Skip to toolbar

অতিমারী, দেশের সঙ্কট, মানবতার সঙ্কটকালে সার্বিক সংযম মানব সমাজের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা।রাষ্ট্রকে ফতোয়্ জারি করে এই সংযম তার নাগরিকদের শেখাতে হয়।বিশেষ করে যে ভারত উপনিষদের য,’ ত্যেন তক্তেন ভুঞ্জিথা’ ত্যাগের ভিতর দিয়েই ভোগের মন্ত্রে দীক্ষিত, সেই ভারোবাসীর কাছে অতিমারীর কালে, আমফানের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কালে , দেশের জন্যে- দশের জন্যে আলাদা করে কিছু ত্যাগের উপদেশ দেওয়া মানে দেশের মানুষকেই অপমান করা।এই সঙ্কটকালে মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সহজাত প্রবণতা ভারতবাসীর আছে বলেই ভোগবাদের চরম উৎকর্ষতার কালে ও ভারতের মানুষকে, ভারতীয় সভ্যতাকে, সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক দুনিয়া আজ ও সম্ভ্রমের চোখে দেখে।
                                আজ সকালের খবরের কাগজের খবর, অতিমারী, আমফানের এই মহা দুর্যোগের ভিতরেও রাজ্যের মুখ্যসচিবের গৃহ পরিচারকের জন্যে সরকারি আদেশনামা প্রকাশিত হয়েছে।সেই আদেশনামা তে দেখা যাচ্ছে , কোবিদ ১৯ এর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির ভিতরেও মুখ্যসচিবের বাড়ির পরিচারকের জন্যে রাজ্য সরকার মাসে খরচ করেন দেড় লক্ষ টাকা।রাজ্য সরকার খরচ করেন বলতে, তাঁরা তো আর নোট ছাপিয়ে খরচ করেন না।খরচ টা তাঁরা করেন; আপনার আমার করের টাকাতে।খরচ টা তাঁরা করেন রাজ্যগত ভাবে প্রেট্রল – ডিজেলের উপর অতিরিক্ত কর চাপিয়ে, সেই উপার্জনের দ্বারা।যার ফলে দেশের অন্য অনেক রাজ্যের নিরিখেই আমাদের পশ্চিমবঙ্গে পেট্রল – ডিজেলের নাম অনেকখানি ই বেশি।আর আমরা সাধারণ মানুষ, কেন্দ্রের বাজার নির্ভর প্রেট্রল- ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি, রাজ্যের অতিরিক্ত করের মাশুল হিশেবে আকাশচড়া দামে চাল- ডাল- তেল – নুন সহ কাঁচা সবজি- মাছ ইত্যাদি জীবনধারণের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য গুলি কিনি আগুন দামে।আর এই আগুন দামে আমরা কেনাতে কিন্তু চাষির একফোটা আর্থিক লাভ হয় না।লাভ হয় মাঝখানে যে ফড়ে রা থাকে, সেই অংশের মানুষদের।
                 এই বিপুল বিলাসে র ভিতরে রাজ্যের প্রথম সারির আমলাদের কোবিদ ১৯ আর আমফানের ভয়াবহ সঙ্কটের ভিতরেও কেন রাখতে চাইছেন রাজ্য সরকার? একটু ভুল হল।রাজ্য সরকার না বলে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলা দরকার।কারন, কোবিদ ১৯ জনিত সঙ্কট তীব্র হয়ে ওঠার সময়কাল থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আর তাঁর গুটিকয়েক আমলা এবং পকেটস্থ কিছু চিকিৎসক ছাড়া মন্ত্রীসভা বলে কিছু আছে — এটা এই দীর্ঘ চারমাসে কি একটি বারের জন্যে আমাদের মালুম হয়েছে? হিটলার ও তার সঙের মন্ত্রীসভা চালাতে গিয়ে গোয়েবলসের মতো লোককে প্রকাশ্যে নাচন কোঁদন করিয়ে ছিল। আমাদের রাজ্যে গত চারমাসে এক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ছাড়া আর কোনো মন্ত্রী কে কি আমরা দেখেছি? এখন অবশ্য ভোট দরজায় কড়া নাড়ছে বলে, তৃণমূল বেশি নিরাপদ , না বিজেপি তে গেলে বেশি করেকম্মে খাওয়া যাবে- এই জল মাপতে আপাতনিরীহ বলে পরিচিত মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়দের নীতিবাক্যের অনেক অবলোকিত ভাষ্য আমরা শুনতে পাচ্ছি।
                      নিজের দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পর্যন্ত যে মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বাস করতে পারেন না, তিনি রাজ্যের মুখ্যসচিবের গৃহপরিচারদের বেতন বাবদ , আপনার – আমার করের টাকা তে রাজ্যের ভাঁড়ার উজার করে দেবেন– এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে কি? একটা সার্বিক ভাবে আমলা নির্ভর সরকার, যাঁদের একমাত্র কাজ হলো, শাসক শিবিরের লোকেদের করে কম্মে খাওয়ার সুব্যবস্থা আমলাকুল যাতে সুষ্ঠু ভাবে করে দেন, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতেই আমলাদের জন্যে করোনা জনিত এই ভয়াবহ সঙ্কটের ভিতরেও এতোটুকু কার্পণ্য করতে রাজি নন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
                    একটা গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোতে , নিজের দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কেবলমাত্র লুটেপুটে খাওয়াতে নিয়োজিত রেখে, প্রশাসনের ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঠুঁটো জগন্নাথ করে দিয়ে, যেভাবে একদম আমলা নির্ভর রাজ্য সরকার পরিচালনা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তেমনটা খোদ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় ও কখনো করেন নি।সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলেও সেই সময়ের শাসকদলের একটা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কন্ঠ শোনা যেত।বহু অপকর্মে যুঈঅত থাকলেও , সেই সময়ের শাসকদলে র মানুষজনেরা এবং অবশ্য ই খোদ মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থবাবু , প্রশাসনটা বুঝতেন।ফলে আজকের মতো আমলাকুল ই , নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জায়গাতে কার্যত প্রধান শাসক সেইদিন হয়ে উঠতে পারে নি।এই আমলাকুলের তো আইনসভার কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নেই।ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে মান্যতা দেওয়ার পথ দিয়েও এঁরা খুব যে একটা হাঁটেন , সে কথা বলা যায় না।
                 জনতার ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে , আমলাবাহিনী নয়, জনতার দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই যে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল নিয়ন্ত্রক, বহু সীমাবদ্ধতার ভিতরে বামফ্রন্ট সরকার এটা কায়েম করতে পেরেছিলেন।ফলে তাঁদের সময়কালে বিশেষ বিশেষ আমলাদের ঘিরে খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে অতি তৎপর হওয়া তো দূরের কথা, বিধিবহির্ভূত বিলাসব্যসনের জন্যে আমলাকুলের প্রতি এতোটুকু বিশেষ পক্ষপাতিত্ব রাজ্য সরকার কে দেখাতে হয় নি।
                  এই প্রসঙ্গে একটু অতীতের জাবর কাটা যাক।দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকার তখন ক্ষমতায়।রাজ্যের পশুপালন পশুচিকিৎসা ( তখন ও প্রাণী সম্পদ বিকাশ — দপ্তরের এই নামকরণ টি হয় নি) দপ্তরের তৎকালীন সচাব এম জি রামচন্দ্রণ নিজের ব্যবহারের জন্যে ‘ চেলপার্ক’ কালি দরকার বলে জেদ ধরলেন।সরকারি ফাইলে সচিবের নোট দেখে , বিভাগের এক আমলা সেটি সরাসরি পাঠালেন তৎকালীন বিভাগীয় মন্ত্রী অমৃতেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাছে।আন্দামানের সেলুলার জেলে বছরের পর বছর দেশ কে ব্রিটিশ শৃঙ্খলমুক্ত করতে কাটিয়েছেন অমতেন্দু বাবু।সচিবের চেলপার্ক কালির বায়নাধরা নোটের তলায় মন্ত্রী অমৃতেন্দু লিখলেন; সামান্য কালির জন্যে ও কাউকে বিশেষ পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না।সচিবের যদি বিশেষ কালির প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব থাকে, তবে সেটা তিনি নিজের খরচে কিনে ব্যবহার করুন।
                               আজ এইসব ঘটনা, কেমন রূপকথা মনে হয়।তাই না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *