমারতটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছে ২০১১  সালে বামপন্থীরা রাজ্য ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়াতে।
                    যে পটভূমিকার কথা বলা হচ্ছে , সেটি  কিন্তু অত্যন্ত প্রবল হয়ে উঠেছিল গত ২০০৭ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামপন্থীরা পরাজিত হওয়া, তারপরে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামপন্থীরা পরাজিত হওয়ার প্রক্ষিতে।এই  ক্ষেত্রে একটা খুব বিশেষ রকমের ভূমিকা ছিল প্রচার মাধ্যমের। সংবাদপত্র জগতের ।বিশেষ করে বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের।প্রচারমাধ্যমের নিরন্তর প্রচার  ছিল যে;  আসন্ন ২০১১ সালের  বিধানসভা নির্বাচনে বামপন্থীরা আর ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না।
                    এই প্রচারকে একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার জন্য একদল পরিবর্তনপন্থী মানুষ ,যাঁরা সেদিনের সেই সমর সেন, গৌরকিশোর ঘোষের উত্তরসূরী ,তাঁরা আসরে  অবতীর্ণ হয়েছিলেন ।তারপরে কি ইতিহাস, তারপরের কি ঘটনাক্রম, সেগুলি পাঠকদের জানাতে,আর  সেগুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না করাই ভালো।
                     এই অবস্থা কালের ভেতর বামপন্থীরা রাজনৈতিকভাবে কমজোরি হয়েছে বলে প্রচার , সেই প্রচারের একমাত্র ভিত্তি হচ্ছে ভোট রাজনীতি । সেই ভোট রাজনীতির নিরিখে ই বামপন্থীদের সমস্ত শক্তিকে নিরূপণ করার চেষ্টা হয়েছে খুব জোরদারভাবে ।এই চেষ্টা  করেছে সেই প্রচারমাধ্যম ,যারা উদার অর্থনীতির একেবারে নিবেদিতপ্রাণ সৈনিক ।
                     সেই জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে প্রচারের মাধ্যমের দ্বারা বিষয় টিকে  এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, প্রতিক্রিয়াশীলতার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ, বিশেষ করে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু মৌলবাদ একটা ভয়ঙ্কর উপায়ে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের রাজনীতির পরিমণ্ডল কে  পরিব্যাপ্ত  করতে শুরু করেছে।এভাবে পরিব্যাপ্তি ঘটাতে ঘটাতে  রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তারা উপস্থাপিত  করতে পেরেছে নিজেদের ।
                    এই যে গোটা  পর্যাক্রম, তার  ভিতরে বামপন্থীদের নিঃশেষিত দেখাবার তাগিদ থেকে এমন একটা সামাজিক শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে খুব সহজেই সাম্প্রদায়িক ,প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ঢুকে পড়তে পেরেছে ।তারা যে শুধু বাংলার রাজনৈতিক ,সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র গুলিকেই বিঘ্নিত করছে তা নয় ।তারা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিমণ্ডল কে একটা ভয়ঙ্কর রকম প্রতিক্রিয়াশীলতার মধ্যে, সাম্প্রদায়িক হানাহানি , বিদ্বেষ ,ভয়ঙ্কর রকমের সামাজিক দূরত্বের ভিতরে পৌঁছে দিয়েছে।
              এইসব গুলির ভেতর দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে তাদের উদার অর্থনীতির নামে ,তাদের বাজার অর্থনীতির নামে, সাম্রাজ্য বিস্তারের সমস্ত রকমের ক্ষেত্রগুলোকে একদম পূর্ণতা দান করতে ,মন প্রাণ নিবেদিত করে ফেলেছে। এইরকম একটি পটভূমিকার মধ্যে দাঁড়িয়ে কোবিদ ১৯ , অতিমারির কালে, বিজ্ঞানসম্মত, শারীরিক দূরত্বের বিষয়টাকে তুলে ধরা হয়েছে ,সামাজিক দূরত্ব হিসেবে ।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একদিক থেকে গলাবাজি করেছেন সামাজিক দূরত্ব এবং তারপরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও  সামাজিক দূরত্বের  বিষয়টিকেই বলেছেন। একটিবারের জন্য তিনি ‘শারীরিক দূরত্ব ‘ শব্দটি কে ব্যবহার আজ পর্যন্ত করেনি ।
                  এই পরিস্থিতির ভেতরে যখন অপরিকল্পিত লকডাউন দেশের প্রান্তিক মানুষদের একটা ভয়াবহ জায়গায় এনে দাঁড় করালো ,বিশেষ করে ,পরিযায়ী শ্রমিক, অর্থনৈতিকভাবে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ, এঁদের বেঁচে থাকার অধিকারটিকে ই  পর্যন্ত কেড়ে নিতে উদগ্রীব হয়ে পড়ল রাষ্ট্রযন্ত্র, তখন নীরব, নিভৃত কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে বামপন্থীরা সমাজের বুকে এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।এই দৃষ্টান্ত হল এই  যে ,ধর্ম নয় ।জাতপাত নয় ।শ্রেণি অবস্থানই হচ্ছে মানুষকে, যেকোনো ধরনের সামাজিক ,আর্থিক, রাজনৈতিক ,সাংস্কৃতিক ,অতিমারির হাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম ।
                          এই দৃষ্টান্ত স্থাপন তো বামপন্থীরা কেবলমাত্র লকডাউনের  কালে ,অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া, মানুষদের হাতে খাদ্য সামগ্রীর কিছু কাঁচা উপকরণ, ওষুধপত্র, বা পড়াশুনোর জন্যে খাতা- পেন পেন্সিল , কিংবা আরো বিস্তারিতভাবে ,রান্না করা খাবার ,নিয়মিত পরিবেশন করার ভেতর দিয়েই শুধু করতে সক্ষম হননি ।একটা ধারাবাহিক প্রবণতা যদি বামপন্থীদের মধ্যে  একটা ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের দ্বারা দীর্ঘকাল অনুশীলনে না থাকত, তা হলে কি এটা তাঁরা পারতেন?
                  যদি এই ধারাবাহিক ভাবে মানুষের কাছে থাকবার অভ্যাস , তাঁরা দীর্ঘ সময়-  কাল  ক্ষমতার অলিন্দ থেকে সরে যাওয়ার পরও পালন করে  না যেতেন তাহলে কি তাঁদের পক্ষে করা সম্ভব হতো ?নিরন্তর ভাবে  প্রায় ১০০  দিন ধরে  এই রাজ্যে র বিভিন্ন জায়গাতে বামপন্থী ছাত্র যুবরা কমিউনিটি কিচেন পরিচালনা করে চলেছেন।  এই কর্মকাণ্ড পরিচালনার যে প্রেক্ষাপট, সেটি যদি দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক না  কর্মকাণ্ডের, সামাজিক মেলামেশার ভিতর দিয়ে , মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ,মাটির সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হতো , তাহলে কি ,হঠাৎ করে ,এলাম, দেখলাম, জয় করলাম, এই রকম স্টাইলে কিছু করা সম্ভব হতো ?
                       ভোট রাজনীতির নিরিখে যে বামপন্থীদের ৭ % ভোটের হিসেব ধরে সমস্ত ধরনের প্রচার মাধ্যম ,কি বৈদ্যুতিন, কি সংবাদপত্র ,এটাই প্রচার করে করে চলে যে ;বামপন্থীরা ভারতীয় রাজনীতিতে, বিশ্ব রাজনীতির মতই ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছেন,  সেই বামপন্থীরা কিভাবে,  কি শহর,  কি গ্রাম,  কি মফস্বলের  পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়, কোথায় কোন অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক মানুষ  পড়ে আছেন,  লকডাউনের কারণে তাঁরা কর্মচ্যুত হয়েছেন, মধ্যবিত্তের মত যাঁদের কাছে অর্থ বা কাঁচা আনাজপত্র থেকে শুরু করে, চাল- ডাল -তেল- নুনের  কোন মজুদ রাখার মত কোন অবস্থা ই নেই, সেই মানুষগুলো কি খাবেন — এই চিন্তা এবং সীমিত সময়ে সেটির সমাধানের চেষ্টা তো বামপন্থীরা পি সি সরকারের জাদুলাঠি দিয়ে করছেন না।বাসতবের মাটিতে দাঁড়িয়েই তো সেই নিরন্তর চেষ্টা বামপন্থীরা করে চলেছেন।
                        এই চেষ্টাকে ,সেই চিন্তায়, সেই ভাবনায় ,সেই মননে,প্রান্তিক মানুষদের দেখে ,  তাঁদেরকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে , রকম জাতপাত , ধর্মের বিভেদ না রেখে, সেই মানুষদের প্রতিনিয়ত রান্না করা খাবার পরিবেশন করা– এটা কিন্তু সেই বামপন্থীরা ই করছেন, যাঁদেরকে সংবাদমাধ্যম নিরন্তরভাবে বলে আসছেন,’ অপ্রাসঙ্গিক ‘ ,ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁরা ‘অপ্রাসঙ্গিক’।যেহেতু লোকসভাতে আসনের নিরিখে টিমটিম করছেন বামপন্থীরা।এই রাজ্য থেকে লোকসভাতে বামপন্থীদের একজন ও সদস্য নেই।
                    সেই অপ্রাসঙ্গিক মানুষেরা তাঁদের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রমাণ করেছেন ,সংসদীয় রাজনীতিতে কটি আসন ,লোকসভা- বিধানসভা তে বামপন্থীরা দিতে পেরেছেন, কিংবা কোন রাজ্যে তাঁরা ক্ষমতায় আছেন, এটা বিচার্য নয় ।বামপন্থার আদর্শগত প্রচারের ক্ষেত্রে,  আদর্শগত ভিত্তি প্রসারিত করার ক্ষেত্রে এম পি , এম এল এ , মন্ত্রী , মুখ্যমন্ত্রী ই সব নয়।সব।হল, মানুষ।
                    অপরিকল্পিত লকডাউনের  ভিতর দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে প্রান্তিক মানুষদের ভয়াবহসমস্যা করে ।তাকে মোকাবিলা করবার লক্ষ্যে ,বাংলার বামপন্থী মানুষজনেরা,  বিশেষ করে, ছাত্র-যুব রা যেরকম  পরিকল্পিতভাবে ,এই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা সর্বঅর্থে একটি দৃষ্টান্ত ।
                বামপন্থীদের অপ্রাসঙ্গিক বলে  তুলে ধরবার চেষ্টা হয় প্রচার মাধ্যমে। রাজনীতির অঙ্গনে ।সেই বামপন্থী দলগুলোর ই ছাত্র- যুব রা ,  প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ,অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের  দেখে ,তাঁদের একটি তালিকা তৈরি করে ।সেই তালিকা অনুযায়ী কোন্ মানুষটি, কতটা বেশি রকমের অর্থনৈতিক কষ্টে রয়েছেন, তার নিরিখে ,নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী চাল- ডাল- তেল -নুন -আনাজ -ওষুধপত্র  পৌঁছে দিতে শুরু করেন প্রথম পর্যায়ে।
                   লকডাউনে ভিতর  এই পর্যায়ক্রম চালাতে চালাতে একটা বড় অংশের বামপন্থী ছাত্র যুবৃর  মনে হতে থাকে যে ,রান্নার কাঁচা উপকরণ তাঁরা ওই প্রান্তিক মানুষদের পৌঁছে দিলেও, সেই উপকরণ গুলি কে প্রক্রিয়াজাত করে, রেঁধে বেড়ে খাওয়ার মতন যে পরিকাঠামো দরকার ,সেটি ও সেইসব প্রান্তিক মানুষদেরষ মধ্যে নেই ।অর্থাৎ;  আজো বাংলার একাধিক শহরে,গ্রামগুলি তেস তো বটেই , এমন অবস্থা রয়েছে, যেখানে সামাজিকভাবে ,অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষেরা ,কাঠ কুটো বা কেরোসিন তেল কোন রকম ভাবে জোগাড় করে ,দুটো চাল, ডাল ফুটিয়ে নেন।
                    লকডাউন জনিত অচলাবস্থার দরুণ সেই কাঠপাতা বা কেরোসিন  জোগাড় করার মতো পরিস্থিতি ও প্রান্তিক সেই সব মানুষদের অনেকের ই  ভিতর নেই ।শহরের বস্তি এলাকা গুলিতেও জ্বালানি জোগার একটি বড় সমস্যা ওই প্রান্তিক মানুষদের।সুতরাং  কাঁচা আনাজ, বা চাল-ডাল ,সেগুলো রান্না করে যে তারা খাবেন,  এমন পরিস্থিতি ও তাঁদের নেই।
                 এইরকম একটি জায়গা তে  করোনা ভাইরাসের  ভয়াবহ আতঙ্কের ভেতরে ও কমিউনিটি কিচেনের মত একটি সমাজ সংবৃদ্ধ ধারণার ,বাস্তব প্রয়োগ বামপন্থীরা  ঘটিয়ে চলেছেন।প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ,প্রতিদিন তাঁরা কুপন বিলি করে আসছেন ।এমন নয় যে ,৭  দিনের কুপন,  তাঁরা একদিনে  গিয়ে দিয়ে আসছেন।অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রত্যেকটি বাড়ির অবস্থা নিজেরা সরেজমিনে , সার্বিক পর্যালোচনা করে ,প্রতিটি দিন, প্রতিটি মানুষের  খাবারের  প্রয়োজনের যে নিত্যনৈমিত্তকতা,  সেই অনুযায়ীই তাঁরা  কুপন দিয়ে আসছেন।
                    এই ভাবে কার্যত জীবনকে হাতে নিয়ে ,মানুষের সাথে একটা নিরন্তর সংযোগের ভেতর দিয়ে, তাঁদেরকে সমবেত করা হচ্ছে কমিউনিটি কিচেনে। সেখানে  তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে রান্না করা সাধারণ আটপৌরে খাবার।  আড়ম্বর করবার মতো আর্থিক অবস্থা তো নেই কারো ।এই ধরনের কমিউনিটি কিচেন চালাতে চালাতেই বামপন্থীদের এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে যে ,কেবলমাত্র একটি লালসালু নিয়ে যখন তাঁরা মানুষের দরবারে গিয়ে হাজির হয়েছেন ,গত ১০-১৫ বছরে,  প্রচার মাধ্যম এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ধারাবাহিক কুৎসায়, বামপন্থী দের থেকে কার্যত মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া মধ্যবিত্ত মানুষটি পর্যন্ত দলা করে পাঁচশ টাকা , দু  হাজার টাকার নোট ছুঁড়ে দিচ্ছেন ।
                      এই কাজ বামপন্থীরা করছেন ,সেই কাজের কিন্তু কোনোরকম প্রচার কার্যত পেশাদার প্রচারমাধ্যমে নেই। টেলিভিশনের নেই ।কোন ধরনের বাজার চলতি খবরের কাগজে নেই ।যেটুকু সামাজিক প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে বামপন্থীরা প্রচার করতে পারছেন , সেটুকু নির্ভর করেই ,সাধারণ মানুষের দানে, যেভাবে উপচে পড়ছে এই জনতার ভান্ডার, তা থেকে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে; ভোট রাজনীতি টাই বুর্জোয়া রাজনীতির লোকেদের কাছে ধ্যান-জ্ঞান হতে পারে , সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়েই তাঁরা বিচার বিশ্লেষণ করে দেখতে পারেন সমস্ত কিছু ভালোমন্দ কে ।কিন্তু মানুষের দুর্দশা ,মানুষের যন্ত্রণা ,মানুষের পেটের খিদে –এটাই কিন্তু বামপন্থীদের কাছে একমাত্র উপজীব্য বিষয়।
                 কোনরকম ভোট রাজনীতিকে লক্ষ্য রেখে ,সমাজ বদলের স্বপ্ন যে বামপন্থার সঙ্গে খাপ খায় না ,করোনা  ভাইরাসজনিত লকডাউন এবং আমফান , ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ , তাকে কেন্দ্র করে জনতার হেঁশেলের ভেতর দিয়ে, শ্রমজীবী ক্যান্টিনের ভেতর দিয়ে, কি শহরে ,কি মফস্বলে ,কি গ্রামে -নগরে- প্রান্তে –বামপন্থীরা সেটা জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছেন।কোন টা ভোট রাজনীতি সেটা মানুষ দেখছেন শাসক বিজেপি- তৃণমূলের কুস্তি আর দোস্তিতে।আর কোনটা বামপন্থা সেটাও মানুষ দেখেন, রাস্তাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *