মোদির দুস্কৃতি থেকে যন্তর মন্তর
গৌতম রায়।
গ্রামে চত্তির মাসে যেমন ভোলেবাবার স্মরণকারীর দল ভেক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এই ঘোর বর্ষাকালে বুঝিবা তেমন দশাই হতে চলেছে “গোমাতা”র সেবক কূলের।কূল রাখতে গেলে পাছে শ্যাম হারায়,তাই দদিক বজায় রেখে চোর কে চুরি করা আর গেরস্ত কে সজাগ থাকার পরামর্শের প্রাচীন বাংলা প্রবাদ ই বুঝিবা এখন ভেসে ওঠবার মহামন্ত্র হয়ে উঠেছে মোদির কাছে।তাই স্বঘোষিত গোরক্ষক দের “দুর্বৃত্ত”বলে ভোটের বাজার সামলে সুমলে রেখে সেইসব “দুর্বৃত্ত”দের মেহমানদারির বিন্দুমাত্র ত্রুটি না ঘটিয়ে তিনি নাগপুরের কর্তাব্যক্তিদের ও সুখে শান্তিতে থাকবার ব্যবস্থা করে দিলেন।
গণহত্যার কালে গোটা গুজরাট যখন জ্বলছে তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে “রাজধর্ম”পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশের দাদরি থেকে শুরু করে গুজরাটের উনা কিংবা মুজফ্ ফরনগরের কাধলি অথবা লক্ষৌয়ের ইন্দিরা নগরের তাকরোহি এলাকায় গোরক্ষার নাম করে সংখ্যালঘু ও দলিতদের উপর দানবীয় অত্যাচারের পর হামলাকারীদের “দুর্বৃত্ত”বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া আর যাই হোক দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শোভা পায় না।
কাদের আড়াল করতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি?যাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতাত বিষ বাষ্পে চিরন্তন ভারতকেই কেবলমাত্রধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র দেখা যাচ্ছে তা নয়। এদের বিরুদ্ধে সরাসরি শিশু পাচারের অভিযোগ পর্যন্ত রয়েছে।আসামের কোকরাঝাড় জেলা থেকে ৩১শিশু কণ্যাকে পাচার করে গুজরাট এবং পাঞ্জাবে পাঠিয়ে দিয়েছে আর এস এসের সহযোগীরা –এমন গুরুতর অভিযোগ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির সম্পর্কে উঠেছে।
সেই সব শিশু গুলিকে গুজরাট এবং পাঞ্জাবে আর এস এস পরিচালিত ইস্কুলগুলিতে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে একটি ইংরেজি সংবাদ সাময়িকী তে বিস্তারিত খবর ও প্রকাশিত হয়েছে।আর এস এস পরিচালিত আস্কুল গুলিতে ওইসব শিশু কণ্যাদের পড়াশুনার পরিবর্তে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার সচিত্র বিবরণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ইংরেজি সাময়িকী তে সচিত্র ভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
শিশু পাচার করে তাদের হিন্দুত্ববাদী প্রশিক্ষণ দিয়ে হিন্দু সন্ত্রাসবাদী করে তোলবার এই প্রক্রিয়া আর এস এস বা তাদের সহযোগীরা যে কেবলমাত্র আসাম বা তার সন্নিহিত এলাকায় চালাচ্ছে তা কিন্তু নয়।দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই ষড়যন্ত্র তারা চালিয়ে যাচ্ছে।ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিশু পাচার করে সন্ত্রাসবাদী প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যে যে কর্মকান্ড আর এস এস গুজরাটে করছে ,সেই কাজ কিন্তু তারা আজ হঠাৎ করে করতে শুরু করে নি।বহুদিন ধরেই এই নোংরা খেলা তারা খেলে চলেছে।এ খেলায় খোদ গুজরাট সরকার নানা ভাবে তাদের সহযোগিতা করে চলেছে।মোদি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিষয়টি নোতুন রকমের গতি পেয়েছে।
নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার আগে যেমন” আচ্ছে দিন” এর শ্লোগান দিয়েছিলেন তেমনি ই ক্ষমতায় আসার পর বলেছিলেন,”বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও”।এই শ্লোগানটিকে মনে হয় মোদি আর তার সঙ্গী সাথীরা মিলে “অপারেশন বেটি উঠাও”তে পর্যবসিত করতে চাইছেন। একটি সংবাদসূত্রে প্রকাশ,২০১৫ সালের ৯ই জুন আসামের পাঁচটি জেলা থেকে মোট ৩১জন শিশু কণ্যাকেপড়াশুনা শেখাবার নাম করে নিয়ে যাওয়া হয় গুজরাটে(“কোবরাপোষ্ট”ওয়েবসাইট) সেই সংবাদসূত্রে বলা হচ্ছে গোয়ালপাড়া,কোকরাঝাড়,ধুবড়ি,চিরাঙ,বঙ্গাইগাঁও জেলা থেকে হত দরিদ্র বোরো ও উপজাতি সম্প্রদায়ের শিশু কণ্যাদের সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত রয়েছে আর এস এসের দুই শাখা সংগঠন।
সেই সংগঠন দুটি হলো,রাষ্ট্র সেবিকা সমিতি(এটি সঙ্ঘের মহিলা সংগঠন) এবং সেবা ভারতী।সেবার নাম করে গোটা দেশ জুড়ে সঙ্ঘের রাজনৈতিক কর্মসূচী “সাম্প্রদায়িকতা”র প্রসার ও প্রয়োগ ঘটানোই “সেবা ভারতী”উদ্দেশ্য।
সংশ্লিষ্ট সংগঠন দুটির নেত্রীরা আসামের ওই জেলা গুলো থেকে পাঁচ থেকে আট বছরের বয়সের শিশু কণ্যাদের কোনো রকম আইনের তোয়াক্কা না করে গুজরাটে সঙ্ঘের প্রশিক্ষণ শিবিরে নিয়ে যায়।শিক্ষার জন্যে শিশুদের গণহারে অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া নিয়ে কিছু সরকারী বিধিনিষেধ রয়েছে।আসাম ও মণিপুরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইন কানুন গুলো খুব ই কঠোর। এই বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট অভিমত পর্যন্ত রয়েছে।
সঙ্ঘর শাখা সংগঠনগুলি যে ভাবে আসাম থেকে শিশু পাচার করে গুজরাটে নিয়ে এসেছে হিন্দু সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণের জন্যে তা কেবল আসাম বা উত্তর পূর্বাঞ্চলের জন্যে বিশেষ আইন কে ই বুড়ো আঙুল দেখানো হয় নি,গোটা দেশের আইন ব্যবস্থাকেই অবঙ্গা করা হয়েছে।
গোটা বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর সঙ্ঘ নেতৃত্ব নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সংশ্লিষ্ট শিশু কণ্যাদের বাড়ি থেকে তাদের ফটোগ্রাফ নিয়ে আসে বিতর্ক এড়াতে।সেইসব শিশু কণ্যাদের যাতে কোনো অবস্থাতেই চিহ্নিত করতে না পারা যায়,সে জন্যেও যাবতীয় বিধি ব্যবস্থা তারা করে ফেলে।
এই শিশু কণ্যাগুলিকে যে সম্পুর্ণ বেআইনি ভাবে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে সেটা অনুমান করে আসামের শিশু সুরক্ষার সরকারী সংস্থা বিষয় টিতে হস্তক্ষেপ করবার চেষ্টা করে।দিল্লীর রেল স্টেশনে দুই মহিলা সহ শিশু কণ্যাদের আটক পর্যন্ত করা হয়।রাজশক্তি যাদের সহায় কোনো শক্তি কি তাদের আটকাতে পারে?
শিশুদের ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে আর এস এস পরিচালিত স্কুল গুলিতে।অতীতে তথাকথিত প্রাউট দর্শনের নাম করে এমন কিছু স্কুল কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কিছু জায়গায় আনন্দমার্গ চালাতো।নৈহাটিতে এমন একটি একটি স্কুল চলতো সাতের দশকের মাঝামাঝি।জরুরী অবস্থার সময়ে সেই স্কুলটি সরকারী রোষানলে উঠে যায়। উঠে গেলেও পরিবর্তিত নামে একই শিক্ষক ও পরিকাঠামো নিয়ে স্কুল টি আবার নৈহাটিতেই চালু হয়।দ্বিতীয় পর্যায়ের এই কাজটি যাঁরা সংগঠিত করেছিলেন তাঁরা সকলেই এলাকায় গোপনে অতি বাম কর্মধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।সঙ্ঘে “যন্তর মন্তর “কার্যক্রম সম্পর্কে নৈহাটির সেই পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *