হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের চলে যাওয়ার পর প্রায় দুই যুগ অতিক্রান্ত হতে চললো।তাঁর কন্ঠসম্পদের অসামান্য অবদানের জন্যেই কি আজ ও কিছু বাঙালির কাছে এতো জীবন্ত? নাকি কন্ঠ সম্পদকে ছাপিয়ে একজন দায়বদ্ধ শিল্পী হিশেবে তাঁর ভূমিকার জন্যে তিনি আজ ও বাঙালির প্রাণের ‘ হেমন্ত’ ?শিল্পী তো বহু এসেছেন।আগামী দিনে ও আসবেন। কে এল সাইগল থেকে জগন্ময় মিত্র , বা অতি সাম্প্রতিক কালের কালিকাপ্রসাদ।হেমন্তের মতো সবার কাছে ভালোলাগা ই কেবল নয়, ভালোবাসার মতো আর  একজন শিল্পী ও কি এসেছেন?
                         গত প্রায় দশ , পনের বছর ধরে জনপ্রিয়তা অর্জনের কেরামতির একটা দস্তুর তৈরি হয়েছে।এই দস্তুর অতীতের শিল্পীদের ভিতরেও ছিল।তবে সেই দস্তুরের ভিতরে একটা চরিত্রগত ফারাক ছিল।হেমন্ত মুখার্জী তাঁর প্রথম এক , দু খানা রেকর্ড বের হবার পর , রেকর্ড গুলো খবরের কাগজে মুড়ে , একটু পরিচিত অভ্যাসের বাইরেই পরিচিত মানুষদের বাড়িতে যেতেন।একথা , সেকথার পর , কথা উঠতো ওঁর হাতের প্যাকেটটি ঘিরে।একটু লাজুক ভাবে তিনি বলতেন, ও গুলো রেকর্ড।কৌতুহলী জিজ্ঞাসা আসতো; কার রেকর্ড? লাজুক উত্তর; আমার।
                  আর যায় কোথায়? পরিচিত রা পেড়ে ধরতেন রেকর্ড শোনানোর জন্যে। হাসি মুখে শুনতে দিতেন হেমন্ত।শ্রোতারা মুগ্ধ হতেন।
                   ব্যাস, এই টুকুনিই ছিল হেমন্তবাবুর মার্কেটিং।আর এটাই ছিল তাঁর মার্কেটিংয়ের স্টাইল।সেযুগে আত্মপ্রচারের ভিতরেও একটা অসম্ভব রকমের সংযত আচরণ ছিল।এতোটুকু আত্মম্ভরিতা ছিল না।অযাচিত ভাবে নিজেকে দেখাবার প্রবণতা তো নৈব নৈব চ।
                    শ্যামল মিত্রের প্রথম জীবনে কয়েকটা রেকর্ড বেরোনোর পর, নৈহাটিতে তাঁর বন্ধু কামু বাবু গোছা গোছা পোস্টকার্ড বিলি করতেন পরিচিত মানুষদের ভিতরে।উদ্দেশ্য, অনুরোধের আসরে, তাঁর বন্ধু, নৈহাটির ছেলে ‘ রবি’ র গানের অনুরোধ করে পড়শিরা যাতে চিঠি লেখেন।অবলীলায় লিখতেন তো আপামর নৈহাটিবাসী সেইসব চিঠি।
                      এই যুগটা আর নেই।হেমন্ত, শ্যামল, সতীনাথের মতো মানুষেরাও আর নেই।তবু এই মানুষগুলো তাঁদের সৃষ্টি র পাশাপাশি জীবনবোধের জায়গায় এমন কিছু রেখে গেছেন, যার জন্যে বাঙালির দেউরিতে এঁদের নিয়ে আরো বহু সন্ধ্যা চর্চা হবে।হেমন্ত মুখার্জীকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁদের যেমন হেমন্ত সম্পর্কে আগ্রহ তাঁর জীবদ্দশাতে ছিল , তা তাঁর মৃত্যুর পরেও অটুট থেকেছে।আবার যাঁরা কাছ থেকে হেমন্ত মুখার্জীকে দেখবার সুযোগ পান নি, তাঁরাও কেবল প্রিয় শিল্পী হিশেবেই নয়, সেই প্রিয় শিল্পীর গানের খুঁটিনাটি তথ্য ঘিরেও প্রবল উৎসাহী।সেইসব নিয়ে চর্চা করেন।সেই চর্চার ভিতরে যে সবসময় বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ধারা থাকে, তেমন টা না হলেও, এঁদের হেমন্ত মুখার্জীর প্রতি শ্রদ্ধা,ভালোবাসা তে এতোটুকু খাদ নেই।
                       হেমন্ত মুখার্জীর গানের তথ্য ঘিরে আলোচনার ক্ষেত্রে এই সময়ের একটা প্রবণতা হিশেবে উঠে আসছে, তাঁর গান ঘিরে নানা গল্প।সেইসব গল্পের যথার্থতা কতোখানি আছে, সে সব নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।কারন, অপেশাদার মানুষেরা যখন গবেষক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন, তখন গবেষণার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাইয়ের যে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্ব আছে, সেটার দিকে খুব একটা যত্নবান হন না।ওরাল হিস্ট্রির সুবিধা এবং অসুবিধা দুটোই আছে।
                       বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওরাল হিস্ট্রির উপাদানগুলি যখন সংগ্রহ করা হয়, কথক কতোখানি জল মিশিয়ে সেগুলি পরিবেশ করছেন, নাকি একদম ইতিহাস নির্ভরতার উপর ভিত্তি করে বলছেন, সেইসব দিকে খুব একটা নজর দেওয়া হয় না।যিনি এইসব মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করছেন, বক্তার দেওয়া তথ্য তে আবেগতাড়িত হয়ে এতোটাই আপ্লুত হয়ে পড়ছেন যে, বক্তা আদৌ প্রকৃত তথ্য দিলেন কি , না সবদিক থেকে যাচাই করে নিতে ভুলে যাচ্ছেন।বিশেষ করে ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্ম , যেখানে সম্পাদনার জন্যে আলাদা কোনো বিভাগের অস্তিত্ব ই নেই, সেখানে এইধরণের সমস্যা শুধু আজকের বিপদ ই নয়, ভাবীকালের জন্যে একটা বড়ো বিপদ হিশেবে থেকে যাচ্ছে।কারন, আগামী দিনে যদি কেউ হেমন্ত মুখার্জীকে নিয়ে প্রথাগত, নির্মোহ গবেষণা করেন, তাহলে ব্যক্তি কেন্দ্রিক , আবেগতাড়িত , কোনোরকম যাচাই ছাড়া তথ্য গুলি খুব বড়ো রকমের সমস্যা তৈরি করবে।
                       হেমন্ত মুখার্জীকে নিয়ে গবেষণা মানে কেবলমাত্র তাঁর ব্যক্তি জীবনের চর্চা নয়।তিনি কি খেতে ভালোবাসতেন, সাদা রঙের জুতো তে কোন কোম্পানি পালিশ ছাড়া তাঁর চলতো না বা জামার হাতা গোটানোর স্টাইল টা ঠিক কেমন ছিল, অথবা; কোন গান কবার টেস্ট রেকর্ড করবার পর তিনি ফাইনাল টেক করেছিলেন– এইসব তথ্য আর তা নিয়ে সূত্রহীন আলোচনা ই কিন্তু হেমন্ত গবেষণার একমাত্র মাধ্যম নয়।  
                     নিজের সাংস্কৃতিক জীবনের বোধ কে কেবলমাত্র অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিশেবে ব্যবহার না করে, সমাজচৃতনার গভীরে সেই বোধকে হেমন্ত মুখার্জী সফল ভাবে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন, এই গোটা কর্মকান্ডের সামগ্রিক, তথ্যনিষ্ঠ আলোচনাই হল হেমন্তগবেষণার প্রাথমিক শর্ত।হেমন্ত মুখার্জী তাঁর কন্ঠ সম্পদ কে কেবলমাত্র মানুষকে বিনোদনের দুনিয়াতে ভাসিয়ে দিয়ে নিজে বিস্তর টাকা উপার্জন করবো– এইবোধের দ্বারা একটি দিনের জন্যে ও পরিচালিত করেন নি। একজন শিল্পীর যে সামাজিক দায়বদ্ধতা , হেমন্তবাবু সেটি চিরদিন বজায় রেখেছেন।আবার সেই দায়বদ্ধতাকে ব্যবহার করে শাসকের কাছ থেকে বিন্দুমাত্র অনুগ্রহ নেওয়ার রাস্তাতে ও তিনি কখনো হাঁটেন নি।
                         ‘ নীল আকাশের নীচে’ ছবিটির প্রযোজক হিশেবে প্রগতিশীল ভাবধারার মানুষ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত নেহরুর খুব কাছে এসেছিলেন।চিন ভারত সীমান্ত সমস্যার কোনো ইঙ্গিত তখন ছিল না।সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার মানুষ নেহরুর যেমন সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রতি আকর্ষণ ছিল, তেমনি ই আকর্ষণ ছিল চিনের প্রতি।ফলে হেমন্তবাবুর তৈরি করা ছবি ‘ নীল আকাশের নীচে’ তে যে ভাবে ‘ হিন্দি চিনি ভাই ভাই’ এর ভাবধারা প্রকাশিত হয়েছিল, তা খোদ নেহরুকে যথেষ্ট খুশি করেছিল।কিন্তু সেই খুশি কে ব্যবহার করে হেমন্ত মুখার্জী শাসকের কাছ থেকে এতোটুকু ব্যক্তিগত সুবিধা নেন নি।এই মানসিকতা তাঁর সমসাময়িক শিল্পীদের ভিতরে যে সমান ভাবে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল, তা কিন্তু নয়।কিন্তু হেমন্ত ছিলেন হেমন্ত ই।তাঁর এই শিল্পীসত্তার সম্যক পরিচয় ঘিরে আজ ও কোনো সার্বিক,বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা হয় নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *