জয়কৃষ্ণের সাহেবের কাছে ফিরে যাওয়া

জয়কৃষ্ণের ” সাহেবের “কাছে ফিরে যাওয়া
গৌতম রায়

জ্যোতিবাবু তখন অবসর জীবন যাপন করছেন।বয়স হয়েছে এটা বুঝেও যেন মানতে পারেন না।জ্যোতিবাবু সুলভ স্মার্টনেস তখন ও অটুট।রাতে ঘরে কাউকে থাকতে দেন না,অথচ বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনে উঠতে হলে কাউকে ডেকে অন্যের অসুবিধা করবার মতো মানুষ ও তিনি নন।ঘুম চোখে পায়ে লুঙ্গি জড়িয়ে বার দুয়েক পরেও গিয়েছেন।শেষবার পরে তো আঘাতটা একটু বেশিই লাগলো।বাড়িতে পোর্টেবেল এক্সরে মেশিন আনিয়ে এক্সরেও করতে হলো।তাই রাতে তাঁর ঘরে লোক থাকা দরকার।
বয়সের কড়াল থাবায় জ্যোতিবাবুর তত্ত্বাবধানের জন্যে তাঁর শয়ন কক্ষে রাতে সেবক থাকা দরকার।প্রশ্ন হলো জ্যোতিবাবুকে রাজি করাবে কে?কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে?কেন জয়কৃষ্ণ ঘোষ।রাজনীতিক জ্যোতিবাবুকে নয়,ব্যক্তি জ্যোতিবাবুর স্বাস্থ্যের কারনে যদি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে চিকিৎসার স্বার্থে কিছু করবার দরকার হতো একমাত্র যে মানুষটি সেই অসাধ্য সাধন করতে পারতেন তিনি হলেন জয়দা।যেন বয়সস্থ পিতা একটু অবাধ্য হয়ে পড়েছেন,পুত্র স্নেহের শাসনে বাঁধছেন তাঁকে।শেষের প্রহরেও পাঁজা কোলা করে নিয়ে কমোডে বসিয়ে দিচ্ছেন। আবার তেমন ই ভাবে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছেন– জ্যোতিবাবুর ক্ষেত্রে এটা একমাত্র জয়কৃষ্ণ ঘোষের পক্ষেই সম্ভব।
আপাদমস্তক বামপন্থী পরিবারের মানুষ জয়কৃষ্ণের সঙ্গে কিন্তু ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের আগে জ্যোতিবাবুর তেমন কোনো ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল না।প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর জ্যোতিবাবু তাঁর রাজনৈতিক সচিব শঙ্কর গুপ্ত কে জানালেন তাঁর আপ্ত সহায়কের প্রয়োজনীয়তার কথা।সেই শঙ্কর গুপ্ত ,যিনি ভারত -চিন সীমান্ত সংঘর্ষের সময়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনারেল কারিয়াপ্পার স্লেষের জবাবে উঠে দাঁড়িয়ে দীপ্ত কন্ঠে বলেছিলেন;হ্যাঁ ,আমি একজন কমিউনিষ্ট।সেই শঙ্কর গুপ্ত জ্যোতিবাবুর সামনে সম্ভাব্য আপ্ত সহায়ক হিশেবে উপস্থিত করলেন আন্দামান সেলুলার জেল ফেরত বিপ্লবী মন্ত্রী গদাবাবু,সকলের অমৃতেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক জয়দা কে।
বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার কয়েকদিন পর থেকে জ্যোতিবাবুর আপ্ত সহায়কের দায়িত্ব নিলেন জয়কৃষ্ণ।জ্যোতি বসুর মাপের জাতীয় নেতার আপ্ত সহায়ক হিশেবে এতো দীর্ঘ সময় ব্যাপী কারো একটানা আপ্ত সহায়কের দায়িত্ব পালনের ইতিহাস বাংলা বা জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসে তো নেই ই ,আন্তর্জাতিক ইতিহাসে আছে কি না সন্দেহ। এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছিল জয়দার গভীর রাজনৈতিক মননশীলতা এবং দলের প্রতি সীমাহীন আনুগত্য থেকেই।এই সংবেদনশীলতাই জয়দাকে করে তুলেছিল জ্যোতি বাবুর প্রতি আত্ম নিবেদিত।
দল ক্ষমতায় আসার আগে বিপক্ষ রাজনীতিকদের দ্বারা নানা ভাবে অত্যাচারিত হয়েছিলেন জয়দা ও তাঁর পরিবার।তখন জয়দারা থাকতেন দমদম সংলগ্ন এলাকায়। একবার ভোটের সময় তৎকালীন শাসক দলের অতি উৎসাহীদের তান্ডবে জয়দার প্রাণ সংশয় হয়েছিল।প্রখর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সেদিন তিনি পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন।সেই জয়দা কিন্তু জ্যোতিবাবুর আপ্ত সহায়ক হিশেবে এক মুহূর্তের জন্যে পরবর্তী কালে ওই রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের প্রতি বিদ্বেষ মূলক মানসিকতার পরিচয় দেন নি,অথচ আপোষ ও করেন নি।প্রকৃত অর্থে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ইতিহাস পুরুষ রা যে ইতিহাসের কালের যাত্রায় বড়ো কুশীলব তা জ্যোতিবাবুর জীবন থেকে আমরা দেখেছি।যেমন দেখেছিলাম গান্ধী,নেহরু,বিধান রায় ,প্রফুল্লচন্দ্র সেন দের ভিতরে।
গান্ধীর ছিলেন নির্মল কুমার বসু,প্যারেলাল।বিধানচন্দ্রের ছিলেন সুধীর মাধব বসু।প্রফুল্ল সেনের ছানা বাবু,অখিলেশ ভট্টাচার্য।তেমন ই জয়দা ছিলেন জ্যোতিবাবুর।প্রশাসক বিধানচন্দ্রের সাফল্যের অন্যতম প্রধান আথচ নীরব নির্মাতা ছিলেন সুধীর মাধব বসু।এস এম বোস নামেই যাঁর বেশি পরিচিতি ছিল।তিনি রাজনৈতিক পরিমন্ডলের মানুষ ছিলেন না।ছিলেন আমলা,কিন্তু বুঝতেন বিধানবাবুকে।প্রফুল্লচন্দ্র সেনের পরেই সব বিষয়ে ডাঃ রায় নির্ভর করতেন এস এম বোস কে।সেই নির্ভরতার মর্মস্পর্শী বিবরণ আমরা পেয়েছি ‘মুখ্যমন্ত্রী দের সঙ্গে ‘তে।
ছানাবাবু কিন্তু প্রফুল্ল সেনের কোনোদিন প্রথাগত সচিব ছিলেন না।ছিলেন তার থেকেও আর ও অনেক অনেক বেশি।যেমনটা ছিলেন জয়দা জ্যোতিবাবুর।ছানাবাবুর সঙ্গে প্রফুল্ল সেনের সম্পর্ক শেষ জাতীয় আন্দোলনের সময় থেকে।ওঁর দাদা অপরেশ ভট্টাচার্য ছিলেন অতুল্য ঘোষের ঘনিষ্ঠ।অতুল্য বাবুর মৃত্যুর পর বিধান শিশু উদ্যানের দায়িত্ব ও অপরেশবাবুর উপর ন্যস্ত হয়েছিল।
ছানাবাবু তাঁর প্রফুল্লদাকে ছাড়েন নব্বইয়ের দুর্গা ষষ্ঠীর দিন।সেদিন সকাল দশটা নাগাদ এক্সাইড আপিসের পিছনে সাবেক কংগ্রেস ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন;বুঝলি এখন আর আমার কোনো চিন্তা নেই।কে বলবে ঠিক তার আগের দিন ই বেলভিউ তে যখন শোনা গেল কেবল বন্ডে সই করবার জন্যে কেউ এগিয়ে না আসায় প্রফুল্লচন্দ্র কে পেস মেকার বসাতে দেরি হচ্ছে শুনে তাঁর এক কিশোর অনুগামীর উপর ক্ষেপে আগুন হয়ে গিয়েছিলেন এই ছানাবাবুই!কিশোরটির উপর রেগে বলে উঠলেন;তুই কি করছিলি?তুই সই করতে পারলি না?
স্বাধীনতার প্রায় সমবয়স্ক জয়দার ভিতরেও জ্যোতিবাবুকে ঘিরে ছিল এমনটাই অনুভূতি।জ্যোতিবাবু স্নেহভাজন একজন উপার্জন করবার পর থেকে শারদ উৎসবে তাঁকে এমন একটা কিছু দেওয়ার চেষ্টা করতেন যেটা উনি ব্যবহার করবেন।অবসর নেওয়ার পর সেই ব্যক্তিটিকে জ্যোতিবাবু বললেন; এখন আর অতো জামা কাপড় দিও না।তেমন তো আর বাইরে বের হয় না। অনুরাগীটিও নাছোড়বান্দা।মুশকিল আসান জয়দা।
বললেন; আপনি সাহেব যেমন পড়েন হাত ওয়ালা গেঞ্জি,তেমন ৯৫ সাইজের দিন।জয়দার সাহেবের কালের গতিতে অল্পদিনের ভিতর ৯৫ সাইজের গেঞ্জি ৯০ তে চলে এলো।অকপটে অনুরাগীকে বদলটা বলে দিলেন জয়দা।সেই অনুরাগীটির একটু বাজার করার নেশা।শীতের দিনে ভালো ট্যাংড়া মাছ দেখলেই পাঠিয়ে দেন জ্যোতিবাবুকে।
জয়দা একদিন অনুরাগীটির উপর কপট রাগ করে বললেন; এতো বেশি মাছ পাঠান কেন?সাহেবের তো একটু বেশি খেলেই শরীর খারাপ করে।বাইরের কাজের লোকেরাই সব খায়।
এমন ই ছিল জয়দার পরিমিতি বোধ। আর ছিল অসাধারণ স্মৃতি শক্তি।১৯৭৯ এর জুলাই সঙ্কট থেকে শুরু করে ইন্দিরা গান্ধীর নির্মম হত্যা কান্ডের পর তাঁর মাথায় উষ্ণীষ দিয়ে গুরুদ্বারে যাওয়া কিংবা তড়িৎ তোপদারের মেয়ের বিয়েতে জ্যোতিবাবুর উপস্থিতি।ইতিহাসের এক চলমান ধারা ভাষ্য ছিলেন জয়দা।সুধীর মাধবের মতো কেন যে তিনি লিখে গেলেন না “জ্যোতিবাবুর সঙ্গে”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *