দেশভাগের পণ্যায়ন ( বই আলোচনা)
গৌতম রায়
দেশভাগের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী প্রজন্ম এখন আর জীবিত নেই ।পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দেশভাগের যন্ত্রণা কি হৃদয় নিঙড়ানো একটা অনুভূতি হয়ে এখনো ধরা দেয়? নাকি তাঁদের কাছে দেশভাগ এখন একটা ভালো কমোডিটি হয়ে উঠেছে? পাবলিক খাওয়ানোর একটা বেশ জুৎসই উপকরণ হয়ে দেখা দিচ্ছে বাঙালি জীবনের সবথেকে হৃদয় বিদারক যন্ত্রণাটি? তনভীর মোকাম্মেলের দেশভাগ নিয়ে তথ্যচিত্রে নদিয়ার কুপার্স ক্যাম্পের দম্পতি অবলীলায় নোয়াখালি দাঙ্গার দায় একতরফা চাপিয়ে দেয় মুসলমানেদের উপর।মুসলিম লীগ যেন মুসলমানদের একমাত্র সংগঠন , লীগ নেতাদের ভাবনাই প্রাধান্য পায়।অথচ সেই দাঙ্গার সবথেকে বড়ো সংগঠক গোলাম সারওয়ার যে লীগ থেকে দাঙ্গার অনেক আগেই বহিস্কৃত হয়েছিল, সেই কথা কেউ লেখেন ই না।বলেন ও না। দেশভাগ যে কেবল হিন্দু বাঙালির জীবনকেই বিধ্বস্ত করে নি, মুসলমান বাঙালির জীবনকেও তছনছ করেছিল ,দেশভাগ ই যে সালাম বরকতদের শাহাদাতের আসল কারন, দেশভাগের জন্যেই যে হানাদার পাক বাহিনীর হাতে শহিদ হয় তিরিশ লক্ষ বাঙালি– এই ঊচ্চারণ ও এই বাংলায় কখনো শোনা যায় না।ঋত্ত্বিকের ছবি ঘিরে আবেগ কাজ করলেও হাসান আজিজুল হকের ‘ আগুনপাখি’ , মুসলমান পরিবারের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা- একবার ও আলোচনায় আসে না।
                        ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে’ তাই মুসলমান ছেলের সাথে হিন্দু মেয়ের আশনাইয়ের বস্তাপচা গল্পের আড়ালে প্রেমে ব্যর্থ মুসলমান প্রেমিকের অভিব্যক্তি ই বড়ো হয়ে উঠতে দেখি আমরা।মুসলমানের সঙ্গে প্রেমের দায়ে হিন্দু মেয়ের সঙ্কট এই আখ্যানে তীব্রতা পায় মুসলিম বিদ্বেষের একটা অদ্ভূত আবর্তে।মুসলমানের সঙ্গে প্রেমে ব্যর্থতা তে হিন্দুমেয়ের করুন পরিণতি, তার দায় কেন একটি সম্প্রদায়ের উপর পড়বে? একটি মেয়ে বা ছেলে প্রেমে পড়লে প্রেমকে বড়ো করে দেখে? না ,হিন্দুত্ব কিংবা মুসলমানত্ব তার কাছে বড়ো হয়ে ওঠে?
                 বিভাগপূর্ব ভারতে ,খুলনা জেলার প্রেক্ষিত কে যদি একটু ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দেখি, তাহলে একদম গ্রামীণ পরিমন্ডলে, বিভাজনের এক দুই দশক আগে পারস্পরিক বিদ্বেষের চোরাস্রোত আমরা প্রায় দেখি ই না।লেখক এই আখ্যানে বিদ্বেষের চোরা স্রোতে প্রেমের জয়গান গাইতে গিয়ে ,মানুষের মনে সাম্প্রদায়িক হিংসাকে উসকে যে দেবেন না– তা একবার ও মনে হয় নি । অবিভক্ত বাংলার প্রেক্ষাপট আর পূর্বপাকিস্থানের সামাজিক বিন্যাস, ভাষা আন্দোলন , মুক্তিযুদ্ধ – এইপর্যায় গুলি আলোচনার ক্ষেত্রে লেখকের মননশীলতার অপরিপক্কতা , তথ্যগত ত্রুটি নোতুন প্রজন্ম, যাঁরা রাজনৈতিক বা সামাজিক ইতিহাসের এসব পর্যায় চর্চার খুব একটা সুযোগ পান নি, তাঁদের কাছে একটা ভুল ধারণা তৈরি করবে।আপাতভাবে ইন্দুবালার জীবনসংগ্রাম, ফেলে আসা দেশের জন্যে একটা উপচে পড়া আবেগ, কারো অধিনস্থ হয়ে না থাকার স্বাধীনচেতা মানসিকতা, কর্তব্যপরায়নতা , অথচ সেই দায়িত্ব পালনের ভিতরেও একটা গভীর নিরাসক্তি– এইসব ইতিবাচক উপাদানগুলি ই দেশভাগ আর নকশাল আন্দোলনের পর্যায়ক্রম ঘিরে উদ্ভুতুরে উপস্থাপনা র ভিতর দিয়ে যেটা তৈরি করছে, সেটা হল ইতিহাসের অসত্য , খানিকটা বিকৃত উপস্থাপন।
                           মহান মুক্তিযুদ্ধের কালে খোন্দকার মোশতাক, যে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রধান ষড়যন্ত্রী ছিল, পাকিস্থানের সঙ্গে কনফেডারেশন তৈরির উদ্দেশে কলকাতাস্থ আমেরিকান কনসুলেটের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে রত ছিল।তাই বলে কলকাতা শহরে কোনো মুক্তিযোদ্ধার গতিবিধির উপর পাকিস্থানী চরেরা নজরদারি করছিল, এমন কথা বলা মানে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতের যে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা- গোটা পর্যায়ক্রমের মর্যাদাকেই ধুলোয় লুটিয়ে দেওয়া।ইন্দুবালার বাড়িতে আসা , তাঁর খুলনাতে ফেলে আসা বন্ধুর সংলাপের ভিতরে পাকিস্থানের চর , কলকাতায় মুক্তিযোদ্ধাদের উপর নজরদারি করছে, এই কথা গোটা পর্যায়ক্রমেমের উপর চরম অমর্যাদার পরিচায়ক।
                  নিছক ফেসবুকের প্রচারের ঢক্কানিনাদে এই ধরণের অচল আধুলি , মানুষকে ধোঁকা দিয়ে চালানোর চেষ্টা হলে , বইয়ের হয়তো সঙ্করণের পর সঙ্করণের ( ডি ও পি সঙ্করণ নয় তো?) পূরচার চলবে।তা বলে এই ধরণের বিকৃত তথ্য সম্প্রীতির নামে চালালে, এই উদ্দেশের আড়ালের যে অভিপ্রায় থাকে, সেটাই তীব্র হয়ে উঠবে।আর সেই তীব্রতাই বিষে নীল করবে মানুষকে।

               ইন্দুবালা ভাতের হোটেল
                  কল্লোল লাহিড়ি
                    সুপ্রকাশ
                      ২০০ টাকা।
     
     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *