Skip to toolbar


ভাববাদী চেতনা নয়, কঠিন- কঠোর- নিকোষ বস্তুবাদী চেতনা সুকুমারী ভট্টাচার্যের( ১৯২১,১১ জুলাই-২০১৪, ২৪ শে মে) মননলোকের গহীনে চিরজাগরুক ছিল তাঁর চেতনার স্ফুরণ থেকে শেষ নিঃশ্বাস ফেলার মুহূর্ত পর্যন্ত।তাই তাঁর নির্মোহ চর্চাতে ‘ মৃত্যু’ জনিত ভাবনা ও এসেছে ভাববাদের যে কোনো রকম স্পর্শকে এতুটুকু গুরুত্ব না দিয়ে।সেই জড়বাদের কঠিন সত্যে মৃত্যুকে উপলব্ধির ক্ষেত্রে সুকুমারীর চেতনায় ঘুরে ফিরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ।সুকুমারীর ভাষায়;” কবির অনাতর্গত চাহিদা নতুন থেকে নতুনতর গতিময় সূত্রবদ্ধতার দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়, যা কখন ও কখন ও পূর্বেকার অবস্থানের  মৌলিক অস্বীকৃতি হয়ে দাঁড়ায়।”( অমৃতের পথে: রবীন্দ্রকাব্য মৃত্যু প্রসঙ্গ।প্রবন্ধ সংগ্রহ- সুকুমারী ভট্টাচার্য- তৃতীয় গন্ড।পৃ- ৩১১।গাঙচিল) ।
                      রবীন্দ্রচিন্তার বিবর্তন কবির আগের অবস্থানের থেকে মৌলিক ভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে– একথা বলাটা খুব কম কথা নয়।রবীন্দ্রনাথকে একটা অংশের মানুষ দেবত্ব আরোপ করতে অভ্যস্থ।তিনি স্থবির ।জঙ্গম।তাঁর চেতনার অনুরণনে কোনো অদলবদল আসতে পারে না- এটা রবীন্দ্র মৌলবাদীদের ইবসেনের ‘ এনিমি অব দি পিপল’ অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ‘ গণশত্রু’ ফিল্মের চরিত্রের ‘ চরণামৃত’ ঘিরে বিশ্বাসের মতো বস্তু।সেখানে দাঁড়িয়ে সুকুমারী ভট্টাচার্যের এই উচ্চারণ ই বুঝিয়ে দেয়, অত্যন্ত সাদা মাটা চেহারার , ক্ষীণতনু ব্যক্তিত্বটির ভিতর কি আগুন লুকিয়ে ছিল( গাঙচিল প্রকাশিত ‘ প্রবন্ধ সংগ্রহে’ মূল প্রবন্ধ বা সেটি যে গ্রন্থে সঙ্কলিত হয়েছিল তার সময়কালের কোনো উল্লেখ নেই।এটি পরবর্তী কালে সুকুমারী চর্চার ক্ষেত্রে গবেষকদের একটা বড়ো সমস্যার ভিতরে ফেলবে)।
                        রবীন্দ্রনাথের ‘ নিস্পন্দ আঁখিপাতে মৃত্যু’ র ঘুম হয়ে নেমে আসা, স্বপ্ন হয়ে নেমে আসার চিত্রকল্প নির্মাণের ভিতর দিয়ে সুকুমারী মৃত্যুর গহীন সাম্রাজ্যকে অতিক্রমে অভিলাসী হন বস্তুবাদের কঠিন বাস্তবের নিগড়ে।১৮৮৬ তে রবীন্দ্রনাথ অমরত্ব চাইছেন মানবকল্যাণের স্বার্থে, মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের তরে আমি বাঁচিবারে চাই’ – এই দ্যোতনার সঙ্গে মাত্র দুবছর আগে কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পর কবি রচিত ‘ মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমানে’ র আর্তির মৌলিক বিবর্তন টা তাই খুব সহজে ধরা পড়ে সুকুমারীর চোখে।মৃত্যু কিভাবে ,’ প্রায় মনোহারী রূপপরিগ্রহ ‘ করতে শুরু করেছে কিশোর রবীন্দ্রনাথের উপরে তার দিকে দিকনির্দেশ করে কেবল রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু চেতনার আঙ্গিক ই নয়, সামগ্রিক ভাবে উপনিষদের কবি বলে বর্ণিত রবীন্দ্রনাথের মানসলোকে বস্তুবাদী দর্শনের যে বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছিল , সেই সময়েই, তার দিক নির্দেশ করেছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য।এইদিক থেকে যদি আমরা সুকুমারী ভট্টাচার্যের অবদানকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে আমাদের মুক্তকন্ঠে বলতেই হবে; রবীন্দ্রমানসে বস্তুবাদী চেতনার উন্মীলন এবং ভাববাদ খন্ডনের অভিমুখ অনুসন্ধানের ক্ষেত্র সুকুমারী ভট্টাচার্য ছিলেন একজন পথিকৃৎ।
                         আজ কোবিদ ১৯ জনিত অতিমারী তে যখন ভাববাদীরা ম্যানডেন জ্যোতিষের দোহাই দিয়ে পিঠ বাঁচাতে চায়, তখন বিশেষ ভাবে স্মরণ করা দরকার সমবেত মৃত্যুঘিরে রবীন্দ্রচেতনায় উপনিষদের দর্শনবাহিত মৃত্যুচেতনাও কিভাবে টালমাটাল অবস্থার ভিতরে পড়েছিল, তার বিশ্লেষণে সুকুমারীর অনুধ্যান।
                 পুরীর কাছাকাছি জাহাজ দুর্ঘটনায় ,’ দয়াময় ঈশ্বরের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কারে ‘ কি ভাবে রবীন্দ্রমানস সিংহবিক্রমে ফুঁসে উঠেছিল, সুকুমারী ভট্টাচার্য ছাড়া সেই বিষয়ক্রম ঘিরে চর্চা করতে খুব বেশি মানুষকে দেখা যায় না।উপনিষদের কবিকে কুলুঙ্গিতে রেখে ধুপ ধুনোতে পুজো করতে অভ্যস্থ ভক্তকুল চর্চাই করে না,” বাস্তবে এক অন্ধশক্তি নির্বিকারে প্রাণনাশ করে এবং সেই শক্তির কাছে আর্জি জানানো নিরর্থক ; জীবনে একমাত্র শুভশক্তি হল ভালোবাসা।ভালোবাসা ও মৃত্যু, জীবনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক শক্তি পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত।” সুকুমারীর স্পষ্ট অভিমত এই প্রসঙ্গে;” মৃত্যু সম্পর্কিত তাঁর পরবর্তী কালের মনোভাবের মূল সুর আমরা এখান থেকে পাই।”
                     অতিমারী ঠেকাতে যখন রাষ্ট্র কার্যত সমস্ত রকমের অপধারাকে ‘ বিজ্ঞান’ বলে চালিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব হিশেবে কেবল শ্রেণীশোষণের যন্ত্রটিকেই আরো শক্তিশালী করার তাগিদে করোনা ঠেকাতে অতিপ্রাকৃতের দিকে দেশবাসীকে ঠেলে দিতে চায়, তখন বিশেষ ভাবে আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে রবীন্দ্রজীবনে চেতনার বিকাশপর্বে পুরীর সমুদ্রে জাহাজডুবিতে বহু যাত্রীর মৃত্যুর কথা।
                        প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে প্রশান্ত কুমার পাল– রবীন্দ্রজীবনের ধারাভাষ্য রচনাকারীদের কর্মকান্ডের এই দীর্ঘপ্রবাহ কালের ভিতরে একমাত্র অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর ‘ জীবনশিল্পী রবীন্দ্রনাথ”( এটি ডি এম লাইব্রেরী থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘ প্রবন্ধ’ গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত) ব্যাতীত একমাত্র সুকুমারী ভট্টাচার্য এই ঘটনার উল্লেখ করে সন্মিলিত মৃত্যু কি ভাবে উপনিষদের বিশ্বাসে স্থিত রবীন্দ্রনাথের মনন ও অবিশ্বাসের দোলাচালে ভরে উঠেছিল, তার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে , সেটির বস্তুবাদী বিশ্লেষণ করেছেন।
                        মৃত্যু প্রতিরোধে প্রেমের ভূমিকাটি রবীন্দ্রনাথ যে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেইদিকে দৃষ্টিআকর্ষণ করিয়েই সুকুমারী ভট্টাচার্যের অনুধ্যান , এখানে প্রেম,’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়, প্রেমাষ্পদ বিদায় নেয়।’ রবীন্দ্রভাবনার এই স্থিতি বোঝাতে সুকুমারী আশ্রয় নেন ১৮৯৪ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথের কবিতা।
“… যেন রৌদ্রময়ী রাতি
ঝাঁ ঝাঁ করে চারিদিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম-
শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম।।”
বলপূর্বক স্নেহের বন্ধন ছিন্নকারী মৃত্যুর কঠিন বাস্তবতার নিরিখে রবীন্দ্রচেতনায় বস্তুবাদ ও কবির এবং অবশ্য ই সকলের অলক্ষ্যে এসে ‘ মহাজাগতিক সহকল্পনায়’ একটা স্বীকৃতির বাস্তবতা তৈরি  করে, রবীন্দ্রচেতনার এমন বস্তুবাদী বীক্ষণ সুকুমারী ভট্টাচার্যের আগে কেউ করেছেন বলে জানা নেই।
” …..শুনিয়া উদাসী
বসুন্ধরা বসিয়া আছেন  এলোচুলে
দূরব্যাপী শষ্যক্ষেত্রে জাহ্নবীর কূলে
একখানি রৌদ্রপীত হিরণ্য অঞ্চল
বক্ষে টানি দিয়া; স্থির নয়নযুগল
দূর নীলাম্বরে মগ্ন; মুখেসনাহি বাণী।
দেখিলাম তাঁর সেই ম্লানমুখখানি
সেই দ্বারপ্রান্ত লীন, স্তব্ধ, মর্মাহত,
মোর চারি বৎসরের কন্যার মতো।”
এই ‘ যেতে নাহি দিব’ কবিতাটির মর্মলোকের ভিতর রবীন্দ্রচেতনাতে মৃত্যুর নীরব ত্বরণের পরত গুলি খুলতে খুলতে সুকুমারী ভট্টাচার্য রবীন্দ্রভাবনাতে ভাববাদের দোদুল্যমানতার যে ছবি বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিমায় উপস্থাপিত করেছেন, তা যেমন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের সামনে এক নোতুন ভাবে চেনার- জানার সুযোগ করে দেয়, তেমনি ই নোতুন করে চেনায় সুকুমারী ভট্টাচার্য কেও।
      

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *