ভারতের জাতীয় আন্দোলনে মুসলমান নারীর অবদান
গৌতম রায়
উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলায় মুসলমান সমাজের ভিতর যে সার্বিক জাগরণ ঘটতে থাকে, তা অত্যন্ত ধীরে হলেও নারীর স্বাধিকারের দাবিকে সামনে তুলে আনতে শুরু করে।নবাব আবদুল লতিফ ১৮৬৮ সালে ‘ বেঙ্গল সোশাল সায়ন্স অ্যাসোসিয়েশন ‘ তৈরি করেছিলেন।এই সভার ভিতর দিয়ে সামগ্রিক ভাবে সমুসলমান সমাজের দুরবস্থার কথা তিনি তুলে ধরতে শুরু করেন।
নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী, বেগম রোকেয়ারা নারীর স্বাধিকারের প্রশ্ন তুলে ধরেছিলেন তীব্র ভাবে।সেই ধারার সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল।এই পর্যায় গুলি চর্চার ক্ষেত্রে এমন একটা লিঙ্গ ভিত্তিক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় যে, সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের এই ধারণা জন্মায়, মেয়েদের উন্নতির জন্যে মুসলমান সমাজের পুরুষেরা আদৌ উৎসাহী ছিলেন না।ইতিহাসগত ভাবে এই ধারণাটি ভুল।
সৈয়দ আমির আলী বহু সংগঠন নিজের হাতে তৈরি করে , সেই সংগঠনগুলির মাধ্যমে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।তাঁর অবদান ভারতের সমাজে রামমোহন, বিদ্যাসাগরের থেকে কোনো অংশে কম ছিল না।’ ন্রাশানাল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন ‘ এবং ‘ সেন্ট্রাল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ নামক দুটি সংস্থার মাধ্যমে তিনি বাংলায় নারী জাগরণে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করলেও , এপার বাংলায় বাংলার সামাজিক ইতিহাস যাঁরা রচনা করেছেন, তাঁরা কার্যত আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলির মতো ক্ষণজন্মা মানুষদের ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুলে থাকেন।
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের ভারতবর্ষের বুক থেকে বিতাড়িত এদেশের মানুষের দ্বারা দেশ পরিচালনার ভাবনায় সামগ্রিক মুসলমান সমাজের অবদান নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু আলাপ আলোচনা হয়েছে । ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের মুসলমান সমাজের সামগ্রিক অবদান ফিরে সুসংবদ্ধ গবেষণা বাংলায় প্রায় হয়নি বলা যায়। ইংরেজি ভাষায় কিছু গবেষণা হয়েছে ।আসগার আলী ইঞ্জিনিয়ার, আমিরুল ইসলামের মতো প্রাজ্ঞজন , বেশ কিছু আলোচনা করেছেন। বাংলাতে শান্তিময় রায় বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোকপাত করেন। তাঁর দেখানো পথ ধরে ,পরবর্তীকালে গবেষণার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে ব্রিটিশ বিরোধী মুসলমান নারী সমাজের অবদান ঘিরে সেভাবে সুনির্দিষ্ট আলাপ-আলোচনা প্রায় নেই ই। সময়ের নিরিখে ,ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার নিরিখে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুসলমান নারী সমাজের অবদান ঘিরে নির্মোহ আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। উনিশ এবং বিশ শতকে মুসলমান জীবনেই কেবলমাত্র নয় ,সামগ্রিকভাবে দেশের হিন্দু -মুসলমান- খ্রিস্টান শিখদের জীবনে, ব্রিটিশবিরোধী মানসিকতার পাশাপাশি, নারীর স্বাধিকারের প্রশ্নটি কে ও মুসলমান সমাজের একটি বড় অংশ তুলে ধরেছিল। তাঁদের ভিতরে মুসলমান মেয়েরা উল্লেখযোগ্যভাবে ছিলেন ।নবাব ফয়জুন্নেছা থেকে বেগম রোকেয়া ,সুফিয়া কামাল ,যাঁদের উত্তরাধিকার বহন করেছেন, তাঁদের নিয়ে বাংলা ভাষায় কোনো আলোচনা হয় নি বলে যেতে পারে।
তাই এই প্রেক্ষিতে আমাদের প্রথমে স্মরণ করতে হয় বীরভূমের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার ঘরের কন্যা লাল বিবিকে।১৭৩৫ সালের লালবিবি বীরভূমের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। মা চাঁদবিবি আর বাবা বাহরাম খানের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে, অভিজাত মুসলমান পরিবারের নানা আঙ্গিকের ভেতর দিয়ে, তিনি বড় হয়ে উঠতে থাকেন।
বাঙালি মুসলমান সমাজের, এমনকি হিন্দুসমাজে নারী শিক্ষা তখন ছিল প্রায় এক নিষিদ্ধ ।উনিশ শতকের নবজাগরণের প্রভাব বাঙালি হিন্দুদের ভেতরে শিক্ষার বিস্তার ঘটতে শুরু করেছিল । লাল বিবির জন্মলগ্নে, উনিশ শতকের এই প্রেক্ষিত প্রবাহিত হওয়ার অনেক আগেই আঠারো শতকে ধীরে ধীরে কয়েকটি পরিবারে আধুনিকতার প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল। নিজেদের পারিবারিক পরিমণ্ডলে ভেতরে লালবিবি কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা লাভের দুর্লভ সুযোগ পেয়েছিলেন ।লালবিবি পারিবারিক পরিমণ্ডলের ভেতরে যে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন, সেই প্রাথমিক শিক্ষা কিন্তু কেবলমাত্র ধর্মীয় পরিমণ্ডলে আবদ্ধ শিক্ষা নয়।
সেই সময়ের নিরিখে আধুনিক চিন্তা ভাবনার নির্যাস লালবিবি আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডলে সৌজন্যে। এক্ষেত্রে সমকালীন ইউরোপের ভাবধারার একটি প্রভাব লালবিবির বাবা মায়ের উপরে ছিল।সেই প্রভাবে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতার থাকলেও , প্রভাবটির সবিশেষ গুরুত্ব ও ছিল।বাহারাম খান, চাঁদবিবি প্রাণ ঢেলে শিখিয়েছিলেন তাঁদের কন্যাকে। তাছাড়া লালবিবির এই পারিবারিক পরিমণ্ডলে তৎকালীন সময়ের আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ রকম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের পরিবারের আর একজন নারী ।তিনি চাঁপাবিবি নামে পরিচিত ছিলেন। লালবিবি তাঁকে ‘বউদাদি’ বলে ডাকতেন।
পারিবারিক পরিমণ্ডলে ভেতরেই আরবি ,ফারসি ,উর্দু — এই তিনটি ভাষাতেই পারদর্শী হয়ে ওঠেন লালবিবি।শোনা যায় তিনি নাকি তিনটি ভাষাতেই বিরামহীন ভাবে কথা বলে যেতে পারতেন। চাঁপাবিবি বা বউদাদির কাছ থেকে এই ভাষা শিক্ষার প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন লালবিবি। তাঁর আরবি ভাষায় ব্যুৎপত্তি সমকালীন বাংলায় যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হয়ে উঠেছিল।
বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রামে নিজস্ব নানা ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে ,প্রথাগত কোন শিক্ষার সুযোগ না পেয়ে, চাঁপাবিবি কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে বেশ কিছুটা দক্ষতা অর্জন করেছিলেন ।সেই সময়ের নিরিখে, একটি অভিজাত মুসলমান পরিবারের সদস্য হয়ে ,যেভাবে আধুনিক শিক্ষা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্বন্ধে নিজেকে পারদর্শী করে তুলতে পেরেছিলেন চাঁপাবিবি ,তা তিনি মন প্রাণ দিয়ে শিখিয়েছিলেন লালবিবিকে।
লালবিবির স্বামী ,রাজা আসাদুজ্জামান খান বীরভূমের একজন সম্ভ্রান্ত জমিদার ছিলেন। তাঁর সময়কালটা পলাশীর যুদ্ধের অব্যবহিত পরে বিস্তৃত ছিল। ব্রিটিশ রাজশক্তির বিকাশ একদিক থেকে ঘটছে এবং সেই রাজশক্তির ভেতরে নিজের নানা ধরনের কুটকৌশল প্রয়োগ করতে চেষ্টা করে চলেছেন মনি বেগম। তিনি ছিলেন মীরজাফরের প্রধান পত্নী।ভোগ বিলাসে মত্ত এবং ইন্দ্রিয় সুখের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ যুক্ত এই মহিলাকে ঘিরে আজও মুর্শিদাবাদের নানা ধরনের গল্প শুনতে পাওয়া যায় ।
নিজের জীবনকে সুখী করার জন্য ইংরেজদের সাথে নানা ধরনের বোঝাপড়া করেছিলেন এই মণি বেগম।নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মনি বেগম যেভাবে একের পর এক জায়গীর ইংরেজদের হাতে তুলে দিতে শুরু করলেন মণি বেগম।এই ঘটনা র ফলশ্রুতিতে বাংলার স্থানীয় জমিদার এবং রাজাদের ভিতরে প্রবল অসন্তোষ ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিতে শুরু করল ।সেই অসন্তোষ থেকে শুরু হলো, ব্রিটিশ বিরোধী একটা তীব্র মানসিকতা ।
এই পর্যায়ে বাংলার বহু স্থানীয় জমিদার এবং ছোট ছোট রাজা কার্যত একক প্রচেষ্টায় ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ব্রিটিশ বিদ্বেষ কে দাঙ্গা বাধানোর ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যবহারের প্রবণতাও ব্রিটিশের হয়ে কাজ করা একাংশের স্থানীয় জমিদারদের ভিতরে ছিল। তবে ধীরে ধীরে স্থানীয় জমিদার আর রাজাদের ভেতরে যে প্রবল ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতা তৈরি হচ্ছিল, সেটি ব্রিটিশের পক্ষে আদর্শ কোনো পরিস্থিতি তৈরি করছিল না ।
লালবিবি র স্বামী রাজা আসাদুজ্জামানের সঙ্গে ব্রিটিশ নানা ধরনের বেইমানি করতে শুরু করে। আসাদুজ্জামানের ভেতরে প্রবল স্বদেশ প্রেম এবং বিদেশি ইংরেজদের প্রতি ঘৃণা ছিল । স্বামীর এই ব্রিটিশ বিরোধী শিক্ষা থেকে, স্বাধীনচেতা মানসিকতার বিকাশ লালবিবির ভিতরে ঘটেছিল। সেই মানসিকতা থেকেই স্বামীর ব্রিটিশ বিরোধী নেতা মনোভাবকে কেবল উপলব্ধি নয় ,আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন লালবিবি।
এই প্রেক্ষিত টিকে মাথায় রেখেই আমাদের জাতীয় আন্দোলনের একদম প্রথম পর্যায়ে অন্তঃপুর থেকে যে ব্রিটিশ বিরোধী সুরটি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, সেই সুরের প্রেক্ষাপটটিকে আমাদের বোঝা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *