মেজ গাম্বিল কিন্তু মানুষটার নাম নয়।বাপ,মা সাধ করে নাম রেখেছিল গোবর্ধন।ওরা প্রথমটে ভাই গাম্বিল ফলের মতো বেশ ট্যাপা টোপা দেখতে ছিল বলে পাড়ার লোক আড়ালে আদর করে নাম দিয়েছিল বড়ো গাম্বিল,মেজো গাম্বিল আর সেজো গাম্বিল।পরে আর ও তিন তিনটে ভাই থাকা স্বত্ত্বেও তাদের কিন্তু “গাম্বিল”নাম জোটে নি।কেন জোটে নি ,সেকথাও কেউ ই বলতে পারে না।তবে গোবর্ধনের ভাইরা কালের গতিতে পিতৃদত্ত নাম হারিয়েই ফেলেছিল।যদিও লোকে প্রকাশ্যে “গাম্বিলদার”বলে না ডেকে বড়দা,মেজদা,সেজদাই বলতো।আড়ালে অবশ্য ই “গাম্বিল”।
সেকালে রেলের চাকরি আজকের মতো দুর্লভ ছিল না।বাড়ির কেউ কোনো একটা ছোটো খাটো পোষ্টে একবার ঢুকতে পারলে ভাই,ভাতিজাদের দুটো একটা কে ঠিক সাইজ মতো সেঁধিয়ে দেওয়া যেতো।বড়োগাম্বিল প্রথম ঢুকেছিলো কাঁচড়াপাড়া (গাম্বিলদের একান্ত নিজস্ব এবং অননুকরণীয় উচ্চারণে “কায়লাপাড়া”!) ওয়ার্কশপে।বড়োর হাত ধরে মেজো,মেজো পায়ে পায়ে সেজো।পরের ভাই গুলো যেহেতু “গাম্বিল”নয়,তাই তারা আর রেল মুখো হয় নি।
রেলের পাশ পেতো বলে গাম্বিলরা পালা করে ফির বছর বেড়াতে যেতো।তবে বেড়াবার ভূগোলটা দেওঘর আর বেণারসেই(ওদের উচ্টারণে”ব্যানারস”)সীমাবদ্ধ থাকতো।এক আধ বার হরিদ্বার গেলেও গিয়ে থাকতে পারে।ওদের বেড়াতে যাওয়ার উদ্যোগ দেখবার মতো ছিল।সব কিছু বাঁধা ছাদার পড় হয়তো ওদের কোনো স্কুল পড়ুয়া(স্কুলের গন্ডির বাইরে ওদের বাড়ির ছেলেরা বেশি দূর এগোয় নি,মেয়েরা যে কজন হাই স্কুলে পদচারণা করেছে ,তা হাতে গুনে বলা যায়।)ছেলের ইচ্ছে হলো দূর পাল্লার ট্রেনে যাওয়ার সময় একটু কেতা দেখিয়ে বই পড়তে পড়তে যাওয়া।
তা বাড়িতে বই কোথায়?নিদেন পক্ষে পাঁজিও যে বাড়িতে অমিল।চেয়ে চিন্তে পাশের বাড়ি থেকে একটা পুরনো শারদীয়া জোগার করা গেল।ততোক্ষণে তো বাঁধাছাদা সাড়া।অগত্যা কোনো একটা ব্যাগের ভিতরে গায়ের জোরে ঠুসে দেওয়া হলো।বিগ শপারের যুগ তখনো আসে নি।ফলে ব্যাগের ভিতর থেকে সেই শারদ সংখ্যার পশ্চাৎদেশ উঁকি দিতে থাকলো মেজ গাম্বিল যখন “রিস্ কা”য় চড়ে ডে(“দে”নয়)ওঘরের উদ্দশে ইষ্টিশন মুখো পাড়ি জমালো।
গাম্বিলের পো ম্যাগাজিন টা কতোখানি পড়তো জানা নেই,তবে যে বাড়ি থেকে সেটিকে নিয়ে যাওয়া হতো সে বাড়িতে সেটি আর ফেরত আসতো না।কারণ,মেজ গাম্বিল তখন রিটিয়ার করে বেকার ছেলেদের জন্যে বড়ো রাস্তার উপরে গুমটি বসিয়ে স্টেশেনারি জিনিষের ছোটখাট একটা দোকান দিয়ে বসেছে।নামেই ছেলেদের জন্যে দোকান।ছেলেরা তখন হান্ডু বাজি তে ব্যস্ত।বড় ছেলে প্রেম করে তো মেজ ছেলে মামার বাড়িতে পড়তে আসা মক্ষী রাণীকে নিয়ে ‘ভাগলবা’।
অগত্যা বেশির ভাগ দিন ই দোকান সামলায় মেজ গাম্বিল।তারা তিন ভাই রেলে চাকরি করলেও জার ব্যবসা কুম্ভকারগিরি কিন্তু তখন ও ছাড়ে নি।আমি তাদের বাড়িতে পোন পুড়োতে না দেখলেও আমার দিদি গাম্বিলবাড়ির পোন পোড়ানোর সাক্ষী আছে।দেওয়ালীর আগে মাটির হাঁড়ি কুঁড়ি ,প্রদীপ বানিয়ে গাম্বিলদের বাড়ির পরের জেনারেশন তো এই সেদিন পর্যন্ত বসতো।তবে সেজ গাম্বিলের ছেলে তেমন একটা থাকতো না।আজকের স্মরণজিৎয়ীয় ভাষায় তার বেশ “ঘ্যাম”ছিল।কারণ, অনেক বোনের পর মায়ের কোল আলো করা ছেলে কি না সে।
গাম্বিলদের বাড়ির ছেলেরা “ঘেঁটু”বের করতো।”ঘেঁটু যায়,ঘোষপাড়া।কার ঘেঁটু কতদূর যায়?লালবাগান ছায়ড়ে(গাম্বিলীয় উচ্চারণে!)যায়।লালবাগানে হুমোহুমি,শীতে বুড়ি ঝুমোঝুমি।……”শীতের শুরুতে পাড়ার কচিকাচা রা তারের দোলনায় করে ঘেঁটু কে নিয়ে বের হতো।দোলনাটা সাজাতো খানিকটা ঝুলনের মতো করে।ঘাসের চাঙর কেটে দোলনার ভিতরে গালচে করা হতো।তার ভিতর থাকতো হরেক কিসিমের পুতুল।ঠাকোর দেবতার মূর্তিও এক আধটা থাকতো বই কি।
কুমোর বাড়ির ছেলেদের ভিতরেই ঘেঁটু নিয়ে উৎসাহটা ছিল বেশি।গোটা সপ্তা টা ধরে সেই ঘেঁটু নিয়ে তারা গেরস্তর ঘরে ঘরে ঘেঁটুর গান শোনাতো।শেষ দিনে যে যার সাধ্য মতো সিধে দিতো।তাই দিয়ে চলতো ঘেঁটু পূজারীদের খ্যাঁটন।ঘেঁটু কে ঘিরে আমার আর দিদির উৎসাহ ও কিছু কম ছিল না।কারণ,ঘেঁটুর দল এলে শরৎচন্দ্রের মেজদার আদলে আমরা ঘেঁটু দেখতে যাওয়ার সাময়িক ছুটি পেতাম পড়ার থেকে।
তবে “ডেওঘর”বেড়াতে যাওয়ার সময়ে গাম্বিলের ছেলের চেয়ে নিয়ে যাওয়া পূজা বার্ষিকী যথাস্থানে ফেরত আসার বদলে ঠাঁই পেতো মেজ গাম্বিলের গুমটির দোকানে।জিনিষ মোড়ানোর কাজে লাগতো।কেউ যদি একটু বেশি কাগজ চাইতো,মেজ গাম্বিল সটান উত্তর দিতো;অতো অল্প জিনিষে এর থেকে বেশি কাগজ দিলে পড়তায় পোষাবে না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *