দলবদলের রাজনীতি ছয়ের দশকের পর পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেভাবে দেখেন নি।আশু ঘোষ ছয়ের দশকে দল বদলের যে সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গের পর কায়েম ঈরেছিলেন, সত্তর উত্তর প্রজন্ম তারসঙ্গে কখনোই পরিচিত ছিল না।এই প্রজন্মের সঙ্গে আশু ঘোষ সংস্কৃতির পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মুকুল রায়।তিনি এখন দল বদলে বিজেপি নেতা হয়ে গেলেও, তাঁর তৈরি করে দেওয়া দলবদলু সংস্কৃতি এখন কেন্দ্রের শাসক বিজেপি আর রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যত জপমন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
                        রাজনীতি থেকে রাজনীতিকে বিযুক্ত করে, রাজনীতির অঙ্গন কে সুবিধাবাদের অগাধ বিচরণ ভূমি হিশেবে পরিণত করবার যে হিন্দি বলয়ের সংস্কৃতি ছিল, সেটাই এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মূল স্রোতের একটা অংশের অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।গত দশ বছরে এই রাজ্যে কেন্দ্র এবং রাজ্যের দুই শাসকের দ্বৈরথে কার্যত হাটে হাঁস , মুরগি কেনার মতো হয়ে গেছে রাজনীতির কর্মী, সমর্থক থেকে শুরু করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বেচাকেনার বিষয়টি।কোনো আদর্শের তাগিদে যে এইসব।লোকেরা কখনোই রাজনীতির পরিমন্ডলে আসেন নি, এটা বোঝা গেলেও, এই উপলব্ধিটা সাধারণ মানুষের কাছে কতোটা ধরা দিচ্ছে, তা নিয়ে অবশ্য ঘোরতর সংশয় থেকেই যায়।
                     যেকোনো রকমের ভোট এগিয়ে এলেই পশ্চিমবঙ্গে এখন দলবদলের হিরিক পড়ে যায়।একসময়ে মরশুমের শুরুতে ময়দানে যেমন দলবদলের ও মরশুম পড়তো, তেমনি ই রাজ্য আর কেন্দ্রের শাসক দলগুলির ভিতরে, দল বদলের বেশ একটা উৎসবীমেজাজ আমরা দেখতে পাই।মজার কথা হল, এইসব দলবদলু লোকজন ভোটে অবতীর্ণ হয়।অনেকক্ষেত্রে জিতেও যায়।এই জেতা র বিষয়টি অবশ্য এখন আর খুব একটা নেতার বা তাঁর দলের নীতি, আদর্শের দিকগুলি বিচার করে হয় কি না, তা নিয়ে খোদ ভোটারদের ভিতরেই রীতিমতো সন্দেহ আছে।
                    গত বিধানসভা ভোটের আগে পরে এই বদলের একটা বড় হিরিক আমরা দেখেছি।নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের রাজ্যের শাসকদল কিভাবে নিজেদের দলে সংযুক্ত করছেন, সেটাও আমরা দেখেছি।গত ২০১৬ র বিধানসভা নির্বাচনের আগে যে মানস ভুইঞা কার্যত ডাঃ সূর্যকান্ত মিশ্রের ছায়াসঙ্গীর মতো আচরণ করে গেলেন, সেই মানুষ টিই ভোটের পর, তাঁর নিজের দল জাতীয় কংগ্রেস ছেড়ে , রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের শিবিরে চলে গেলেন।অবশ্য খানিকটা শিষ্টাচার মেনে তিনি কংগ্রেস বিধায়ক হিশেবে ইস্তফা দেন বা দিতে বাধ্য হন।আর শাসক তৃণমূল মানসবাবুকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে দেয়।
                  যে নীতিহীনতাকে মানস ভুঁইঞা রাজনীতি হিশেবে উপস্থাপিত করতে চাইলেন, সেটাই এখন কেন্দ্র বা জ্যের শাসক দলের একমাত্র নীতিতে পরিণত হয়েছে।অতি সম্প্রতি বাম আমলে, যে  বর্ধমান পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন আইনুল হক, তিনি বিজেপি ঘুরে ,রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।যে আইনুল হককে সাড়ম্বরে তৃণমূল কংগ্রেস আজ তাঁদের দলের ভিতরে অন্তর্ভূক্ত করে নিলেন, সেই আইনুল হকের কর্মকান্ডকেই ২০১১ সালে বর্ধমান শহর থেকে তৎকালীন শিল্প বাণিজ্য মন্ত্রী নিরুপম সেনকে হারানোর ক্ষেত্রে ব্রহ্মাস্ত্র হিশেবে ব্যবহার করেছিল এই তৃণমূল কংগ্রেস।পরবর্তীতে পৌর নির্বাচনে , এই আইনুল হকের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের বোর্ডকে পরাজিত করতে গোটা রাজ্য প্রশাসনকে পর্যন্ত ব্যবহার করতে দ্বিধা করে নি তৃণমূল।
            শোনা যায়, আইনুল হক নাকি অনেকদিন ধরেই তৃণমূলের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।তবে তাঁর সেই চেষ্টা এতোদিন সফল না হওয়ার পিছনে নাকি রয়েছে তৃণমূলের ই বর্ধমানের প্রাক্তন সাংসদ ডাঃ মমতাজ সঙ্ঘমিতার আইনুলকে ঘিরে তীব্র আপত্তি এবং বিরক্তি।তিনি ছাড়াও আদি তৃণমূল হিশেবে যেসব মানুষ বর্ধমান শহর এবং জেলাতে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন, তাঁদের ও তীব্র আপত্তির কারনেই নাকি আইনুল হক , এতোকাল বহু চেষ্টা স্বত্ত্বেও রাজ্যের শাসক শিবিরে ভিড়তে পারেন নি।সি পি আই( এম) থেকে বহিস্কৃত আইনুল কে ঘিরে কেবল বর্ধমানেই নয়, গোটা রাঢ় বঙ্গেই বামপন্থীদের ভিতরে একটা ভয়ঙ্কর রকমের আপত্তি আছে।এমন অভিযোগ ও পাওয়া যায় যে, অমর্ত্য সেনের প্রতীকী ট্রাস্টের গবেষকদের ক্ষেত্র সমীক্ষাতে পর্যন্ত বর্ধমানের পৌরপ্রধান হিশেবে এই আইনুল হক বহু নাকি বহু রকমের সমস্যা তৈরি করেছিলেন।
                           প্রশ্ন হল, এই বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব আইনুল হককে নিজেদের দলে র অন্তভূর্ক্ত করে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস , রাজ্য বিধানসভার ভোটের প্রায় মুখোমুখি সময়ে রাঢ় বঙ্গের মানুষদের কাছে কি বার্তা দিলেন? যে আইনুল কে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই, সেই আইনুল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, কোনঠাসা রাজ্যের শাসকদলের কাছে কি বাড়তি কিছু রাজনৈতিক মাইলেজ হাজির করতে পারবেন? যে আইনুল ঘোরোর হিন্দু সাম্প্রদায়িক বিজেপির সঙ্গে কয়েক বছর ঘর করলেন, সেই ব্যক্তিটি কি নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ , বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার বলে দাবি করা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি, ধরামনিরপেক্ষতার প্রশ্নে, বিশেষ কোনো বার্তা এনে দিতে পারবেন?
                             আইনুল কুশলী আঞ্চলিক রাজনীতি করেছেন।এই রাজনীতির জোরে যেমন তিনি একটা সময়ে যে বামপন্থী পরিমন্ডলে ছিলেন, সেই পরিমন্ডলের মানুষদের ভোট রাজনীতির প্রশ্নে অনেক সাফল্য এনে দিতে পৃরেছিলেন।কিন্তু এই জুটিয়ে দেওয়া সাফল্যের জেরে , আইনুলের জন্যে নিজেদের যে খেসারত দিতে হয়েছে, এমন কি এখনো হচ্ছে, বামপন্থীদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানেন না।
                সেই আইনুল সম্পর্কে বেশ কিছুদিন আগেই নিজেদের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন বামপন্থীরা।এই ধরণের সামাজিক আবর্জনাদের সম্পর্কে আরো অনেক অনেক আগে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করলে, ভোট রাজনীতি তে বামপন্থীদের হয়তো অনেকটা খেসারত তখন ই দিতে হতো।কিন্তু সেই খেসারত দিয়েও যদি বামপন্থীরা সেদিন আইনুলদের মতো লোকেদের ক্ষেত্রে দৃঢ়, প্রত্যয়ী অবস্থান নিতে পারতেন, তাহলে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বামপন্থীদের লাভ বই লোকসান হতো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *