স্বর্গ – নরকের ভাববাদী দোলাচালে ভাসার সময় না বুঝেই,  মায়ের চিতার আগুনের লকলকের শিখাতে ভর করে অভাগীর স্বর্গারোহনের যে চিত্র এঁকেছিলেন শরৎচন্দ্র, এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষ প্রান্তে তার ই যেন এক ‘ পরিবর্তিত চিত্রনাট্য’ আমরা দেখলাম।বলা ভালো দেখতে বাধ্য হলাম।রাষ্ট্র আমাকে- আমাদের দেখতে বাধ্য করলো , রাষ্ট্রিক পেষণ এক মাকে দেখতে বাধ্য করলো তাঁর সন্তানের লাশের ও হারিয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক দৃশ্য।
                              ইছাপুরের বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জী , চাকরি করেন কম বেতনের বেসরকারি অফিসে।নুন আনতে পান্তা ফুরোলেও বিশ্বজিৎ আর তাঁর স্ত্রী বুক দিয়ে আগলে মানুষ করেছিলেন শুভ্রজিৎকে।তাঁদের আত্মজ।স্থগিত থাকা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।শান্ত, মিষ্টি স্বভাবের জন্যে পাড়ার প্রতিটি মানুষের ই বড়ো প্রিয়।রাজনীতির ধারপাশ দিয়ে হাঁটে না।তা বলে কেউ বিপদে পড়লে গায়ে গতরে বিপদগ্রস্থের পাশে দাঁড়াতে শুভ্রজিৎ তাগড়াই যুবককেও হার মানায়।
                        পরশু রাত থেকে শুভ্রজিৎয়ের জ্বর।গোপন অঙ্গে একটা ইনফেকশন।ডায়াবেটিস আছে কি না– আগে কখনো কোনো উপসর্গতেই বোঝা যায় নি।জ্বর ক্রমশঃ তৈরি করলো শ্বাসকষ্ট।রাত যতো বাড়ে শ্বাস কষ্ট বাড়তেই থাকে।জ্বরের পাল্লা হালকা হচ্ছে তো বাড়ছে পৃথিবীর একটু দমকা হাওয়া বুক ভরে নেওয়ার জন্যে শুভ্রজিৎয়ের বুকখানার কামারশালার হাঁপড়ের মত ওঠা নামা।
                সকাল হতেই উদ্বিগ্ন বাবা – মা , পাড়ার একজন দুজনকে নিয়ে ছুটলেন বারাকপুর ছাপিয়ে একটি ই এস আই হাসপাতালে।শুভ্রজিৎয়ের বাবা যেহেতু ই এস আই র সুযোগ পান, তাই প্রথমে সেখানে যাওয়া।ই এস আই বলে তাঁদের পরিকাঠামো নেই।অগত্যা স্থানীয় ‘ সাগর দত্ত সুপার স্পেশালিটি’ ।তাঁরা ও পরিকাঠামোর দোহাই দিয়ে হাত – পা তুলে নেয় যখন , অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর শুভ্রজিৎয়ের বুক তখন কামারশালার ব্যস্ত হাপড়ের তাল কেও হার মানাচ্ছে।
                     অগত্যা কোনোদিকে না তাকিয়ে স্থানীয় একটি নার্সিংহোমে শুভ্রজিৎকে নিয়ে যান বাবা – মা।নার্সিংহোম , পাঁচ মিনিটে( জানি না এমন প্রযুক্তি শহরতলীর নার্সিংহোমে আছে কি না) পরীক্ষা করে জানায় ; রোগীর কোবিদ ১৯ পজেটিভ।পৃথিবীর হাওয়া বুক ভরে নেওয়ার জন্যে তখন জানকবুল লড়াই অ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে শুয়েই করে চলেছে শুভ্রজিৎ।অগত্যা আবার ‘ সাগর দত্ত সুপার স্পেশালিটি’ ।যথারীতি তাঁরা বলেন; কলকাতার মেডিকেল কলেজে নিয়ে যেতে।
                  অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যুপথযাত্রী শুভ্রজিৎকে নিয়ে বাবা – মা, প্রতিবেশিরা মেডিকেল কলেজে পৌঁছলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথারীতি বলেন ; বেড নেই।ভর্তি নেওয়া যাবে না।ছেলের বুকের হাপড়ের ঘা দেখে বীরাঙ্গনার মূর্তিতে তাঁর মা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কে বলেন; ভর্তি না নিলে , সেখানেই তিনি আত্মহত্যা করবেন।
                      শুভ্রজিৎ ভর্তি হওয়ার পর ও দেখা যায়, যে ঘরে তাঁকে রাখা হয়েছে, সেই ঘরের বেশ কিছু বেড খালি।শুভ্রজিৎ ও খুব বেশি সময় বেড অকুপাই করে থাকে না।পৃথিবীর বুক থেকে তাঁর শেষ বায়ুটুকু নেওয়ার মরীয়া চেষ্টাও অল্প সময়ের ভিতরেই শেষ হয়ে যায়।
                       শুভ্রজিৎ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল, আমরা, আমজনতারা এইমুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাতে আছি। কোবিদ ১৯ জনিত কারনে স্বাস্থ্য পরিষেবা আজ কোন জায়গাতে দাঁড়িয়ে শুভ্রজিৎয়ের ঘটনা, যাকে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় নিশ্চয় ই বলবেন,’ ছোট্ট ঘটনা’ , তা প্রমাণ করে দিয়ে গেল ঠিক কোন জায়গাতে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।
                      শুভ্রজিৎয়ের পরিবারকে কে কতোবেশি’  সাহায্য ‘ করতে পারেন, তা নিয়ে হয়তো ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের শাসক বনাম রাজ্যের শাসকদের ভিতর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।শুভ্রজিৎদের হাঁড়িকাঠে না চড়ালে শাসকের ভোটের ঝুলি ভরবে কি ভাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *