ক্ষমতা হস্তান্তরের পয়ষট্টি বছরের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়ক মন্তব্য করেছিলেন;”বিংশ শতাব্দীর ভারত যদি এক অভূতপূর্ব সমাজবিপ্লবের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে থাকে,তবে আজ তার অবস্থান যথার্থই এক প্রতিবিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে। “(দেশহিতৈষী।শারদ সংখ্যা।২০১৩)।বিগত পাঁচ বছরে সেই প্রতিবিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু আর ও প্রলম্বিত হয়ে দেশের প্রবাহমান অসতিত্বকেই একটা বড়ো প্রশ্ন চিহ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের শতকের সবথেকে বড়ো বৈশিষ্ট ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের গৌরবজনক অধ্যায়।আন্তর্জাতিক স্তরে গণতন্ত্রের জন্যে যে লড়াই তা যেমন আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে তেমন ই তার রেশ পরবর্তী কালে প্রায় গোটা বিশ শতক ধরে ভারতের আর্থ,সামাজিক,রাজনৈতিক পরিমন্ডল কে প্রভাবিত করে গেছে।১৯২১ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দাবিতে কমিউনিষ্টদের পেশ করা প্রস্তাব নিছক একটি রাজনৈতিক বিধি ব্যবস্থার অদল বদলের প্রস্তাব ছিল না।
কমিউনিষ্টদের সেই প্রস্তাবে স্বরাজের শ্লোগানকে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তোলবার আহ্বান ছিল।অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষাতেই সেখানে জমিদারতন্ত্রের বিলোপের অঙ্গীকার ছিল।সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্যের অবসানের শপথ ছিল।জাতপাতের অত্যাচার কে নির্মূল করবার প্রতিজ্ঞা ছিল।
গত শতকের জাতীয় আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্ব ঐতিহাসিক আন্দোলনের পাশাপাশি পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা(১৯২২),কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪),মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা(১৯২৯,এই মামলায় ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল অনেকের সাথে মুজফ্ ফর আহমেদের বিরুদ্ধে),মেছুয়াবাজার ষড়যন্ত্র মামলা(……,এই মামলায় ষড়যন্ত্র হয়েছিল প্রমোদ দাশগুপ্ত,সতীশ পাকড়াশী,সুধাংশু দাশগুপ্ত প্রমুখের বিরুদ্ধে।মিথ্যে অভিযোগে সুধাংশু দাশগুপ্তের আন্দামানে দীপান্তর পর্যন্ত হয়েছিল)।
জাতীয় আন্দোলনের এই পর্যায়ে কমিউনিষ্টদের ধারাবাহিক আপোষবিরোধী লড়াই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবীধারার যোদ্ধাদের কমিউনিষ্ট দের সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে।পাঞ্জাবের গদর বীরেরা কমিউনিষ্ট পার্টির ছত্রছায়ায় এসে লড়াই করেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে।সামিল হন বিপ্লবী বীর ভগৎ সিংয়ের সহযোগীরা।বাংলার বিপ্লবীরা।বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীর লড়াকু শ্রমিকেরা।কেরালা ও অন্ধ্রের সামাজ্যবাদ বিরোধী মানুষজনেরা কংগ্রেসের ছত্রছায়ার ভিতরে থেকেও ঘনিষ্ঠ সংযোগ রেখে চলতে শুরু করেন কমিউনিষ্ট দের সঙ্গে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের পর বিশিষ্ট ফরাসি লেখক আঁদ্রে মালরো নেহরু র কাছে জানতে চেয়েছিলেন ,কোন বিষয়টা তখন তাঁর কাছে সব থেকে কঠিন বলে মনে হয়েছে।জবাবে নেহরু বলেছিলেন,ন্যায়ের পথে একটি ন্যায় পরায়ণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা( antimemoirs,trans.terence kilmartin–andre malraux.london.hamish hamilton.page-145.লেখকের মতে ১৯৫৮   নাগাদ নেহরু এই রকম কথা বলেছিলেন)।ধর্মপ্রাণ দেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়ে তোলা র কথাও মালরো কে নেহরু বলেছিলেন।
১৯২১ সালে কমিউনিষ্টরা যে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব জাতীয় কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে পেশ করেছিলেন তার জাগ্রত স্ফুরণ আমরা দেখলাম তেভাগা,পুন্নাপ্রা ভায়ালার,উত্তর মালাবারের ওয়ারলি আদিবাসীদের লড়াই,ত্রিপুরা উপজাতি জনসাধারণের লড়াই,তেলেঙ্গানার ঐতিহাসিক সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামৃর ভিতর লিয়ে।ফরাসী ও পর্তুগীজ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে পন্ডিচেরি ও গোয়াতে কমিউনিষ্টদের লড়াই ,’৪৬এর নৌবিদ্রোহ এবং সর্বোপরি ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত বিপর্যয়ের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়া কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের বোঝাপড়ার ভিতর দিয়েই আমাদের বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে ফরাসি লেখকের কাছে বলা নেহরুর কথা গুলি।
মহাত্মা গান্ধী আর এস এস কর্মীর হাতে শহিদ হওয়ার পর সাম্প্রদায়িকতার কালো দিনে  র অমানিষা আর ও তীব্ব হলো ভারতের বুকে হিন্দু কোড বিল কে কেন্দ্র করে।স্বাধীনতার পয়ষট্টি বছরের প্রেক্ষিতে যে প্রতিবিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুর কথা বলতে গিয়ে জাতীয় কংগ্রসের করাচি অধিবেশনের পটভূমিকার কথা অধ্যাপক পট্টনায়ক আলোচনা করেছিলেন তার কেন্দ্রবিন্দু তে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকে বিগত শতকের নয়ের দশকের প্রথম পর্যায় পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক ক্রম একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয়।তার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা বিগত এক দশকের ও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রবাহমান কাঠামোকে ভেঙে তছনছ করে দেওয়ার নোংরা খেলা কে তীব্র করেছে।ক্ষমতা হস্তান্তরের পরবর্তী সময় থেকে পর্যায় ক্রমে এই ষড়যন্ত্র কি ভাবে ভারতীয় চিন্তা চেতনার পরিমন্ডলকে বিষক্লিষ্ট করে তুলছে -সে দিকে নজর দেওয়াটাও খুবই জরুরি।
ভারতীয় জনজীবনে সংস্কারের উদ্দেশ্য ভাবনা চিন্তা জাতীয় আন্দোলনের অন্তিম লগ্ন থেকেই শুরু হয়ে গেছিল। আজ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির জিগির তুলে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি হিশেবে সাম্প্রদায়িকতার প্রয়োগ ও প্রসার ঘটাতে চায়,তাদের মনে রাখা উচিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভিতরে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের লক্ষে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ রাজের অন্তিম পর্যায়ে।মিতাক্ষরা ও দায়ভাগ ছাড়াও যেসব অজস্র স্থানীয় উপধারা হিন্দুদের ব্যক্তিগত আইন হিশেবে রয়েছে সে গুলির ভিতরে সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে বি এন রাও য়ের নেতৃত্বে ১৯৪১ সালে একটি কমিটি তৈরী হয়েছিল।গোটা দেশ ঘুরে হিন্দুদের উপর একটা সমীক্ষা এই কমিটি করেছিল।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারনে এঁদের কাজটা আর এগোয় নি।
১৯৪৮ সালে বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার জন্যে তৎকালীন আইনমন্ত্রী বি আর আম্বেদকরের নেতংত্ব একটি কমিটি তৈরী হয়।”হিন্দু কোড”হিশেবে পরিচিত হলেও শিখ,বৌদ্ধ,জৈন সহ সকলেই এর আওতায় ছিল।ক্ষমতা হস্তান্তরের শর্ত অনুযায়ী মুসলমান সমাজ নিয়ে আলোচনা হয় নি।
হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির তাদের অবস্থান থেকে এই বিলের চরম বিরোধিতা করবে,তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।কংগ্রেসের ভিতরকার দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক শিবির যে ভাবে আদা জল খেয়ে “হিন্দু কোড বিল” এর বিরোধিতায় নেমেছিল ,তাতে করে বোঝা যায় আজ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির এ হেন সমৃদ্ধির পাটিগণিত টি কি ছিল।
গণপরিষদের সভাপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের “হিন্দু কোড বিল” এর বিরোধিতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের ও ছাপিয়ে গিয়েছিল। আমাদের মনে রাখা দরকার যে,হিন্দু কোড বিলের এই উত্তাপের ভিতরেই ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচন হয়।দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনেই হিন্দু কোড বিল নিয়ে বিতর্কের আঁচ পড়ে।ইতিমধ্যে কংগ্রেস প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে -এই অভিযোগে আম্বেদকর তৈরী করলেন”তপশিলি জাতি সঙ্ঘ”।প্রধানমন্ত্রী নেহরুর বিরুদ্ধে এলাহাবাদে প্রার্থী হলেন “হিন্দু কোড বিল বিরোধী কমিটি”র নেতা প্রভুদত্ত ব্রক্ষ্মচারী।
আজ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের হরেক কিসিমের নেতা নিজেদের ধর্মপ্রাণ দেখাবার জন্যে গেরুয়া থেকে রুদ্রাক্ষ ,এমন কি ত্রিশুল ও নিয়ে থাকেন।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিজাব আর মোনাজাতের অনভ্যস্ত ভঙ্গিমায় ক্যামেরার সামনে পোজ দেন।ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে  ধর্মীয় পোষাকের প্রথম ব্যবহার করেছিলেন এই প্রভু দত্ত ব্রক্ষচারী।তার “হিন্দু কোড বিল বিরোধী কমিটি”পরবর্তী সময়ে নানা কারনে বহু কুখ্যাতি অর্জন করেছিল।
বিজেপির পূর্বসূরী জনসঙ্ঘ,তাদের সহযোগী হিন্দু মহাসভা,রাম রাজ্য পরিষদ ইত্যাদি যাবতীয় হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি ওই নির্বাচনে পন্ডিত নেহরুর বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছিল।নেহরু কিভাবে হিন্দু ঐতিহ্যে হস্তক্ষেপ করছেন তার উদাহরণ দিয়ে তাঁকে প্রকাশ্য বিতর্কে আহ্বান করা হয়েছিল(Delhi police record .sixth instalment,nmml.file no 127)।প্রকাশ্যে হিন্দু কোড বিল নিয়ে নেহরুর বিরোধিতার নাম করে যে অশ্লীলতা প্রভুদত্ত ব্রক্ষচারী এবং স্বামী কর্পাতৃজি করেছিল তা হাল আমলের সঙ্ঘ ঘরাণার নেতাদের সমতুল্য।
হিন্দু কোড বিল কে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিদগ্ধ জনগোষ্ঠীর ভিতরে যে প্রভাব পড়েছিল তা সদ্য স্বাধীন দেশের পক্ষে যেমন মঙ্গল জনক হয় নি,তেমন ই এগুলিকে ঢাল হিশেবে ব্যবহার করে আমূল ভূমি সংস্কার,সামন্ততান্ত্রিক বা আধা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসানে উদ্যোগ নেওয়ার জায়গা গুলো নেহরুর পক্ষে এড়িয়ে যাওয়াটাও অনেকটাই সুবিধাজনক হয়েছিল।প্রকৃতপক্ষে বলা যেতে পারে কংগ্রেম এবং হিন্দু সাম্প্রদায়িক  শক্তির কাজ গুলি সেসময়ে পারস্পরিক শ্রেণিস্বার্থ রক্ষাকারীর ভূমিকাই নিয়েছিল।
ইতিহাসবিদ রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় হিন্দু কোড বিলকে অভিহিত করেছিলেন ;”হিন্দু সভ্যতার মূল চেতনার ই পরিপন্থী”হিশেবে(Rajya sabha debates.9th oct.1954)[পাঠক লক্ষ করবেন রাধাকুমুদের মতো স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ ত ভারতীয় সভ্যতাকে অভিহিত করছন”হিন্দু সভ্যতা “হিশেবে]এই বিতর্কে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন সীতা পরমানন্দ ও পি এম সিংহ( উৎসাহী পাঠক দেখুনRajya sabha Debates 6th &8th dec 1954 এবং Lok Sabha Debates 26th april,1955)
দীর্ঘদিন ধরেই অভিন্ন দেওয়ানী বিধির বিষয় হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের জপ মন্ত্র।স্বাধীন ভারতের বিকাশের ক্ষেত্রে বুর্জোয়া ,জমিদার এবং সামন্ততান্ত্রিক দের স্বার্থরক্ষায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি কিভাবে পরস্পর পরস্পরের সহায়ক হিশেবে কাজ করেছে তা বোঝা যায় হিন্দু কোড বিল নিয়ে সংসদের ভিতরে ও বাইরে হিন্দু মহাসভার সাংসদ নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থানে।তিনি লোকসভায় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কে কটাক্ষ করে হিন্দু বিবাহ আইন ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন(Lok sabha Debates.26th april.1955)
কমিউনিষ্টরা আইনগুলিকে যথেষ্ট পরিবর্তন সূচক না মনে করেও সেগুলিকে স্বাগত জানিয়েছিল।বি সি দাস এটিকে,সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে নেহাৎ হালকা,নরমপন্থী প্রয়াস হিশেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। আইন চালু করতে কেন্দ্রের গরিমসির সমালোচনা করে ভূপেশ গুপ্ত বলেছিলেন,কংগ্রেস পার্টি নানা বিষয়েই রিপ ভ্যান উইঙ্কলের ঢঙে কাজ করছে(Rajya Sabha Debates.8th dec.1955)।
শ্রমিক,কৃষক মেহনতী জনতার সার্বিক কল্যাণের দিক টি এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির কর্মকান্ডকে খানিকটা ঢাল হিশেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন নি নেহরু।ফলে দারিদ্র,শোষণের অবসানের প্রশ্নটি অমিমাংসিত ই থেকে গেল।জাতীয় আন্দোলনের সময়ে মানুষের কাছে স্বাধীনতার যথার্থ অর্থ ছিল জমি,খাদ্য,ন্যায্য মজুরি,শিক্ষা,আবাসন,কর্মসংস্থান,চিকিৎসা র সুব্যবস্থা।জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক হিংসার সামাজিক অভিশাপ থেকে মুক্তি মানুষ চেয়েছিল।গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সাংস্কৃতিক আকাঙ্খাপূরণ মানুষ চেয়েছিল।
          গ্রাম ভারতের পরিবর্তন হীনতার প্রতি একটা কী প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল নেহরুর?বুর্জোয়া ভূস্বামী অর্থনীতির কারণে যে দেশের স্বাধীনতার সাত দশক পরেও কৃষক সমাজের একটা বড়ো অংশ ই গরিব কৃষক ক্ষেত মজুর,তাঁদের জন্যে নেহরু থেকে শাস্ত্রী,ইন্দিরা,দেশাই ,রাজীব, ভি পি,বাজপেয়ী হয়ে আজকের মোদি কি করলেন?১৯৪০ দশকের গ্রাম ভারতের সমীক্ষার (CWMG VOL 89.PAGE -312,313)থেকে আজকের গ্রামীণ ভারতের অদল বদল কতোটুকু ঘটেছে?জাতীয়তাবাদীরা এবং জাতীয়তাবাদের নামে উগ্রতায় যারা বিশ্বাস করেন,তারা এই ধারাবাহিকতা কে অচলাবস্থা হিশেবে মনে করলেও সেই জগদ্দল পাথর সরাবার জন্যে তারা এতোটুকু প্রয়াসী হয় নি।
১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার  সময়ে কর্মসূচির তালিকায় কৃষি সংস্কারের যে ভাবনা ছিল তা দেশের কৃষি র বাজার বহুজাতিকদের কাছে খুলে দেওয়ার ভিতর দিয়ে পবিত্র কর্তব্য পালন করেছেন নরসিংহ রাও থেকে নরেন্দ্র মোদি।জমির খাজনা তুলে লেওয়ার যে ভাবনা জাতীয় কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে নিয়েছিল আজ ও তা অলীক স্বপ্ন ই থেকে গেছে।সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারণের যে অঙ্গীকার জাতীয় কংগ্রেস আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয় নি।পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন বৃহৎ সেচ ও ক্ষুদ্র সেচের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল ভাকরা নাঙাল ইত্যাদির ভিতর দিয়েও তার ধারে কাছে পৌঁছোয়নি পাঞ্জাবের মতো রাজ্যও।
বাম জামানায় এ রাজ্যে যে আমূল ভূমি সংস্কার হয়েছে তার অনুসরণ ত্রিপুরা আর কেরল ব্যাতীত আর কোনো রাজ্যে পড়ে নি।কৃষি অর্থনীতিতে বৈষম্য নেহরুর আমলে যা ছিল আজ মোদির আমলে তার থেকে কমে নি।তৎকালীন যুক্তপ্রদেশে(আজকের উত্তরপ্রদেশে)।ক্ষমতা হস্তান্তরের অব্যবহিত পরেই যুক্তপ্রদেশে জমিদারতন্ত্র “মোটরানা”(জমিদারের নোতুন কেনা মোটর গাড়ির দাম মেটাবার জন্য),”হাথিয়ানা”(জমিদারের নোতুন কেনা হাতির দাম মেটাবার জন্যে)[THE Questions of language (1937)in neheru,the university of india :collected writings 1937to 1940 .london.lindsay drummod.1941.page232-233]
ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মালাবারের একটি পত্রিকা (সাপ্তাহিক)মালাবারের গ্রামাঞ্চলের যে চিত্র প্রকাশ করে তাতে দেখা যাচ্ছে যার হাতি ছিল তাদের খোরাক হিশেবে পঁচিশ হাজার কিলোগ্রাম ধানের প্রয়োজন পড়তো।অথচ হাতির দেখভালের জন্যে নিয়োজিত লোকেদের গোটা সপ্তাহে মাত্র তিন দিনের আহার বরাদ্দ ছিল।(Food Situation Getting Worse in Malabar by Chitra Bhanu.swatantra.29th july.1947)
নেহরু তাঁর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশভাগের ফলে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষি ক্ষেত্রটির উপর জোর দিলেন।নেহরু তাঁর দল কে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ গড়বার লক্ষে ব্রতী করবার চেষ্টা করেছিলেন দলের শ্রেণি ভাবনায় কোনো পরিবর্তন না এনে।
বুর্জোয়া আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোকে অক্ষুন্ন রেখে,গান্ধীজী নির্দেশিত ক্ষমতা ও অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণের পথে এতোটুকু না হেঁটে ১৯৫৪সালে দেশের বেকার সমস্যার বিষয়টি সমীক্ষার নির্দেশ নেহরু দিলেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট কে।এ নিয়ে একটি টীকা তৈরী করলেন প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশ।সেটি নেহরুকে এতোটাই মুগ্ধ করলো যে তিনি দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনা র খসড়া তৈরীর ভার তুলে দিলেন আই এস আই কে।
মহালনবিশ মডেল সম্পর্কে বিশ্ববিশ্রুত সমাজবিজ্ঞানী জে বি এস হলডেন বলেছিলেন;”নৈরাশ্যবাদী কোনো মানুষ যদি বলেন,পাকিস্থান বা অন্য কোনো দেশের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হস্তক্ষেপে এই পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা ১৫শতাংশ,সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিনের হস্তক্ষেপে এর ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা ১০শতাংশ,সিভিল পরিষেবার পিছিয়ে -থাকা ঐতিহ্য আর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ জনিত বাধায় এর ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ ,আর হিন্দু ঐতিহ্যজনিত বাধায় এর ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা ৫শতাংশ ;-তবুও তার পরেও এর সফল হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ।সেই সাফল্য তামাম পৃথিবীর ইতিহাসকেই ভালোর দিকে বদলে দেবে(Jawaharlal Neheru:A Biography vol-2 .1947-1957.page 305-306)এই জায়গা থেকে কেন নেহরুর দল ই সরে এলো নরসিংহ রাওয়ের আমলে মনমোহন সিংয়ের পরামর্শে ইতিহাস হয়তো একদিন তার জবাব দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *