নয়া উদারনীতির শীবাকীর্তনে হিন্দুত্ববাদীরা
গৌতম রায়
নয়া উদার অর্থনীতি গোটা বিশ্বের আর্থ সামাজিক পরিকাঠামোকে নাড়িয়ে দিলেও তংতীয় বিশ্বের দেশ গুলির সার্বিক পরিমন্ডলটাকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে।সাত চল্লিশের দেশ ভাগ খন্ডিত ভারতের সবকিছু এলোমেলো করে দিলেও তাকে পুনর্গঠনের জন্যে সতীর্থদের হিন্দুয়ানীর বাঁধা অতিক্রম করে সোভিয়েটের ছায়ায় শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার ভিতরেও চেষ্টা করেছিলেন জওহরলাল নেহরু।
জাতীয় আন্দোলনের সময়ে হরিপুরা কংগ্রেসে(১৯৩৮) জাতীয় কংগ্রেস “জাতীয় পরিকল্পনা কমিশন”( এন পি সি) তৈরী করে।সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন হরিপুরাতে।তবে “জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের “নেতৃত্ব ছিলেন নেহরু।তিনি ছাড়াও আর ও তিরিশজন সদস্য ওই কমিশনের সভ্য ছিলেন। এই কমিশনের বেশ কিছু উপসমিতি তৈরী হয়েছিল।কৃষি,শিল্প,জ্বালানি,বিদ্যুৎশক্তি,সামাজিক পরিষেবা,বিত্ত,পরিকল্পিত অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা ইত্যাদির পাশে জাতীয় স্বয়ংভরতার পাশাপাশি পরবর্তী দশ বছরের ভিতরে ভারতীয়দের জীবনের মানকে দ্বিগুণ করাকে লক্ষমাত্রা হিশেবে ধরা হয়েছিল।
মহারাষ্ট্রের মানুষদের যেমন শিবাজীকে ঘিরে অষ্মিতা আছে কিছু বাঙালির তেমন আছে সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে।।এনপিসি যে আমলে তৈরী হয় সে আমলে যেহেতু সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি তাই বাঙালির একাংশ তার পুরো কৃতিত্ব তাঁকেই দিতে চান। এটি ইতিহাসের খন্ডিত ব্যাখ্যা।এনপিসির ধ্যাণ ধারণা এবং ভাবনাকে প্রসারিত করবার মূল কারিগর হলেন নেহরু।স্বাধীন ভারতে জাপানের যুদ্ধোত্তর অগ্রগতি এবং সোভিয়েট সমাজতন্ত্রের সাফল্য নিজের শ্রেণিস্বার্থ জনিত সীমাবদ্ধতার ভিতরেও যোজনা কমিশনের ভিতর দিয়ে প্রয়োগ করেছিলেন নেহরু।
    যেসব দেশীয় শিল্পপতিরা কংগ্রেসের দ্বারা নিজেদের স্বার্থ বজায় থাকাবে বলে প্রত্যয়ী ছিলেন,তাঁরা হতে চেয়েছিলেন তৈরী ছেলের বাপ।তাঁরা চেয়েছিলেন বিদ্যুৎ থেকে কাপড় কল বা স্টিল প্ল্যান্টের পরিকাঠামো সরকার বানিয়ে দেবেন আর “ব্যাওসা”টা তাঁরা করবেন।মুনাফাটা তাঁরাই লুটবেন।
         “পরিকল্পনা কমিশনের”ভিতর দিয়ে নেহরু -মহালনবিশ মডেল জোর দিয়েছিল  ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর।রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল সম্ভবত সোভিয়ট প্রভাবে।বেসরকারি ক্ষেত্রের ভূমিকাকে তেমন একটা পাত্তা দেওয়া হয় নি।ফলে সংগঠিত এবং অসংগঠিত উভয় ক্ষেত্রের শ্রমিক সমাজের ভিতরে আধা সামন্ততান্ত্রিক পরিকাঠামোতেই একটা ইতিবাচক প্রবণতার লক্ষণ ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল। এই প্রবণতা ইন্দিরা গান্ধীর আমল পর্ষন্ত মোটামুটি ভাবে বজায় ছিল।
এই প্রবণতা লঙ্ঘিত হওয়ার প্রথম ইঙ্গিত মেলে রাজীব গান্ধীর আমলে আমদানি-রফতানি নীতির অদলবদলের ভিতর দিয়ে।নেহরু -মহলনবিশ মডেল কে ত্যাজ্য করে দেওয়ার প্রাথমিক প্রচেষ্টার সেই কিন্তু শুরুয়াত।
  নব্বইয়ের দশক থেকে নেহরু মডেলের অর্থনীতিকে পরিত্যাগ করে নরসিংহ রাওয়ের আমল থেকে বাজার অর্থনীতি হয়ে ওঠে ভারতীয় অর্থনীতির মডেল।কল্যাণময় রাষ্ট্রের ধ্যানধারণা কে ক্রমেই গ্রাস করে দেশি ,বিদেশি বহুজাগতিকদের উন্মত্ত লালসা।ভারতের বাজার হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের বশংবদদের অগাধ মৃগয়া ভূমি।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নোতুন নোতুন আবিস্কার মানুষের জীবনে কিছুটা অদল বদল আনে।এই বদলে যাওয়াটা আলঙ্কারিক কীনা এই প্রশ্ন তীব্র হয় কালাহান্ডি দেখে।উৎপাদিত তুলো,আঁখের দাম দিতে না পারায় কৃষকের আত্মহত্যার মধ্যে দিয়ে।ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে কৃষকের আত্মঘাতী হওয়ার বুক মোচড়ানো কান্নার ভিতর দিয়ে।
এই ভারতে সুপার কম্পিউটার,অ্যানড্রয়েট,  আই ফোন –তখন কেমন যেন উপহাস করতে থাকে।বঙ্কিমচন্দ্র বর্ণিত হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্য রা মনের আনাচে কানাচে বড্ড বেশি উকি দেয়।তাই উত্তরপ্রদেশের সামলিজেলার কইরানা গ্রাম আমাদের কাছে একুশ শতকের এক ষন্ত্রণা ক্ষুব্ধ চিত্র নিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।
চল্লিশের দশকে যন্ত্রণাক্ষুব্ধবাংলায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র লিখেছিলেন,’গ্রাম ভেঙে আজ এসেছি শহরে,এনেছি দুঃখ,এনেছি মৃত্যু ,এনেছি রোগ,এনেছি ভোগ ,ছেঁড়া থলি ভরে ভরে’যেন আবার আমরা বাঙময় হয়ে উঠতে দেখছি কেবল মাত্র বাংলায় নয়,গোটা ভারতে।
        কেবলমাত্র উত্তরপ্রদেশের সামলি জেলার কইরানা গ্রাম ই নয়,মানুষের এই অভিবাসন এখন আর কেবল দেশ কালের সীমানায় আবদ্ধ নয়।নয়া উদারনীতির কল্যণে “নবজীবনের গানে”র সময়কালের বাংলার আর্থ-সামাজিক পরিবেশের পুনরাগমনের পরিবেশ পরিস্থপেতি আজ গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
পেটের তাগিদে মানুষ কেবলমাত্র ভিন রাজ্যেই পারি জমাচ্ছে না।সে চলে যাচ্ছে ভিন দেশেও।জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুনিয়ার এই প্রবণতা থেকে কোনো ব্যতিক্রমী পদচারণা তো কইরানায় দেখা যাচ্ছে না।তবে কেন উত্তরপ্রদেশের কিছু মানুষের কাছে সঙ্গীত চর্চার জন্যে চেনা আর বেশিরভাগ মানুষেরই কাছে অচেনা অজানা ধুলি মলিন গাঁ কইরানা আজ সংবাদ শিরোণামে?
নয়া উদার নীতি বুদ্ধি শ্রমিক,সংগঠিত শ্রমিক এবং অসংগঠিত শ্রমিকের ভিতরে যে ভয়ঙ্কর বিভেদের পাঁচিল তুলেছে ,তা একদিকে যেমন দেশের আর্থ -সামাজিক বৈষম্য কে তীব্র করেছে তেমনিই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মেরুকরণের ভিতর দিয় “সামপ্রদায়িকতা “কে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি হিশেবে মেলে ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পথকে সুগম করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ,আসাম,কেরালা ইত্যাদি রাজ্যের ভোটের আগে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নয়,বেকারী নয়,জাতীয় নিরাপত্তা ও নয় ,প্রধান উপজীব্য করে তোলা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অভিধান প্রসূত ‘সহিষ্ণুতা -অসহিষ্ণুতা’ইস্যু টিকে।
গোবিন্দ পানসারে,দাভোলকরকে হত্যা করে একটা দাসের রাজার ত্রাসের রাজত্বের পরিবেশ রচনা করা হয়।তেমনই হাড় হিম করা পরিবেশ রচনা করা হয় দিল্লীর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কানাহাইয়া কুমার ও তাঁর সতীর্থ দের উপর।কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর প্ররোচনায় আত্মঘাতী হতে বাধ্য হন হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত গবেষক রোহিত ভেমুলা।
এই ঘটনাক্রমের অব্যবহিত পরেই কেন্দ্রের শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় কর্ম সমিতির বৈঠক বসে।সেই বৈঠকে বিভাজনের রাজনীতির এহেন সাফল্যে শাসক দলের নেতারা তাদের খুশি গোপন করে রাখতে পারেন নি।বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ দলীয় সহকারীদের নির্দেশ দেন,এই বিভাজনের রাজনীতিকেই তীব্র করে সেই মুহুর্তে আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি রাজ্যের নির্বাচনে ঝাপিয়ে পড়তে।অসমে এই কৌশলের সাফল্য হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বেশ ভালো ভাবেই ঘরে তুলেছে।
      তবে এই প্রসঙ্গে আমাদের সচেতন থাকা দরকার যে,পশ্চিমবঙ্গেও একটি শক্তি “দলিত সাম্প্রদায়িকতা “কে মেলে ধরতে তৎপর।বেদনার বিষয় এই  স্বার্থান্বেষীদের ভিতর এমন কেউ কেউ আছেন যাঁরা বামপন্থী হিশেবে প্রকাশ্যে নিজেদের মেলে ধরেন;’পৈতে টিকি টুপি টোপরের কল্যাণে।”
      এই পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে বলতে হয় যে,     উত্তরপ্রদেশের ভোট প্রায় দরজায় কড়া নাড়ছে।আগামী বছরের গোড়ার দিকেই সে রাজ্যে ভোট।তাই গোটা সামলি জেলার একটি অর্থনৈতিক সঙ্কটকে কইরানা গ্রামের প্রক্ষিতে উপস্থাপিত করতে তৎপর হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি। উদার অর্থসানীতির জেরে অসংগঠিত শ্রমিক সমাজের যে চরমতম সঙ্কট পেন্টাগণের বদান্যতায় তাকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার লেবাসে সিক্ত করে পরিবেশন করত চায় আর এস এস ও তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি।
  সামাজিক যে সমস্যা নরেন্দ্র মোদী সরকারের আত্মঘাতী অর্থনৈতিক নীতির জন্যে মানুষ কে স্বদেশে পরবাসী করে তুলেছে,সেই আত্মহননের অভিমুখ মানুষের উপলব্ধিতে আসতে দিতে চায় না শাসক।সেই কারনেই আর্থ-সামাজিক সমস্যার গায়ে তারা লটকে দেওয়ার চেষ্টা করছে সাম্প্রদায়িকতার লেবাস। উদ্দেশ্য সেই এক ই,বিভাজনের স্টিম রোলার চালানো।
      ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্রময় বৈশিষ্ঠের নিরিখে উত্তরপ্রদেশের এই সামলি জেলা ,বিশেষ করে কইরানা গ্রামটিকে সমন্বয়ী ভারত সংসকৃতির একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যেতে পারে।প্রাচ্যের মার্গ সঙ্গীতের বিশিষ্ট ঘরানার উদ্ভব কইরানা থেকেই।উস্তাদ আবদুল করীম খাঁ সাহেব সৃষ্ট কিরানা ঘরানা ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের এক চিরস্থায়ী সম্পদ।আবাহমান কাল ধরে সঙ্গীত,নৃত্য,চিত্রকলা ইত্যাদি শিল্প চর্চায় সাম্প্রদায়িক ভেদ রেখাকে ভারতবর্ষ মুহুর্তের জন্যেও ঠাঁই দেয় নি।
প্রবাহমান ভারতের সেই চিরন্তন বৈশিষ্ট বুকে ধারণ করে টিকে থাকা কইরানার বুকে বিভেদের সিঁদুরে মেঘ জমতে শুরু করেছে।
প্রাকৃতিক বৈশিষ্টে যে ভাবে জল উষ্ণতায় বাস্প হয়ে উপরে উঠে মেঘ তৈরী হয়-এ মেঘের উদ্ভব তেমন ভাবে নয়।সামাজিক পরিবেশ উষ্ণ হচ্ছে ঠিক ই ,তবে তা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর জন্যে নয়।ম্যান ওয়ার্মিং র কারণে।অর্থনীতির ঘোর সঙ্কটে পাষাণে মোরানো নগর হৃদয় আর সেভাবে জন্ম দিচ্ছে না অন্নের।চাষীর ছেলে উন্নত প্রযুক্তির চাষাবাদের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না।কারণ,উন্নত প্রযুক্তিকে করায়ত্ত করতে যে টাঁকের জোর দরকার,তা তো তার নেই।জমির মালিক তো এখন ও জমিদার,জোতদারেরাই।হোকনা সেই কবে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে জমিদারী প্রথার বিলোপ।পোষাক বদলে জমিদার,জোতদার,মুখিয়া –এরাই তো শাসন করছে গ্রামীন ভারতকে।যে বুর্জোয়া শক্তির কাছে এরা নিজেদের সবথেকে বেশি নিরাপদ বলে ধরে নেবে,তাদের কেই তো অধিষ্ঠিত করছে সাউথ ব্লকে।তা সে ‘গরিবি হঠাও’ই হোক বা বাগপতের ক্ষেতে হালচষা কিষাণ কিংবা রাম নাম সত্ হ্যায়ের দল–যেই হোক না কেন।
শ্যাম পিত্রোদার শ্যামের বাঁশির আড়কাঠির ডাক দেশের অন্য প্রান্তের গ্রামগুলোর মতোই কইরানাও শুনেছে।তাই ‘আচ্ছে দিনে’র দেমাকী চমকে সেই যন্ত্রণাক্ষুব্ধ চল্লিশের মতোই গ্রাম ভেঙে পাড়ি জমাচ্ছে শহরে।আর সেই ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে ধর্মের রাজনৈতিক কারবারীরা।একটি গভীর উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যাকে সাম্প্রদায়িক চেহারা দিয়ে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের আগে সামাজিক বিভাজন কে তীব্র করে নিজেদের নগ্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি হিশেবে সাম্প্রদায়িকতার প্রয়োগ ঘটাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।
যে পদ্ধতিতে শেখ আখলাখের গ্রাম দাদরিতে একটা শীতল সন্ত্রাসের পরিবেশ অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক রচনা করেছিল হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি কইরানাতেও তার ই সফল পুনরাবৃত্তি তারা ঘটিয়েছে।দেশপ্রেম আর দেশদ্রোহীতার জিগির তুলে সযত্নে গোটা দেশে যে মেরুকরণ ভারতীয় ফ্যাসিবাদীরা সৃষ্টি করেছে তার প্রয়োগ যেখানে যেভাবে তারা পারছে,সেখানে সেই ভাবে তারা করে চলেছে।কইরানা হলো তাদের সেই কার্যক্রমের ই একটি বিশেষ রকমের উল্লেখযোগ্য অঙ্গ।
রুটির তাগিদে,এক মুঠো ভাত জোগারের তাড়নায় নিম্নবিত্তের মানুষ,হিন্দু -মুসলমান নির্বিশেষে কইরানা ছেড়ে শহর মুখো হচ্ছে।এই অভিবাসন যে কেবল কইরানাতেই হচ্ছে ,তেমনটা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।পেটের দায়ে শহর মুখী হওয়ার প্রবণতা দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই রয়েছে।কেন্দ্রের আর্থিক নীতি গ্রামীণ ভারতের আর্থিক পরিকাঠামোটি ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে ।ফলে শহরমুখো এই মানুষের ঢল।এই একান্ত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রঙ দিয়ে আর এস এস ,বি জে পি মোদি সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্য খাতে বইয়ে দিতে চাইছে।
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ আর এস এসীয় হিন্দু সন্ত্রাসবাদীদের হাতে ধ্বংস হওয়ার পর থেকে ভারতের সংখ্যালঘু সমাজ,বিশেষ করে মুসলমান সংখ্যালঘুরা একটা ভয়াবহ প্রান্তিক অবস্থার ভিতরে রয়েছে।অটলবিহারী বাজপেয়ী জমানার ভয়াবহকতা ভারতীয় মুসলমানেরা যে প্রথম ইউ পি এ সরকারের আমলেও কাটাতে পারেন নি তা বোঝা যায় মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রী এ আর আন্তুলের কথার ভিতর দিয়েই।
আন্তোলের সেদিনের কথার যথার্থতা বোঝা যায় সম্প্রতি কইরানা সংলগ্ন এলাকার বিজেপি সাংসদ হুকুম সিংয়ের শীবাকীর্তনের ভিতর দিয়ে।ওই বিজেপি সাংসদের দাবি কইরানাতে নাকি ‘নয়া কাশ্মীর’তৈরীর ষড়যন্ত্র চলছে।বলা বাহুল্য ষড়যন্ত্রকারী  রা হলেন হুকুম সিং য়ের মতে মুসলমানেরা!’নয়া কাশ্মীর’বিশেষণ টির ভিতর দিয়েই হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির মানসিকতার সম্যক উপলব্ধিটা প্রকাশ পাঅচ্ছে।হুকুম সিং এর অভিযোগ হলো কইরানাতে নাকি  বেছে বেছে হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে।সেখানে নাকি হিন্দু ব্যবসায়ীদের উপর মারাত্মক অত্যাচার চালানো হচ্ছে।বলার প্রয়োজন রাখে না যে আক্রমণকারী হিশেবে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদেরকেই সে চিহ্নিত করছে।হুকুম সিং এটাই ইঙ্গিত করতে চাইছে যে,মুসলমানেরা এই কারনে হিন্দু ব্যবসায়ীদের উপরে আক্রমণ শানাচ্ঠে যে,যাতে করে হিন্দু ব্যবসায়ী রা তাদের সব ব্যবসা পত্তর ফেলে কইরানা ছেড়ে চলে যায়।
নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে একটি শিশুর
কাছেও কি এই কথা বিশ্বাসযোগ্য বলে বোধ হবে?কোনো মুসলমান মোদী জমানায় সংখ্যাগুরুর রুটি রুজিতে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারে এটা বর্তমান ভারতে মোদী জমানায় কোনো চিন্তাশীল মানুষের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।মজার কথা হলো এই হুকোম সিং,যে কি না নিজে মোজফ্ ফরনগর দাঙ্গার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত,সে  ৩৪৬ জনের একটি তালিকা পেশ করেছে।বলা বাহুল্য ওই ব্যক্তির দাখিল করা ৩৪৬ জনের তালিকার সক্কলেই জন্মসূত্রে হিন্দু।হুকুম সাং এর অভিযোগ ওই লোকেরা নাকি মুসলমানদের অত্যাচারে কইরানা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে!
সবথেকে হাস্যকর বিষয় হলো ,মোদি জমানায় যখন হিন্দু সাম্প্রদায়িক,মৌলবাদী শক্তির বদান্যতায় গোটা দেশে একটা ভয়াবহ দমবন্ধকর পরিবেশ চলছে,সংখ্যালঘু সমাজ এখন কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে।এমন একটা পরিস্থিতির ভিতরে খোদ উত্তরপ্রদেশে মুসলমানদের ‘গুন্ডাগাড্ডি’ভয়ে দলে দলে হিন্দুরা ভিটে মাটি ছেড়ে চলে যাবেন–একথা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?
কইরানায় রুটি রুজির টানে হিন্দু -মুসলমান নির্বিশেষে বাঁচার তাগিদে মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়ার বিষয়টিকে বিজেপি এমনই একটা সময়ে তাদের সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা হিশেবে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে যখন ওই উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদেই তাদের দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক হতে চলেছে।
             বিজেপি সাংসদ হুকুম সিংয়ের এই দাবির পাশাপাশি সানাইয়ের পোঁ র মতো তাল ধরে রেখেছে সঙ্ঘের শাখা সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ।মুসলমান সমাজকে টার্গেট করে ভি এইচ পি প্রায় গোটা উত্তরপ্রদেশ জুড়েই প্রচার করে চলেছে যে,কইরানাতে মুসলিম জেহাদিরা অত্যন্ত সক্রিয়,তারাই সেখানকার হিন্দুদের ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করছে।স্থানীয় সংবাদমাধ্যম গুলির উপর হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির যথেষ্ট প্রভাব থাকার ফলে সংবাদপত্র গুলিও লাগামহীন ভাবে এইসব প্ররোচনা মূলক খবর ছেপে যাচ্ছে।
বাম সাংসদ মহম্মদ সেলিম একটি রাজনৈতিক প্রতিনিধি দল নিয়ে সম্প্রতি কইরানাতে গিয়েছিলেন।ক্ষেত্র অনুসন্ধানে র পর তাঁর যথার্থ উপলব্ধি যে,কইরানার সমস্যার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই।গোটা বিষয়টিই অর্থনৈতিক এবং কিছুটা হলেও আইনশৃঙ্খলা জনিত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।মহম্মদ সেলিমের যথার্থই সমাজমনষ্ক উপলব্ধি,সাম্প্রদায়িক কারনে একটিও মানুষ কইরানা ছেড়ে চলে যান নি।তাঁর মতে,হিন্দু -মুসলমান নির্বিশেষে জীবন জীবিকার তাগিদে,ভালো সুযোগের আশায় তাঁরা অন্যত্র চলে গিয়েছেন।সখানে আজও আধুনিক চিকিৎসা,আধুনিক শিক্ষার অভাবে র ভয়াবহকতার কথা স্থানীয় মানুষ সেলিমের কাছে বলেছেন।তাই তাঁর অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মূল্যায়ন,সমস্যাটা হলো আর্থ-সামাজিক চরিত্রের ।আদৌ কোনো সাম্প্রদায়িকক সমস্যা নয়।মহম্মদ সেলিমের উপলব্ধি,সাংসদ হিশেবে হুকুম সিং তাঁর সীমাহীন ব্যর্থতাকে ঢাকতেই সামাজিক,অর্থনৈতিক সমস্যা টিকে সাম্প্রদায়িক গতিমুখ দিতে চাইছেন।
        পশ্চিমবঙ্গ,কেরল ইত্যাদি রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে সহিষ্ণুতা প্রভৃতি বিষয় গুলি তুলে যে মেরুকরণের খেলা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির শুরু করেছিল,সেটা তাদের কোনো সাময়িক কৌশল ছিল না।’আচ্ছে দিন’এর শ্লোগান তুলে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদির সার্বিক ব্যর্থতা থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতেই তাদের এই কৌশল।এই ট্রাটেজিক ধারাবাহিকতা তারা যে কেবলমাত্র উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনেই বজায় রাখবে,তা কিন্তু নয়।২০১৯ সালের লোকসভার ভোট পর্যন্ত এই কৌশল তারা ধরে রাখবে।
কইরানায় যে সাম্প্রদায়িক জিগির আর এস এস বা তার শাখা সংগঠন গুলি কিংবা তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি তুলতে চাইছে তার তাৎক্ষণিক কারণ হলো উত্তরপ্রদেশের আসন্ন বিধানসভার ভোট,আর সুদূর প্রসারী কারণ হলো আগামী লোকসভার ভোট।
                             কেন্দ্রে মোদি সরকার রাজ্যগুলির অ কমিউনিষ্ট এবং অ কংগ্রেসি সরকার গুলির সঙ্গে পারস্পরিক সুখে শান্তিতে সহাবস্থানের একটা অঘোষিত নীতি বেশ কিছুদিন ধরেই নিয়ে চলেছে।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা জয়রাম জয়ললিতার সঙ্গে মোদি ও তাঁর দল এবং প্রশাসনের সম্পর্ক দেখে এই বোঝাপড়াটা বেশ ভালোভাবেই মালুম হয়। উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ সিং যাদবের সঙ্গে তেমন কোনো বোঝাপড়ার পরিবেশ রচিত হয়েছে কি না ,তা এখন রাজনৈতিক মহলের একটি বিশেষ চর্চিত বিষয়।
                সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী দলের ভিতর মূলায়ম সিং যাদবের সময় আর অখিলেশ সিং যাদবের সময়ের ভিতরে কোনো চরিত্রগত অদলবদল ঘটেছে কি না ,তা নিয়েও এখন চর্চা হতে শুরু করে দিয়েছে।বিশেষ করে সঃ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ইস্যুতে পিতা-পুত্রের ঠান্ডা লড়াইয়ের কথাও কোনো কোনো মহল থেকে শোনা যাচ্ছে।এই ঠান্ডা লড়াইয়ের আড়ালে বিজেপি সখ্যতার বিষয়টিও নাকি উঠে আসছে বলে দুষ্টু লোকেরা বলে।
         অপরপক্ষে গত কয়েকবছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা মায়াবতী যে শক্তি সঞ্চয় করছিল ,তা তাঁর দল ভাঙাবার খেলার ভিতর দিয়ে নির্মূল করে দেওয়ার একটা চেষ্টা চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *