সোমেন মিত্র: শেষ প্রণাম
গৌতম রায়
যে কোনো মৃত্যুই তৈরি করে একটা বড়ো বিচ্ছেদ বেদনা।পরিচিত হলে সেই বেদনা এক ধরণের স্পর্শ দেয়, ব্যক্তি পরিচয় নেই, অথচ সমষ্টিগত ভাবে তিনি অনেক চেনা, অনেক জানা– এমন অনুভূতি আমাদের একটা শোকের নিস্তব্ধ পাথারে নিক্ষেপ করে।অনুভূতির দানাদার স্পর্শ যেন আমাদের বাক্যহারা করে দেয়।আমরা হারিয়ে ফেলে সীমা আর অসীমের লক্ষণরেখাকে।সদ্যপ্রয়াত সোমেন মিত্রের গত কয়েকদিনের শারীরিক অবস্থা যা দাঁড়িয়েছিল , সেটা আর যেন যেন চোখে দেখা যাচ্ছিল না।
                     সোমেন মিত্রের মতো অমন এক বর্ণময় রাজনীতিক এবং মানুষের এই শারীরিক  যন্ত্রণা আমাদের কাছে ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছিল।আমরা তাঁর যন্ত্রণার শরিক হয়েও সেই ব্যথার উপশমে চোখের জলের বাঁধ মেনে বার বার যেন উচ্চারণ করছিলাম, হায় এ কি এ সমাপন।রবীন্দ্রবাণীর মূর্ছনায় এক বর্ণময় জীবনের আলো নিভে যাওয়ার প্রহর গোনাতে এক তীব্র যন্ত্রণাময় এক প্রহর গোনা।    
                গতকাল মধ্যরাতে তাঁর সমস্ত যন্ত্রণার অবসান হয়েছে।সোমেন বাবুর মৃত্যু রাজনীতির সেই যুগের ধারাবাহিকতার একটি অবসান, যে যুগে রাজনীতির সঙ্গে ‘ মূল্যবোধ’ নামক শব্দটি অনেক বেশি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত ছিল।সোমেনবাবুর চলে যাওয়া এই মূল্যবোধহীন রাজনীতির দাপটের যুগে তাই অনেক বেশি বেদনাদায়ক একটি ঘটনা।
           সোমেনবাবু বর্ণময় রাজনীতির শুরু বিধান রায়- প্রফুল্ল সেন জামানার অবসানের পর।কংগ্রেস যখন এই রাজ্যে শাসনক্ষমতায় সুষ্ঠুভাবে ছিল, সেই সময়কালটিতে সোমেন একদম আমহার্স্ট স্ট্রিটের পরিমন্ডলের বাইরে খুব নিজেকে খুব একটা বের করেন নি।যুক্তফ্রন্টের আমলে , অজয় মুখার্জীর মুখ্যমন্ত্রীত্বকালে জনসমর্থনের পাল্লাটা কংগ্রেসের দিকে যখন ক্রমশঃ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে, সেই সময়কালেই একদম পাড়ার রাজনীতির প্রাঙ্গন অতিক্রম করে কলকাতার রাজনীতির সঙ্গে সোমেন নিজেকে যুক্ত করতে থাকেন।যুক্তফ্রন্টকে ভাঙার যে ষড়যন্ত্র প্রফুল্ল সেনেরা অজয় মুখার্জীকে ঘিরে সেই সময়ে শুরু করেছিলেন, সেই বিষয়গুলিকে সফল করে তুলতে সোমেন এবং তাঁর সেই সময়ের সতীর্থেরা, যেমন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, কুমুদ ভট্টাচার্য , প্রমুখেরা ছিলেন বিশেষ রকমের সহায়ক।
                         সংসদীয় রাজনীতিতে সোমেন মিত্রের প্রবেশ ১৯৭২ সালের মহাবিতর্কিত নির্বাচনের ভিতর দিয়ে।এই সময়কালের সোমেন মিত্র কে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই।শত বিতর্কের ভিতরেও একটা কথা বলতে হয় যে, নিজের অত্যাচার, রাষ্ট্র যন্ত্রের অপব্যবহারের ভিতর দিয়ে সম্পূর্ণ ভাবে নাগরিক অধিকার হরণ, এইসব মানবতাবিরোধী অপরাধগুলিকে গোপন করতে সোমেন মিত্রদের কর্মপদ্ধতিকে দায়ী করেছিলেন তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়।সেই সময়ে নিজের দলে , নিজের অবাধ্য লোকেদের নানাভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্করের ব্যাপক খ্যাতি ছিল।এইরকম একটি পরিস্থিতি খোদ সিদ্ধার্থশঙ্করের বাসভবনে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী যখন সোমেন মিত্রকে সমাজবিরোধী আখ্যা দিয়েছিলেন, সিদ্ধার্থশঙ্করের মুখের উপর জবাবে সোমেন বলেছিলেন; যদি আজ আমি সমাজবিরোধী ই হয়ে থাকি, এভাবেই যদি আপনি আমাকে চিহ্নিত করেন, জোর গলায় বলব, আপনি  মানুদা , আমাকে সমাজবিরোধী হিশেবে তৈরি হতে বাধ্য করেছেন।’ সিদ্ধার্থশঙ্কর সিদ্ধি ও নির্বাণ'( আনন্দ) নামক পুস্তকে সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত সেদিনের মুখ্যমন্ত্রীর মুখের উপর সোমেন মিত্রের এই দৃঢ় জবাবের কথা বলেছিলেন।
                       সুব্রত, প্রিয় — এঁরা সিদ্ধার্থশঙ্করের যাবতীয় অপকর্মের প্রকাশ্য সমর্থক এবং অন্তরালে সমালোচনার নাটক করেছেন।চরম ক্ষমতালোভী সুব্রত একটি বার ও সিদ্ধার্থশঙ্করের মুখের উপর একটি কথা বলার সাহস করেন নি, অথচ আড়ালে নিন্দার ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন।এক ই কথা প্রিয় সম্পর্কেও প্রযোজ্য।প্রিয়, ইন্দিরা গান্ধী পরাজিত হওয়ার পর তাঁর এবং সঞ্জয় গান্ধী সম্পর্কে অত্যন্ত নিম্নরুচির ব্যক্তিগত সমালোচনা করেছেন।কিন্তু সেভাবে রাজনৈতিক উচ্চাভিশাষ না দেখানো সোমেন মিত্রকে কিন্তু কখনো দলীয় সতীর্থ বা বিরোধী কোনো নেতা , নেত্রী সম্পর্কে অরাজনৈতিক ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে শোনা যায় নি।
                             ‘৮২ সাল থেকে শিয়ালদহ বিধানসভা কেন্দ্রে সোমেন মিত্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে সি পি আই দলের বিভিন্ন প্রার্থীর সঙ্গে।তাঁদের ভিতরে ছিলেন একদা আগুনমুখী ছাত্র নেতা বিশ্বনাথ মুখার্জী, তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তী ইলা মিত্র, নন্দগোপাল ভট্টাচার্য, চঞ্চল ঘোষ এবং কি তাঁর কন্যা মৌসুমী ঘোষের সঙ্গেও।সোমেন তাঁর প্রচারের কাজ চালিয়েছিলেন একদম নিজের স্টাইলে।’৭২ এর নির্বাচনে , সি পি আই তখন কংগ্রেসের সঙ্গে আছে, মানিকতলাতে তাঁদের দলের প্রার্থী ইলা মিত্রের ভোট প্রচারে , সি পি আই ( এম) প্রার্থী অনিলা দেবীকে কুৎসিত ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছিল।সোমেন মিত্র কিন্তু তাঁর দীর্ঘ ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতির জীবনে একটি বারের জন্যে ও , ‘ প্রমোদ দাশগুপ্তের কোলে , অনিলা দেবী দোলে’ জাতীয় একটি নিম্নরুচির প্রচার করেন নি।প্রচারকালে বিশ্বনাথ মুখার্জীর মুখোমুখি হতেই তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে যথোচিত সম্মান দেখিয়েছিলেন সোমেন মিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *