রাজস্থানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত দেখে একটা প্রশ্ন সবথেকে বড়ো হয়ে উঠছে।প্রশ্নটি হল; বিজেপি বা কংগ্রেস- দুটি দলের কাছেই কি রাজনীতি শব্দটির অর্থ ক্ষমতা? ক্ষমতার অলিন্দে থাকাটাকেই কি এইসব দলগুলির উঁচু থেকে ভূমিস্তর– সব পর্যায়ের নেতারাই রাজনীতিতে অস্তিত্ব প্রমাণের একমাত্র উপকরণ করে মনে করেন? নীতি, আদর্শ, মানুষ, যে মানুষগুলি ভোট দিয়ে তাঁদের আইনসভাতে পাঠিয়েছেন, তাঁদের প্রতি দায়বদ্ধতা– এগুলি সব তুচ্ছ? এই মানুষগুলির কোনো মূল্য নেই? এই মানুষগুলির প্রতি এইসব রাজনীতিকদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই?
                               কিছুদিন আগে আমরা দেখলাম জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে।গোয়ালিয়রের রাজার খাস তালুকের মতোই পিতা মাধবরাওয়ের তখতে জ্যোতিরাদিত্য কে বসিয়ে দিয়েছিল তাঁর দল কংগ্রেস।মাধবরাও যদি একটু আধটু রাজনৈতিক পরিমন্ঠলে থেকেছেন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসার আগে, তাঁর পুত্র তো সেটুকু চর্চাও করেন নি।আসলে ইন্দিরা গান্ধী রাজন্যপ্রথা নামকাওয়াস্তেই যে অবলুপ্ত করেছিলেন, তা তাঁর দলে এইসব রাজারাজরাদের পায়াভারি পদচারণার থেকেই খুব ভালোভাবে বোঝা যায়।
                         মাধবরাও যেমন ছিলেন রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ, তেমন ই রাজীবপুত্র রাহুলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন জ্যোতিরাদিত্য।সেই সুবাদেই জ্যোতিরাদিত্য ভেবেই নিয়েছিলেন মধধ্যপ্রদেশে তাঁর দল কংগ্রেস জিতলে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্শি তে তাঁর ন্যায্য হক।কুর্শির বাইরে রাজনীতি কিছু হতে পারে- এই রাজনৈতিক শিক্ষা না পাওয়া লোকেদের দখলেই এখন ভারতের রাজনীতির প্রায় সিংহভাগ।কমিউনিস্টরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর তখত নীতির হেলায় ঠেলে যে মানুষের স্বার্থে রাজনীতিটাকেই তাঁদের জীবনের সবথেকে বড়ো কাজ বলে ধরে নেন, সেই প্রাকটিসের ধারপাশ দিয়ে তাই কখনো হাঁটতে দেখা যায় না বুর্জোয়া রাজনীতিকদের।
                         মুখ্যমন্ত্রী হতে না পেরে নিজের জীবনটাই বৃথা গেল ধরে নিয়ে জ্যোতিরাদিত্য , রাহুল গান্ধীর একদা কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্যটি যোগাযোগ তৈরি করলেন বিজেপির সঙ্গে।জ্যোতিরাদিত্যের ঠাকুমা ‘রাজপাতা’ বিজয়রাজে সিন্ধিয়া, পিসী বসুন্ধরারাজে ইত্যাদির মাধ্যমে আর এস এস – বিজেপির সঙ্গে জ্যোতিরাদিত্যের যে সংযোগটি ছিল, সেটিকে অবলম্বন করেই তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে দরকষাকষি শুরু করলেন।ফলাফল, মানুষের রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিজেপির মধ্যপ্রদেশের রাজ্যপাট দখল করা।
                      এক ই জিনিষের প্রায় পুনরাভিনয় হতে চলেছে রাজস্থানে।রাজেশ পাইলটের পুত্র হিশেবেই শচীন পাইলটের রাজনীতিতে প্রবেশ।রাজতন্ত্রের ধাঁচেই দলকে পরিচালিত করতে অভ্যস্থ কংগ্রেস রাজনীতিতে রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন শচীন সহজেই।ফলে তাঁকে ঘিরে রাজস্থানের কংগ্রেসী রাজনীতিতে একটি ভর কেন্দ্র তৈরি হয়ে যায়।এই জায়গা থেকেই একদা কংগ্রসের বহুল ব্যবহৃত শব্দ’ তরুণ তুর্কি’ র জেরে শচীন বা তাঁর অনুগামীরা ধরেই নিয়েছিলেন, ভোটে রাজস্থানে কংগ্রেস জিতলেই মুখ্যমন্ত্রী হবেন শচীন।অথচ তাঁদের দলের অশোক গেলটের মতো প্রবীণ নেতাদের ও মানসিকতা হল; বিনা যুদ্ধে না দিব সূচাগ্র মেদিনী।
            এই অবস্থায় চুপ করে বসে নেই বিজেপি।কারন, অর্থ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর অধিকার কায়েমের নিরিখেই তারা মানুষ কে বিচার করে।টাকার জোরে তারা নিরীক্ষণ করে ভোটার দের।রাষ্ট্রযন্ত্রের সবথেকে বিশ্বস্ত হাতিয়ার পুলিশের জোরে তারা সব সময়ে বিচার করে মানুষকে।মানুষ যদি শাসকের তল্পি বাহক না হয়, তাহলে খুব সহজেই তারা প্রতিবাদী মানুষদের উপর লেলিয়ে দেয় রাষ্ট্রযন্ত্রের পেশব বাহুর গ্রন্থিল দন্ড কে।তাই শচীন পাইলটের মুখ্যমন্ত্রী না হওয়ার হতাশাকে কি ভাবে নিজেদের দলের হয়ে হতাশা মুক্তির উপায় হতে পারে, সেজন্যে তৎপর বিজেপি।
                    রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেলট বলেছেন, বিজেপি কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে তাঁর সরকার কে ফেলতে।অতীতে তাঁর দল কংগ্রেস ও ঠিক এই ভাবেই কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতো বিরোধী সরকার কে ভাঙতে।পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দের অজয় মুখার্জীর নেতৃত্বাধীন দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার ভাঙতে কংগ্রেসের ভূমিকার কথা ভুলে যাওয়ার কথা নয়।কর্ণাটকে অকংগ্রেসী সরকার ভাঙতে বীরাপ্পা মইলির কীর্তি, যা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে মইলি টেপ করে খ্যাত হয়ে আছে– এইসব ও ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
                  রাজস্থানে শচীন পাইলটকে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করে পর্দার আড়াল থেকে বিজেপি যে খেলাটা খেলছে– তা থেকেই বোঝা যায়, ভোট রাজনীতি, মানুষের রায়– এইসব কথাগুলি বিজেপির কাছে কতোটা আভিধানিক শব্দ।দ্বিতীয় দফায় তাঁরা দেশের শাসনভার নেওয়ার পর থেকে যে কটি রাজ্যে র বিধানসভার ভোট হয়েছে, প্রায় সবকটি রাজ্যে বিজেপি হেরেছে।হারবার পরে ও বিধায়ক কেনা বেচা করে সেইসব রাজ্যে তারা ক্ষমতা দখল করেছে।
                  এই ব্যক্তিস্বার্থবাহী ট্রেন্ড এখন বুর্জোয়া রাজনীতিতে একটা চলমান ধারা।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেয়েও বিরোধী দলের বিধায়কদের নিজের দলে ঠাঁই দেন।সেইসব বিধায়করা তো মানুষের সেবার তাগিদে মমতার দলে যোগ দেন না।শাসকের দাক্ষিণ্যে করে কম্মে খেতেই তারা শাসকদলে নাম লেখান।শাসক বদলের ট্রেন্ড স্পষ্ট হলে, এরাও নোতুন শাসকের দিকে ঝোঁকে।
                          রাজীব গান্ধীর আমলে দলত্যাগ বিরোধী যে আইন তৈরি হয়েচিল, সেই আইনের ফাঁক ফোকর দিয়েই এইসব রাজনীতির বেসাতিরা শেষপর্যন্ত আইনসভার সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে পারেন।রাজীবের আমলে প্রথম তৈরি হওয়া ওই আইনটির ফাঁক ফোঁকর মেরামত করে, সেটিকে সময়োপযোগী করে তুলতে আজ পর্যন্ত দেশের কোনো সরকার ই বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেয় নি।এটাই এইমুহূর্তে সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সবথেকে বড়ো রকমের বিপদ ডেকে আনছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *